মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ: হাতি ও গাধার দ্বন্দ্ব, ট্রাম্প নাকি বাইডেন?

2
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন রিপোর্ট:
আজ যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চার বছরের জন্য হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশটির জনগণ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট—তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে জোর আলোচনা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানেই হাতি ও গাধার দ্বন্দ্ব। সরাসরি হাতি ও গাধাকে যুদ্ধে না নামিয়ে দিলেও এই দুই মার্কা নিয়ে যুদ্ধে নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট পার্টি। রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতি আর ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক গাধা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি, তা তো নয়; বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি গোটা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ তথা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন মার্কিনিরা। আর সে লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে সরাসরি ভোটগ্রহণ। এবারের নির্বাচনে সুযোগ রয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারকারী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনের দিকে তাই দৃষ্টি রয়েছে বিশ্বেরও।

এদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনকে ঘিরে পৃথক জরিপ চালিয়েছে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম। জরিপে জানা যায়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। বেশ কয়েকটি জরিপ বলছে, এবার জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন। এনবিসি নিউজ-ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের জরিপ বলছে, ট্রাম্পের চেয়ে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। ভোটের মাত্র একদিন আগে স্থানীয় সময় রোববার এ জরিপের ফল প্রকাশ করে এনবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল। খবর সিনহুয়ার।

এনবিসি নিউজ এবং ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের জরিপে দেখা যায়, দেশের নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৫২ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৪২ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করে। ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ, তরুণ, সিনিয়র নাগরিক, নারী, কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ এবং স্বতন্ত্র ভোটারের ক্ষেত্রে বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ বাইডেনকে এবং মাত্র পাঁচ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩২ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। সিনিয়র ভোটারদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৫ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে।

নারী ভোটারদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৭ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়। কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৪১ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৬ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়।

নির্বাচনপূর্ব এই চূড়ান্ত জরিপে আরো দেখা যায়, ব্যাটলগ্রাউন্ডখ্যাত ১২টি সুইং স্টেটে ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বাইডেন। বাইডেন ছয় পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্পের চেয়ে। অঙ্গরাজ্যগুলো হচ্ছে- অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আইওয়া, মইন, মিশিগান, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলিনা, নিউ হাম্পশ্যায়ার, নেভাদা, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন। এসব রাজ্যের ৫১ শতাংশ ভোটার বাইডেনকে এবং ৪৫ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়।

এদিকে, ট্রাম্প কেবল শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ট্রাম্পকে এবং ৪১ শতাংশ বাইডেনকে সমর্থন করে। কলেজ ডিগ্রি ছাড়া শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ ট্রাম্পকে এবং ৩৭ শতাংশ বাইডেনকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়।

যেভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন:
নাগরিকদের সরাসরি ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং নির্বাচন পদ্ধতি হলো পরোক্ষ। প্রথমে জনগণ ভোট দিয়ে ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলী নির্বাচন করে। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য—ব্যালট পেপারে কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নাম লেখা থাকে। আর একেক অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচকমণ্ডলীর নাম উল্লেখ থাকতেও পারে, নাও পারে। জনগণ কোনো নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো ওই প্রার্থীর দলের নির্বাচকমণ্ডলী মনোনীত করা। পরবর্তী সময়ে সেই নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দিয়ে জনগণের পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে নির্বাচন করে। তবে মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী, নির্বাচকমণ্ডলী কিন্তু জনগণের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য নন। অর্থাৎ নির্বাচকমণ্ডলী চাইলে দলের বাইরে গিয়ে বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২৪টি অঙ্গরাজ্যের আইনে এই ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আর বর্তমান যুগে সচরাচর কোনো নির্বাচককে নিজ দলীয় প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দিতে দেখা যায় না। তাই বলা যায়, জনগণ যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচকমণ্ডলীকে ভোট দেবে, তিনিই ওই অঙ্গরাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন।

নির্বাচনের দিনক্ষণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম ৬৯ বছর নির্বাচনের জন্য কোনো আলাদা দিন নির্দিষ্ট ছিল না। অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের পছন্দসই দিনে ভোটগ্রহণের আয়োজন করত। কিন্তু এর ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এই বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ১৮৪৫ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরের দিন মঙ্গলবার সারা দেশে একসঙ্গে ভোট গ্রহণ করা হবে। রোববার নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করা হোক, এমন প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু সে প্রস্তাব তাৎক্ষণিক বাতিল হয়। কারণ, সেদিন সবাই সাপ্তাহিক প্রার্থনায় অংশ নিতে গির্জায় যায়। সোমবারের কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেটিও বাতিল হয়ে যায়। কারণ, উনিশ শতকের মাঝামাঝি ওই সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। দূরদূরান্তের মানুষকে পর্যাপ্ত সময় দিতে অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, মঙ্গলবারেই ভোট গ্রহণ করা হবে। সেই নিয়ম অনুযায়ী এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩ নভেম্বর।