নাফাখুম ঘুরতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলো সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ‘কানন’

৪ই অক্টোবর, ২০২০ || ০৩:৪০:৩৭
1485
kazi zakarul kanon nafakhum newsbee24
Print Friendly, PDF & Email

ডিষ্ট্রিক্ট করসপন্ডেন্ট, বান্দরবনঃ

বান্দরবানের থানচি উপজেলার নাফাখুম পর্যটন স্পটের রেমাক্রী খালে সাঁতার কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর কাজী জাকারুল ইসলাম কানন নামে এক পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা রেমাক্রী খাল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে।

এর আগে শনবিার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিখোঁজ হন তিনি।

বাম পাশের জন কাজি জাকারুল ইসলাম কানন

জানা গেছে, শনিবার ১৩ জনের একটি গ্রুপের সঙ্গে ঘুরতে যান কানন। তাদের সাথে ছিলেন স্থানীয় পর্যটক গাইড শ্রাবণ ত্রিপুরা। তিনি জানান, প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে থানচি থানা ও বিজিবি অফিসে তালিকা জমা দিয়ে তার নেতৃত্বে শুক্রবার বেলা আড়াইটা ঢাকা থেকে ভ্রমণে আসা ১৩ জনের একটি পর্যটক গ্রুপকে নিয়ে নাফাকুম ঝর্না ভ্রমণে রওনা হন তারা। রেমাক্রিতে রাত্রি যাপনের সকালে রেমাক্রি বাজারে নাস্তা খেয়ে নাফাঁকুমে উদ্দেশে রওনা দেন তারা। নাফাকুম পৌঁছার আগেই সাইগংয়ান নামক স্থানে পৌছলে খাল পারাপার করার সময় পানিতে ডুবে যান। পর্যটক স্পটে ভ্রমণ ও সফর সঙ্গী ও স্থানীয়রা অনেক খোঁজাখুঁজি পরও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি রেমাক্রি বাজার বিজিবি ক্যাম্পের জানালে তৎক্ষনিকভাবে বিজিবি সদস্যরা নিখোঁজ ব্যক্তি উদ্ধারে জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সাইগংয়ান নামক স্থান, এই খাল পার হয়েই নাফাখুমের দিকে যেতে হয়। বর্তমানে এই খালে প্রবল স্রোত বিরাজমান। ফাইল ছবি
*ফাইল ছবি

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে থানচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ আরিফুল হক মৃদুল জানান, পর্যটক নিখোঁজের খবর পেয়েছি। নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ।

ঘটনার পর থেকে টানা অভিযান চালিয়ে রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কানন ঢাকার উত্তরা এলাকার কাজী জহিরুল ইসলামের ছেলে। তিনি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ২৪ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।

গতকাল শনিবার কাননের নিখোঁজের সংবাদ তার পরিবারের কাছে পৌছালে শোকে হতবিহবল হয়ে পড়েন তার বাবা, মা এবং ছোটবোন। নিহতের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনি জুবরাজ (বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রু) গতকাল শনিবার তার বাসায় যান এবং নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে কাননের ফিরে আসার আকুতি জানান। তিনি লিখেনঃ

বন্ধু কানন ,আজ সন্ধ্যায় তোর বাসায় গিয়েছিলাম মা’ কে নিয়ে। তোর নিখোজ সংবাদটা শোনার পর থেকে.. তোর বাসার সবায় প্রায় উন্মাদ হয়ে আছে তোর জন্য।সবাই খুব কাদছিলো, তুই তাড়াতাড়ি আয় দোস্ত! তোর বাবা আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরছিলো আর বলছিলো- “জনি, আমার কানন কোথায়? আমার আব্বুটাকে তুমি এনে দাও! আমার বাবাটারে তোমরা খুঁজে এনে দাও।” প্রায় যেন জ্ঞান শুন্য হয়ে যাচ্ছিলো বারবার! তুই, তাড়াতাড়ি আয় দোস্ত। প্লিজ তাড়াতাড়ি আয়!! তোর মায়ের কথাগুলো যেন কানে ভাসছে, বলছিলো “আমার কানন সোনা তো সাতার জানে না, ও আর কতো পানি খাবে। ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে বাবা, তোমরা ওকে নিয়ে আসো না, ওর যে অনেক কষ্ট হচ্ছে!“ আমি তখনো চুপ করে কাদছিলাম, আমি আন্টিকে কিচ্ছুই বলতে পারিনি। আর তোর ছোট বোনটা কিছুই বলেনি, ও যেনো বোবা হয়ে গেছে। শুধু আমাকে দেখে ভাইয়া বলে একবার চিৎকার করে উঠলো। তারপর শুধু ওর কান্নার শব্দই শুনেছি!! মাঝে মাঝে দেখলাম বিড়বিড় করে কি যেন সব দোয়াও পরছে। খুব কষ্ট লাগছিলো। তুই তাড়াতাড়ি আয় দোস্ত! কানন, ছোট্ট জীবনে তোর সাথে বন্ধুত্বটা প্রায় দুই যুগের। ছোটবেলা থেকে তোকে কখনো কোন খারাপ কাজ করতে দেখেনি, কাওকে কখনো কষ্ট দিতে দেখিনি। আমাদের বন্ধুদের কাছে তুই খুব প্রিয় ভালো মনের মানুষ। আমরা সবাই তোকে খুব ভালোবাসি দোস্ত। তোর বাড়ির সামনে সব বন্ধুরা আজ ভীড় করে আছে, তোর খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করছে। সবাই তোর জন্য অনেক দোয়া করছে, কোন একটা মিরাক্কেল এর আশায়। তুই তাড়াতাড়ি আয় দোস্ত।

কাজী জাকারুল ইসলাম কাননের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরাফাত শিহাব (বর্তমানে চ্যানেল আই ব্রডকাস্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত) নিউজবি টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কাননের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্না বিজড়িত কন্ঠে তিনি জানান, “ঘুমটা ভে‌ঙে গেল ৬টায়। সাধারনত এত সকা‌লে আমার ঘুম ভা‌ঙেনা। আমার প্রিয় বন্ধু কান‌নের কথা ভাব‌তেই কেমন যেন অসহায় বোধ কর‌ছি। গতকাল দুপুরে নাফাকুম জলপ্রপা‌তে নে‌মে যে স্রো‌তে ভে‌সে গে‌ছে, কিছুক্ষন আগে তার লাশ পাওয়া গেছে ৫০ হাত পানির নিচে। কোথায় হা‌রি‌য়ে গে‌লি‌রে দোস্ত। আমাদের ব্যা‌চের যে কোন প্রোগ্রা‌মে আমাকে ফোন ক‌রে “তুই কখন আসবি, তুই না আসলে আমিও যামুনা”- বলা বন্ধুটাকে আর কখনোই দেখতে পাবোনা, এটা মেনে নিতে পারছিনা।

তিনি অনুরোধ করেন, আমাদের পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রশাসন থেকে ডেঞ্জার জোনগুলো যেনো চিহ্নিত করার ব্যবস্থা যেন গ্রহন করা হয়।

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম মৃদুল জানান, কাননের মরদেহ বেলা আড়াইটার দিকে থানসিতে এসে পৌঁছায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবে পুলিশ।

এদিকে, বান্দরবানের দর্শনীয় ঝর্নাগুলোও বর্ষায় খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। পাহাড়ে সৌন্দর্য ছড়ানো ঝর্নাগুলোতে পর্যটকদের সতর্কতা মূলক কোনো সতর্কীকরণ চিহ্ন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চলাচলের পথ, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ না করায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে প্রাণহানির ঘটনাও।