ধর্ষণের মামলার পর সাবেক ভিপি নুর গ্রেফতার

38
টিএসসিতে সমাবেশ করে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় মৎস্য ভবন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে গোলযোগের পর গ্রেপ্তার করা হয় নুরুল হক নুরকে। ছবি: সংগৃহিত
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
ধর্ষণের অভিযোগে এক মামলা হওয়ার পর তার প্রতিবাদে সোমবার রাতে বিক্ষোভ করেছিলেন নূর ও তার সঙ্গীরা। তখন পুলিশের সঙ্গে গোলমালের পর নূরসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির উপকমিশনার ওয়ালিদ হেসেন গণমাধ্যমে বলেন, “পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া এবং পুলিশকে মারধর করার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা রাতে টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় মৎস্য ভবন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে গোলযোগ বাঁধে নূরের সংগঠন সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার পরিষদের। গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম।

এদিকে, ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা জানিয়েছেন, নুরের সঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে।

এর আগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থী লালবাগ থানায় এ মামলাটি করেন। মামলায় মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্ষণে সহযোগিতাকারী হিসেবে নুরুল হক নুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৭ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আদালত। সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা মামলার এজাহার গ্রহণ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন।

মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনকে। ধর্ষণের স্থান হিসেবে লালবাগ থানার নবাবগঞ্জ বড় মসজিদ রোডে হাসান আল মামুনের বাসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদী শিক্ষার্থী ঢাবির বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে থাকেন।

নুর ও মামুন ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন- বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক নাজমুল হাসান সোহাগ, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক (২) মো. সাইফুল ইসলাম, ছাত্র অধিকার পরিষদের সহ-সভাপতি মো. নাজমুল হুদা এবং ঢাবি শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ হিল বাকি।

ওই ছাত্রী মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, ‘হাসান আল মামুন আমার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই। বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সুবাদে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই। নিজ বিভাগের সিনিয়র হওয়ায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের একপর্যায়ে তার সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় আমার সঙ্গে তার বিভিন্ন সময়ে ম্যাসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কথোপকথন হয়। সেখানে আমাকে শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে হাসান আল মামুন আমাকে তার রাজধানীর নবাবগঞ্জ, মসজিদ রোড, ১০৪ নম্বর বাসায় যেতে বলে। সেখানে আমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে সে।’

অভিযোগে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর ৪ জানুয়ারি আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ১২ জানুয়ারি আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় মামুনের বন্ধু সোহাগের মাধ্যমে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় আমি ক্যাম্পাস রিপোর্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে মামুন ও সোহাগ তা হতে দেয়নি। এর আগে মামুনকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে সে রাজি হয়, কিন্তু আমি অসুস্থ হওয়ার পর সে নানা টালবাহানা শুরু করে।’

ওই ছাত্রী অভিযোগে বলেন, ‘উপায় না দেখে ২০ জুন বিষয়টি ভিপি নুরকে মৌখিকভাবে জানাই। সে বলে মামুন আমার পরিষদের, আমার সহযোদ্ধা। তার সঙ্গে বসে একটা সুব্যবস্থা করে দেবো। এরপর ২৪ জুন মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে তিনি আমার সঙ্গে নীলক্ষেতে দেখা করতে আসেন। কিন্তু মীমাংসার বিষয়টি এড়িয়ে আমাকে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। আমি যদি বাড়াবাড়ি করি তাহলে তার ভক্তদের দিয়ে ফেসবুকে আমার নামে উল্টাপাল্টা পোস্ট করাবে এবং আমাকে পতিতা বলে প্রচার করবে বলে হুমকি দেয়। তাদের ছাত্র অধিকার পরিষদের ১.১ মিলিয়ন সদস্যের গ্রুপে এ প্রচারণার হুমকি দেওয়া হয়। নুর আরও জানায়, তার একটি লাইভে আমার সব সম্মান চলে যাবে। ইতোমধ্যে মামলার চার নম্বর আসামি সাইফুল ইসলাম আমার নামে কুৎসা রটিয়েছে এবং ৫ ও ৬ নম্বর আসামিকে লাগিয়ে দেয় কুৎসা রটাতে। তারা ম্যাসেঞ্জার চ্যাট গ্রুপে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করাসহ সম্মিলিতভাবে চক্রান্ত করে।’

নূরের পরিচয়:
নুরুল হক নুর বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার বৃহত্তর চর কাজল ইউনিয়নে (বর্তমান চর বিশ্বাস ইউনিয়নে) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইদ্রিস হাওলাদার একজন ব্যবসায়ী এবং সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এবং মায়ের নাম নিলুফা বেগম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নূর দ্বিতীয়।

নূরের লেখাপড়া:
নূর পটুয়াখালীর চর বিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈর গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১০ সালে মাধ্যমিক এবং ঢাকার উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ২০১৩–১৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন।

নূরের ছাত্র আন্দোলন:
নুরুল হক নূর বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ছাত্র আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নূরের ছাত্র রাজনীতি:
এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের মুহসিন হলের উপ-মানব উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। স্কুল জীবনে তিনি ছাত্রলীগের স্কুল কমিটির দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও তিনি বিতর্ক, অভিনয়সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

ভিপি নূর:
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন। তিনি ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

জুন ২০২০ সালে নুর তরুণদের নেতৃত্বে একটা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন।