যেভাবে বিলিওনিয়ার থেকে দেউলিয়া: দ্য স্যাডেস্ট স্টোরি অব অনিল আম্বানি!

২৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ || ০৬:০০:০৮
23
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন রিপোর্ট:
বাবা ধীরুভাই আম্বানির সম্পত্তি সমান দুইভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল দুই ভাইয়ের মধ্যে। এক ভাই হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনকুবের, এশিয়ার সেরা ধনী। আরেক ভাই দেউলিয়া। কিন্তু এমনটা হলো কেন?

ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী কে? আপনি এই প্রশ্ন শুনে নিশ্চয়ই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন আর বলছেন, এটা কোনো প্রশ্ন হলো? একটা দুধের শিশুও আজকাল জানে, ভারতের শীর্ষ ধনীর শীর্ষস্থান মুকেশ আম্বানির দখলে। মুকেশের ভাই অনিল আম্বানির ধনসম্পদের পাহাড় নিয়েও শোনা যায় জোর কথাবার্তা। তবে এই দুই ভাইকে ছাপিয়ে সর্বাঙ্গে বড় হয়ে ওঠে তাদের বাবা ধিরুভাই আম্বানির কথা। মহাশিবরাত্রির মেলায় মিষ্টি বিক্রি থেকে শুরু করে এডেন বন্দরে পেট্রোল পাম্প কর্মী হিসেবে তিনশো রূপির চাকরী, রিলায়েন্স গ্রুপ, আম্বানি ব্রাদারস.. ধিরুভাই আম্বানির উত্থানের গল্প নিয়েই গোটা একটা ঢাউস সাইজের বই হয়ে যায়। তাকে নিয়ে হয়তো লেখা যাবে কোনো একদিন। আজ তাকে নিয়ে লিখবো না। লিখবো না মুকেশ আম্বানিকে নিয়েও। আজকের লেখা অনিল আম্বানিকে কেন্দ্র করে। প্রচুর বিত্তশালী হওয়া সত্বেও যিনি সম্প্রতি নিজেকে দাবী করেছেন বিত্তহীন হিসেবে। যিনি বলছেন, তার মোট সম্পত্তির পরিমান এখন শূন্য। সেই গল্পই জানবো আজ।

ধিরুভাই আম্বানি যখন মারা যান তখন দুই সন্তানের জন্যে রেখে যান বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি, রিলায়েন্স, আম্বানি ব্রাদারস এর মতন বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি। মৃত্যুর আগে কোনো উইল করে যেতে পারেননি ধিরুভাই আম্বানি। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে তাই বিবাদ প্রকট ছিলো প্রথম থেকেই। এ কথা ঠিক, অনিলের চেয়ে মুকেশ ব্যবসা একটু ভালো বুঝতেন। তিনি তাঁর মত করে বাবার ব্যবসা শক্ত করে ধরেওছিলেন। যেটা ভালো লাগছিলো না অনিলের। ব্যবসা নিয়ে দুই ভাইয়ের অসন্তোষ চরমে ওঠে। অনিল তখন মা কোকিলাবেনকে জানান, সম্পত্তি যাতে দুই ভাগ করা হয়। মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্পত্তি দুইভাগ করে দুই ভাইকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। অনিল চাল খাটিয়ে নতুন নতুন সেক্টরগুলোকে নিয়ে নিয়েছিলেন নিজের কব্জায়। যাতে করে এগুলো নিয়ে কাজ করে সে মুকেশের চেয়ে আরো বেশি এগিয়ে যেতে পারে।

প্ল্যানমাফিক তিনি অ্যাডল্যাবস কেনেন। যেটা পরবর্তীতে ভারত ও ভারতের বাইরে প্রায় ৭০০টি আইম্যাক্স বিগ সিনেমা স্ক্রিন তৈরি করে। সম্পর্ক স্থাপন করেন তারকা ও রাজনীতিবিদদের সাথেও। বিভিন্ন টিভি শো’তে আসার পাশাপাশি তিনি হয়ে যান রাজ্য সভারও সদস্য! তবে এটুকুতেই থেমে থাকেননি অনিল। খ্যাতনামা পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের প্রোডাকশন হাউজ ‘ড্রিমওয়ার্কস’ এর সাথেও বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন। অনিলের সাফল্য তখন চোখে দেখার মতন! সাফল্যের গ্রাফ ক্রমশই উর্ধ্বমুখী হচ্ছিলো।

ধারণা করা হচ্ছিলো, অনিলের উত্থানের এই জয়রথ আর থামবে না। কিন্তু সেটি হয়নি। দুই ভাইয়ের মধ্যে ব্যবসাসংক্রান্ত কিছু বিষয়ে দ্বন্দ্ব তখন চরমে উঠেছে। যে দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে দুই ভাইকে যেতে হয় আদালতের চৌহদ্দিতেও। আদালতের সিদ্ধান্তে মুকেশ জয়ী হন। বেশ জোরালো এক ব্যবসায়িক ধাক্কা খান অনিল। এরপর আসে আরেক ধাক্কা। যে ধাক্কা বেশ বড়সড়ই ছিলো।

