টাকায় আট মন চাল!

৫ই অক্টোবর, ২০২০ || ১২:৫৬:৫৭
110
Print Friendly, PDF & Email

অশোক কুমার দেবনাথ, ফেসবুক থেকে:
বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান এর শাসনামলে (১৬৬৪-১৬৮৮) এক টাকায় আট মন চাল কেনা যেত। স্বাভাবিকভাবে মনে হবে তখন সব কিছু খুব সস্তা ছিল। আমরা এখনো দামে সস্তার উদাহরণ দিতে বলি ‘শায়েস্তা খান এর আমল পেয়েছ!’ আসলে কি তাই?

ওই সময় এক টাকার মূল্য ছিল এত বিশাল যে গ্রামীন মানুষের কাছে একটা পূর্ণ টাকার মালিক হওয়া ছিল জনশ্রুতির ব্যাপার। পণ্য বিনিময় ছাড়া নগদ মূল্যে বাজারে কেনা-বেচা হত মূলত কড়ির মাধ্যমে। বাংলার গ্রামাঞ্চলে কড়ি ছিল পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম। ৪ কড়িতে ১ গন্ডা, ২০ গন্ডায় ১ পণ, ৪ পণে ১ আনা, ৪ আনায় ১ কাহন, ৪ কাহনে ১ টাকা- এইভাবে কড়ির হিসাব করা হ’ত। এক টাকার স্থান ছিল অনেক উঁচুতে। গ্রামে টাকার অধিকারী মানুষ ‘টাকাওয়ালা’ বা ‘টাকাপতি’ হিসেবে মান্যবর ছিলেন। টাকার প্রচলন ছিল শহরে-বন্দরে যেখানে পাইকারী কেনা বেচা হত। শহর অঞ্চলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া গেলে গ্রামে নিশ্চয় চাল আরো সস্তা ছিল। সেখানে নিশ্চয় টাকায় ১০-১২ মন চাল পাওয়া যেত।

এটাকে ক্রেতার দিক থেকে না দেখে বিক্রেতার দিক থেকে দেখা যেতে পারে। ধরা যাক একজন কৃষক বাজারে আট মন চাল বিক্রি করে এক টাকা পেল। এক টাকা অর্জণের জন্য একজন কৃষককে ৮ মন চাল বিক্রি করতে হবে অর্থাৎ তাকে প্রায় ১২ মন ধান উৎপন্ন করতে হবে। ১২ মন ধান উৎপাদনের পাশাপাশি সরকারের খাজনার জন্য আরো অতিরিক্ত ১২ মন ধান উৎপন্ন করতে হবে। কারন তখন জমির উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক সরকার খাজনা হিসেবে আদায় করত। এছাড়াও পাটনি, নাপিত, কামার, কুমার, দোকানি প্রভৃতির পাওনা পরিশোধের জন্য আরো অতিরিক্ত কিছু ফসল উৎপাদন করতে হ’ত। কারন তখন মূলত ফসলেই সব কিছু শোধ করা হ’ত। সবাইকে বিদায় করার পর কৃষকের নিজের খোরাকির জন্য যা থাকতো তাতে সারা বছর লবন-ভাত চললে তা কৃষকের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের বিষয় ছিল।

খোরাকি অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থায় একজন কৃষকের পক্ষে হাটে আট মন চাল বিক্রি করে এক টাকার মালিক হয়ে বাড়ি ফেরা এক অসাধারণ এবং বিরল কৃতিত্বের ব্যাপার ছিল বটে। শায়েস্তা খাঁর আমলে সুখ ছিল বটে তবে এ সুখ সাধারণ মানুষের নয়, এ সুখ উৎপাদক শ্রেণীর নয়, এ সুখ শাসক শ্রেণীর, এ সুখ এ দেশে আগত বিদেশীদের, যারা নগদ টাকার অধিকারী ছিলেন।

ওই সময়কার কৃষি উৎপাদন বাজারমুখী ছিল না, ছিল খোরাকীমুখি। কৃষক উৎপাদন করত খোরাকীর জন্য, বাজারের জন্য নয়। প্রয়োজনীয় খোরাকী-ফসলের প্রায় সমপরিমান ফসল উৎপাদন করতে হ’ত সরকারের খাজনাপাতি ও বছরব্যাপী নেয়া পণ্য ও সার্ভিস ঋণ পরিশোধ করার জন্য। খোরাকী অর্থনীতিতে নগদ টাকার খেলা নেই বললেই চলে। গ্রামের মানুষের চাহিদা গ্রামেই মেটানোর ব্যবস্থা সমাজ গড়ে তুলেছিল। তাঁতি, নাপিত. কামার, কুমোর. শিক্ষক প্রভৃতি পেশাদার মানুষ সার্ভিস প্রদান করত কৃষিপণ্যের বিনিময়ে।

মোগল আমলে বাংলার বাজারে সস্তায় পণ্য পাওয়া যেত এ কথা শুধু বিদেশী পর্যটকদের বর্ননায় পাওয়া যায়। মধ্যযুগে বাংলায় আসা এক বিদেশী পর্যটক এক টাকায় দুইজন সুন্দরী কৃতদাসী কিনতে পেরে বেজায় খুশী হয়েছিলেন। শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকায় অনেক ইউরোপীয় বণিক ও ভ্রমণকারী এসেছেন। তাদের দৃষ্টিতে স্থানীয় বাজারে জিনিষের দাম ছিল ইউরোপের তুলনায় বেজায় সস্তা।

লেখক: অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।