আবরার হত্যার এক বছর, খুনিদের মৃত্যুদণ্ড চান মা

15
Print Friendly, PDF & Email

স্টাফ করস্পন্ডেন্ট, ঢাকা:
‘যাকে আমরা কোনোদিন একটা চড়ও মারিনি। সবাই দেখেছে, আমার সেই আবরারকে কত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটাই দাবি, সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই। আর এই মৃত্যুদণ্ড যেন তাড়াতাড়ি কার্যকর করা হয়, যাতে আবরারের ৯০ বছর বয়সী দাদা গফুর বিশ্বাস দেখে যেতে পারেন।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বী (২২) হত্যাকাণ্ডের এক বছর উপলক্ষে কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডের বাসায় এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। বাসায় আবরারের জামা-কাপড়, বইপত্র, ব্যবহৃত জিনিসপত্রে প্রিয় ছেলেকে খোঁজেন তিনি।

সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আবরারের মা বলেছেন, ‘শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশের সব শিক্ষার্থী যেন তাদের মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারে। কোনো মা যেন এই চিন্তা না করে যে, আমার সন্তান ফিরে আসবে তো?’

কুষ্টিয়ার পিটিআই রোডের বাসায় বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন।

আবরার ফাহাদের কথা মনে হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না প্রতিবেশীরাও। তাঁদেরও দাবি, আবরার হত্যার আসামিদের যেন মৃত্যুদণ্ড হয়। এ ছাড়া দ্রুত রায় ঘোষণার পাশাপাশি তা কার্যকরের দাবিও জানান তাঁরা।

আবরারদের প্রতিবেশী কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা জানান, আবরার ফাহাদ হত্যার এক বছর হয়ে গেল। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। আদালত খুব দ্রুতই এই বর্বরোচিত ঘটনার মামলার রায় ঘোষণা করবেন এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা।

করোনাভাইরাসের কারণে বিচারকাজে বিঘ্ন ঘটেছে উল্লেখ করে আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ বলছেন, ‘তিন আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।’

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় পরের দিন ৭ অক্টোবর ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা। এরপরে গত বছরের ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা  পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ওয়াহিদুজ্জামান ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বর্তমানে এই মামলায় আবরারের বাবার জেরা চলছে।

আজ মঙ্গলবার ঢাকার দ্রুত বিচার ১ নম্বর ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু জাফর মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের আদালতে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দুপুরে আবরারের বাবাকে জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

এর আগে গতকাল সোমবার আবরারের বাবা মো.বরকত উল্লাহ সাক্ষ্য দেন। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, ‘আমি কাশফুল নামের একটি এনজিওতে চাকরি করি। আমার ছেলে আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক‌্যাল ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। আমি লোক মারফত জানতে পারি, বুয়েটের হলে কতিপয় ছাত্র আমার ছেলেকে (আবরার) পূর্ব পরিকল্পিতভাবে মারধর করে হত্যা করেছে। সেই সংবাদ পেয়ে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় আসি। ঢাকায় এসে হল কর্তৃপক্ষ, ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করি এবং সিসিটিভিতে ধারণকৃত ছবি থেকে জানতে পারি- হলের ছাত্র আসামি মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতামিম ফুহাদ, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন ওরফে শান্ত, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মাজেদুর রহমান, মো. মাজেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ মুজাহিদুল, মো. তানভীর রহমান, হোসেন মোহাম্মদ ফাহাদ, মো. জিসান, মো. আকাশ, মো. শামীম বিল্লাহ, মো. সাদাত, মো. তানিম, মো. মোর্শেদ, মো. ফুয়াদ, জেমিসহ অজ্ঞাত পরিচয় আরো কয়েকজন বুয়েটের ছাত্র ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাত অনুমান ৮টা ৫ মিনিটে আমার ছেলেকে আবাসিক হলে রুম নম্বর ১০১১ থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায় এবং ওই বছরের ৭ অক্টোবর রাত অনুমান ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত হলের রুম নম্বর ২০১১ এবং ২০০৫ এর ভেতরে নিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে স্ট্যাম্প, লাঠি, রশি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ডভাবে মারধর করে, যার ফলে ঘটনার স্থানেই আমার ছেলে মারা যায়।’

জবানবন্দিতে আবরারের বাবা আরো বলেন, ‘ছেলেরা হলের দ্বিতীয় তলায় মৃতদেহ ফেলে রাখে, পরে কতিপয় ছাত্র আমার ছেলের মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। তখন ডাক্তার আমার ছেলেকে মৃত ঘোষণা করেন। আমি ঢাকায় পৌঁছে হলের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে, হলের কতিপয় ছাত্র ও শিক্ষকের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে এবং আমার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এজাহার দায়ের করি। পূর্বশত্রুতার জেরে পরস্পর সহযোগে আসামিরা আমার ছেলে আবরার ফাহাদ রাব্বীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আমি চকবাজার থানায় মামলা করি। থানা থেকে ছাড়পত্র নিয়ে আমার ছেলের লাশ কুষ্টিয়ার উদ্দেশে নেওয়ায় জন্য ঢাকা মেডিকেল মর্গে যাই এবং লাশ গ্রহণ করি।’

তারপর ৭ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে রাত ১০টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বুয়েটের অফিস থেকে দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা, ডিভিআর জব্দ করেন। সে সময় সাক্ষী হিসেবে আমার সঙ্গে আমার স্বজন ওয়াদুর রাফসান ও ওয়াহিদ উপস্থিত ছিল।

তারপর সেখানে থেকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর এবং ২০১১, ২০০৫ নম্বর রুম এবং দ্বিতীয় তলায় উঠার সিঁড়িতে উঠি। পরে তদন্ত কর্মকর্তাসহ যে স্থানে আবরারের লাশ পড়ে ছিল সেখানে গিয়ে ঘটনার স্থান শনাক্ত করি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইফাত মোশাররাফ, অনিক সরকার, মেহেদী হাসান, মনিরুজ্জামান, মিফতাউল ইসলাম, মো. মুজাহিদ,খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, সাদাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি জানতে পারি, গ্রেপ্তার হওয়া চার আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে এবং সব আসামি আমার ছেলেকে কীভাবে হত্যা করেছে, তার বর্ণনা দিয়েছে।’

আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘আসামিদের জবানবন্দি ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের মাধ্যমে ঘটনার পূর্বপরিকল্পিত মতে আসামিরা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলের হত্যার ন্যায়বিচার চাই। আসামিরা প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে অমানুষিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। এই আমার জবানবন্দি। ’

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ মামলার বিচারকাজ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর জন্য ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) কার্যালয়ে আবেদন করেন নিহত আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকত উল্লাহ। গত ১২ মার্চ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক আবরার হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ফাইল অনুমোদন করেন। এরপর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মামলার বিচারকাজ এত দিন বন্ধ ছিল।

মামলার আসামিরা

এ মামলায় আসামিরা হলেন—বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতামিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো. অনিক সরকার ওরফে অপু, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন ওরফে শান্ত, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, উপসমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, ক্রীড়া সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, গ্রন্থ ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, কর্মী মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মো. মুজাহিদুর রহমান, মো. মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, শামীম বিল্লাহ, মুয়াজ ওরফে আবু হুরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, মোর্শেদ অমত্য ইসলাম, এস এম মাহমুদ সেতু, মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল ওরফে জিসান, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও মুজতবা রাফিদ।

আসামিদের মধ্যে মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল ওরফে জিসান, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও মুজতবা রাফিদ পলাতক। বাকি ২২ জন গ্রেপ্তার আছেন। এ মামলায় আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।