অনিলের মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান ছিলো রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্স। সেখানে তারা ব্যবহার করতো CDMA (কোড ডিভিশন মাল্টিপ্লল অ্যাকসেস) টেকনোলজি। এটা বেশ সস্তা ছিলো এবং টুজি ও থ্রিজি নেটওয়ার্কের জন্যে বলতে গেলে বেস্ট একটা অপশন ছিলো। কিন্তু অন্যান্য মোবাইল ফোন অপারেটররা হুট করেই আনলো ব্যয়বহুল GSM (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন)। জিএসএম এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়; ফোরজি ও ফাইভজিতেও বেশ ভালো সার্ভিস দিতো এই টেকনোলজি। পরবর্তীতে ভারতে যখন ফোরজি-ফাইভজি এলো, রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্স এর ব্যবহারকারী একদম কমে তলানিতে এসে ঠেকলো। CDMA ফোরজি, ফাইভজি’তে কাজ করতেই পারতো না। আর মানুষও ফোরজি, ফাইভজি পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো একসময়ের ডাকসাইটে রিলায়েন্স কমিউনিকেশন থেকে। চাপে পড়লেন অনিল আম্বানি।

এর কিছুদিন পরেই রিলায়েন্স কমিউনিকেশন এর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার জন্যে ‘রিলায়েন্স জিও’ লঞ্চ করেন মুকেশ আম্বানি। জিও ভারতের পুরো বাজার দখল করে ফেলে। গ্রাহকদের ৬ মাসের জন্য বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের লোভনীয় অফার দেয় তারা। এতে করে আর কোনো কোম্পানিই টিকতে পারেনি জিও এর সাথে। অনেক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেউলিয়া হয়ে যায় রিলায়েন্স কমিউনিকেশন্সও।

অনিলের তখন দিশেহারা অবস্থা। আইম্যাক্স বিগ সিনেমা’কে তিনি তখন ‘কার্নিভ্যাল সিনেমা’র কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। টিভি ও রেডিও ব্যবসার পার্সেন্টেজও বিক্রি করে দিয়েছেন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। বিভিন্ন ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্টে টাকা ইনভেস্ট করে লসের মুখে পড়েছেন। কথায় আছে, বিপদ যখন আসে, চারপাশ থেকেই আসে। সেটাই আমরা লক্ষ্য করি অনিল আম্বানির বেলায়। ডিফেন্স সেক্টরে টাকা ঢাললেন। সেটাও ব্যাকফায়ার হলো। আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে তিনি চাচ্ছিলেন, একটা হলেও ভালো ব্যবসা করতে। কোনোটাতেই ক্লিক হচ্ছিলো না। এদিকে, ব্যাঙ্ক থেকে বিভিন্ন সময়ে নিয়েছেন বড় অঙ্কের সব ঋণ। ব্যাঙ্ক থেকে চাপ আসছিলো ক্রমশই। ঋণ শোধ করতে আস্তে আস্তে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। এভাবেই ধাক্কা খেতে খেতে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থবিত্তের কিছুই আর টেকাতে পারেন না দিন শেষে।

মুকেশ আম্বানি ও অনিল আম্বানির দ্বৈরথ তাদের নিয়ে গিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন জংশনে!

ভাইয়ে ভাইয়ে যতই দ্বৈরথ থাকুক, ঠিকই ভাইয়ের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মুকেশ আম্বানি। গত বছর ঘটেছিলো এক ঘটনা। অনিল আম্বানির রিলায়েন্স টেলিকমিউনিকেশন এর কাছে এরিকসনের পাওনা ছিল ৫৫০ কোটি রুপি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো এই টাকা পরিশোধ করতে না পারলে অনিল আম্বানিকে যেতে হবে কারাগারে। এদিকে, এই টাকা পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না অনিলের। ভাইকে রক্ষা করেন মুকেশ আম্বানি। নিজে থেকেই ৫৫০ কোটি রুপি দিয়ে দেন এরিকসনকে। জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচেন অনিল।

এ বছরেও আবার আদালতের মুখোমুখি হন অনিল। অনিল আম্বানিকে মুম্বাই থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে লন্ডনের এক আদালতের শুনানিতে হাজির থাকতে হয়েছিল তিনটি চীনা ব্যাংকের দায়ের করা মামলায়। রিলায়েন্স কম্যুনিকেশন্স লিমিটেডের কাছে ৭০ কোটি ডলার পাওনা আদায়ের জন্য মামলাটি করেছে এই ব্যাঙ্ক তিনটি। ২০১২ সালে তারা কোম্পানিটিকে এই অর্থ ঋণ দিয়েছিলো, অনিল আম্বানির মৌখিক ভরসায়। আদালতের জেরার সময়ে অনিল আম্বানি জানান, তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা। স্ত্রী’র ব্যক্তিগত অলঙ্কার বিক্রি করে এখন তাদের সংসার চলছে, এমনটিও দাবী করেন তিনি।

ভাবতে অবাক লাগে, বাবা ধিরুভাই আম্বানির সম্পত্তি পেয়ে যে মানুষটি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পৃথিবীর ষষ্ঠতম ধনী মানুষ, সেই মানু্ষটিই সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অভাবে হারিয়েছেন প্রায় সবটাই। একই পরিমাণ সম্পত্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করে তার নিজেরই ভাই গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। অনেকদিন থেকেই হয়ে রয়েছেন ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী। ব্যবসা ছড়িয়ে দিচ্ছেন আশেপাশের সবখানে। সেখানে আরেক ভাইয়ের গল্প যেন মূদ্রার উল্টোপিঠ। দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে জীবন যেন বিপর্যস্ত। এরকম পরিস্থিতিতে সবকিছু ছাপিয়ে ফুটে ওঠে সেই প্রবাদবাক্যটিই; জীবনের উত্থানপতনের গল্পগুলো খুব বিচিত্র।

অনিল আম্বানির জীবন যেন সেরকমই এক বিচিত্র জীবনের অদ্ভুত নাগরদোলার গল্প।