নতুন আইনে হোক ধর্ষণ নির্মূলের অঙ্গীকার

36
Print Friendly, PDF & Email

ইরানী বিশ্বাসঃ
স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া এক তরুনীকে তুলে নিয়ে সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ধর্ষণ সংঘটিত হয় ২৫ সেপ্টেম্বর। ধর্ষণের শিকার নারীর কর্তৃক সনাক্তকৃত সব আসামিকে পুলিশ আটক করেছে। বহুল আলোচিত নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও সারাদেশে ভাইরাল হয়।

উল্লেখিত ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন, পর্নোগ্রাফি আইন এবং ধর্ষণ মামলায় ওই নারী তিনটি মামলা করেন। এতে ৯ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত পরিচয় ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়। এ তিন মামলায় এ পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাদের মধ্যে ৫ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া ১০ অক্টোবর সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের তেলিখালই উনিয়নের চাতলপাড় গ্রামে ৭ বছরের মেয়েকে সকাল ১০টার সময় হৃদয় নামের এক প্রতিবেশি ধর্ষণের চেষ্টা করে। অভিযোগ পেয়ে ওই দিন রাতে ধর্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সিলেটের শামীমাবাদ আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডে ৯ অক্টোবর পাঁচ সন্তানের জননীকে ঘরে ঢুকে তিনজন সহযোগীকে নিয়ে দেলোয়ার নামের এক ব্যক্তি ধর্ষণ করে। রাতে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ অভিযুক্ত দেলোয়ার ও এক সহযোগী হারুনকে গ্রেফতার করে। গত ২ সেপ্টেম্বর নগরীর দাড়িয়াপাড়া এলাকার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীকে বেড়াতে নিয়ে যাবার নাম করে, এক বাসায় এনে ধর্ষণ করে। ধর্ষক মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগকর্মী রাকিব হোসেন নিজু। থানায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১০ অক্টোবর রাকিব হোসেন নিজুকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ।

মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী গ্রামের নাসির মোল্লা (২০) মোবাইল ফোনে কিশোরীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে। ১৩ অক্টোবর রাতে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গেলে মধুমতি নদীর চরে নিয়ে চারবন্ধুসহ প্রেমিক নাসির ধর্ষণ করে। অভিযোগের ভিত্তিতে পর দিন প্রেমিক নাসিরের সহযোগীরা গ্রেফতার হলেও নাসির পলাতক রয়েছে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় তৃতীয় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অভিযোগ পেয়ে থানা পুলিশ ধর্ষক আবুল খায়ের (৪৫)কে আটক করেছে। ধর্ষণের ব্যপারে পুলিশ জিরোটলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে। কোথাও ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

উপরে বর্ণিত প্রথম দুটি ধর্ষণের ঘটনায় সারাদেশে মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঠিক একই সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয় পুরো দেশ। ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান ─ সব সময় এমন বর্বর ঘটনা ছিল। তবে সমাজ যত অগ্রসর হচ্ছে, বর্বরোচিত ধর্ষণের ঘটনা যেন ততই বেড়ে যাচ্ছে। পুলিশ ধর্ষণের ঘটনাকে জিরো টলারেন্স নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছে। যেখানেই ধর্ষণের অভিযোগ পাচ্ছে কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। এ ব্যাপারে পুলিশের পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে।

বাংলাদেশে বছরের শুরু থেকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৪৮ টি। এরমধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জন নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৯ জন। আর ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ১৯২ জন। ধর্ষণের অভিযোগে থানায় দায়ের করা মামলার প্রায় সবগুলিতেই আসামী গ্রেফতার হয়েছে। কোনো কোনো মামলার নিষ্পত্তি এরই মধ্যে হয়েছে, কোনোটি নিষ্পত্তির পথে আর কোনোটি চলমান এবং প্রক্রিয়াধীন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে, ধর্ষণ বলতে বোঝানো হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোনো নারীর সাথে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবে।

আইনের ৯/১ ধারায় ধর্ষণের জন্য সাজা ছিল যাবজ্জীবন কারাদ-, এটি সংশোধন করে মৃত্যুদ-ের প্রস্তাব উত্থাপণ করেন আইনমন্ত্রী। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের খসড়া ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এ বিষয়ে প্রধানন্ত্রী বলেন, ধর্ষকরা পশু। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবনের সঙ্গে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে মন্ত্রিসভায় আইন পাস করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আইন সংশোধনের মাধ্যমে এসিড নিক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। এসিড সন্ত্রাসের মতো ধর্ষণ নামের পাশবিকতা নিয়ন্ত্রণেই সরকার আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান যুক্ত করেছে। যেহেতু পার্লামেন্ট সেশন নেই, তাই আমরা এক্ষেত্রে অধ্যাদেশ জারি করে দিচ্ছি।

এখন থেকে ধর্ষণের শাস্তি হবে হয় মৃত্যুদ-, নাহলে যাবজ্জীবন কারাদ-। এ সঙ্গে ৯/৪ ধারাতেও সংশোধন আনা হয়েছে। কিছুদিন আগে হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১/গ ধারায় সাধারণ জখম আপোষযোগ্য করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল মন্ত্রিসভায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের সকল সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এরফলে বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোয় সংশোধনী আনা হবে। এছাড়া নতুন পুরাতন মিলিয়ে ধর্ষণের সব মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

একের পর এক ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ছাত্র, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিক্ষোভ-সমাবেশ অব্যাহত ছিল। ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনের মুখে সরকারের আইন পরিবর্তনের এই পদক্ষেপ যুগান্তকারী বলেও মনে করা হচ্ছে। দেশে নতুন আইন প্রণয়নের খবরে সর্বমহলে স্বস্তি নেমে এসেছে। আইনের এই সংশোধনীর কারণে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার কমবে বলে আশা করা যায়।

ধর্ষণ ঠেকাতে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। তবে সাধারণ জনগণ হিসাবেও আন্তরিক হওয়া জরুরি। সরকার আইন প্রনয়ণ করে জনকল্যানের কাজে। রাষ্ট্রের প্রতি বা সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখাতে জনগণেরও উচিত প্রণীত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। প্রতিটি মানুষ যদি নিজে সচেতন হন এবং পাশের মানুষটিকে সচেতন করেন, তাহলে রাষ্ট্র বা সরকারের কঠিন আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হবেনা। ধর্ষণ ঠেকাতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- কার্যকর হোক এটা আশা করি। তবে, বাংলাদেশে আর একটিও ধর্ষক চিহ্নিত না হোক, আর কোনো মৃত্যুদ- না হোক, সচেতন মানুষ হিসাবে এটাই আমাদের প্রার্থনা।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

লেখকঃ
ইরানী বিশ্বাস
সাংবাদিক, নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক