কুষ্টিয়ায় দাপটি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা চাঁদা ও টেন্ডারবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার

১৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ || ০৯:৪৭:৫২
42
Print Friendly, PDF & Email

ডিষ্ট্রিক্ট করসপন্ডেন্ট, কুষ্টিয়া:
কুষ্টিয়ায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের দাপটি সাবেক এক নেতাকে আটক করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে শহরের প্রধান সড়ক এনএস রোড থেকে তাকে আটক করা হয়।

আটক আমিনুর রহিম পল্লব কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। দুপুরে তাকে মডেল থানায় পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
শহরের পৌর বাজার নিয়ন্ত্রণ, বাজারের জায়গা দখল, লোকজনকে মিথ্যা ঘটনায় হয়রানি করে অর্থ আদায়, টেন্ডারবাজি, জায়গা দখল- এমনকি চুরির সঙ্গেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরাও পল্লবের অপকর্মে চরম ক্ষুব্ধ। আর সাধারণ মানুষ তার ভয়ে মুখ খুলতো না।

পুলিশ জানায়, শহরের থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুর রহিম পল্লব আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম করে আসছেন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও লোকজনকে হয়রানি করে অর্থ আদায় করে আসছিলেন তিনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শহরের এনএস রোড থেকে তাকে আটক করে ডিবি পুলিশ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের থানাপাড়া এলাকায় পুরোনো পৌর বাজারসহ সরকারি-বেসরকারি নানা অফিস রয়েছে। এছাড়া শহরের একমাত্র বড় মার্কেটটিও ওই এলাকায়। এক সময় সেখানকার ক্রিসেন্ট ক্লাবকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিষয়টি ছিল প্রকাশ্যে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন সবুজের উত্থান হয় রাজনীতিতে। তিনি প্রথমে শহর, পরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। এরপর শহরে তার রাজত্ব ও অপকর্ম বাড়তে থাকে। টেন্ডার, বালুঘাট ও বাজার ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সালে ১৫ আগস্ট শহরে এক হত্যাকাণ্ডের পর সবুজ নিখোঁজ হন। এরপর তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। বছর না ঘুরতেই এলাকা দখল নেন আমিনুর রহিম পল্লব। পল্লব এক সময় জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সবুজ নিখোঁজ হওয়ার পর সিভিল সার্জন অফিসের টেন্ডার তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, এমনকি হাসপাতালে খাদ্য সরবরাহের কাজটিও তিনি দখলে নেন। একে একে বাজার, ঘাটসহ পুরো এলাকার কর্তৃত্ব নেন তিনি নিজেই।

সিভিল সার্জন অফিসের একটি সূত্র জানান, বর্তমানে পল্লব এখানকার সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন। গত কয়েক বছরে যেসব টেন্ডার হয়েছে তার সব তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। গত মাসে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে গাছ বিক্রির টেন্ডার দেওয়া হয়। সেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন পল্লব। সেখানে শিডিউল কিনতে গেলে পল্লবের ক্যাডার হিরো সবাইকে বাধা দেয়।

পৌর বাজারের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পুরো বাজার পল্লবের একক নিয়ন্ত্রণে। এখান থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করেন তিনি। বাইরে থেকে যেসব গাড়ি আসে, তাদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়া হয়। তার ক্যাডার ফরিদ, তপন, গাড়া জনি, টুটুলসহ অন্যরা তার হয়ে কাজ করে। এছাড়া পল্লবের অন্যতম প্রধান সহযোগী মুরাদের শ্বশুর ডাক বাবু এলাকায় মাদক বিক্রি করে বলে জানা গেছে। এছাড়া সাইকেল চুরির মামলায় পল্লব জেল পর্যন্ত খেটেছেন।

পৌর বাজারের সামনেই পরিমল থিয়েটার নামে নাট্যকর্মীদের একটি অফিস ছিল। পরে সেখানে সিনেমা হল করা হয়। সবুজের সময় ওই জায়গার দখল নিয়ে বহুতল মার্কেট করার জন্য ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে এখন ১০ তলা বহুতল ভবন। সবুজের নেতৃত্বে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। এখন এ ভবনটি পল্লবের দখলে। সেখানে তার ব্যক্তিগত অফিস রয়েছে। এই অফিসে প্রায়ই সালিশ বসানো হয়। সালিশের নামে লোকজনকে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। হুমকি দিয়ে আদায় করা হয় টাকা। টাকা না দিলে চলে অত্যাচার।

২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি মোখলেছুর আলম বাবু বলেন, ‘পরিমল থিয়েটারটি আগে প্রকৃত নাট্যকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর সবুজ সেটি দখলে নেয়। এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে পল্লব। অথচ আমাদের মতো নাট্যকর্মীদের সেখানে অবহেলা করা হয়েছে। পুরো সম্পদটি দখল করে তারা লুটেপুটে খাচ্ছে। এর একটা সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

থানাপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত এক ব্যাংক কর্মকর্তার জমি কেনেন পল্লব। ১৩ লাখ দাম করে জমি নিলেও ৫ লাখ টাকা পরিশোধের পর আর কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। উল্টো ওই ব্যাংকারের মেয়েকে হয়রানি করা হচ্ছে। জমি জালিয়াতির ঘটনায় তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত।

কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে পল্লবকে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

আমিনুর রহিম পল্লব ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা। বর্তমানে কোনো পদ-পদবী না থাকলেও দলীয় কয়েকজন নেতার নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন নানা অপকর্ম করে আসছিলেন। তার অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।