২১ বছর সাইকেলে করে বই বিক্রি করছেন নওগাঁর লোকমান

৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ || ০৯:৩৪:৫৬
10
২১ বছর ধরে সাইকেলে করে বই বিক্রি করছেন নওগাঁর লোকমান।
Print Friendly, PDF & Email

আমিনুল জুয়েল, নওগাঁ:
বই হলো কালের খেয়াঘাট। আর এই খেয়াঘাট থেকেই মানুষ সময়ের পাতায় ভ্রমণ করে। পৃথিবীতে মানব সভ্যতার সকল জ্ঞান জমা হয়ে আছে বইয়ে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য দরকার। একইভাবে জীবনকে ছন্দময় করতে দরকার জ্ঞান। আর জ্ঞানের আঁধার হলো বই। হাজার বছরের সব লিখিত-অলিখিত ইতিহাস রয়েছে বইয়ের মধ্যে। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয়না। আর জন মেকলে বলেই বসলেন, প্রচুর বই নিয়ে গরিব হয়ে চিলোকোঠায় বসবাস করব; তবু এমন রাজা হতে চাই না, যে বই পড়তে ভালোবাসে না। অথচ আমরা বই কিনতে বা পড়তে পছন্দ করিনা।

সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে সাইকেলেই বই ফেরি করে বিক্রি করছেন নওগাঁর আত্রাইয়ের লোকমান হোসেন। উপজেলার আমরুল কসবা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। বাবা মৃত রমজান আলী। চার সদস্যের সংসার তাঁর। পরিবারে এক ছেলে সে এখন ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকুরীরত। আর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। জীবনের ৬০ বছরের ২১ বছরই সাইকেলে চরে বই ফেরি করে বিক্রি করেছেন। বই বিক্রি শুরু করেন ১৯৯৯ সালে।

বই বিক্রি করে লোকমান পান আত্মতৃপ্তি। তাঁর প্রত্যাশা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক এই ধরা। আর তাই প্রায় দুই যুগ ধরে বই নিয়ে পথে-প্রান্তরে ঘুড়ে-বেড়ান ব্যতিক্রমী এই বইপ্রেমী। পাঠকের বয়স ও চাহিদা অনুযায়ী পছন্দের বইটি হাতে তুলে দেন এই বইপ্রেমী লোকমান। গ্রামের আপামর জনগোষ্ঠীকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখতেই তাঁর এরকম ভিন্ন প্রয়াস। যা বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তাঁর বইয়ের তালিকায় রয়েছে- কবিতা, ধর্মীয়, বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও শিশুতোষ বই ও ধর্মীয় পোস্টার। এছাড়া অনেক শিক্ষনীয় বইও আছে তাঁর বিক্রির তালিকায়। তাই অজোপাড়া গাঁয়ে বসেও পাঠকরা নিত্য-নতুন বইয়ের পাতায় ডুবে যেতে পারেন। পড়তে পারেন প্রিয় কবির কাব্যগ্রন্থ বা সাজাহানের মত নাটক। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ আর শামসুর রহমান ছাড়াও রয়েছে কালজ্বয়ী বহু লেখকের বই।

লোকমানের পাঠক সারিতে কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ এমনকি কৃষকরা রয়েছেন। বর্তমানে তাঁর পাঠক সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। কাঁধে একটি কাপড়ের ব্যাগ এবং সাইকেলে কয়েকটি বাজারের ব্যাগ থাকে যা বই দিয়ে থাকে পূর্ণ। সাইকেলের সামনে একটি হ্যান্ড মাইক বাঁধানো রয়েছে। এছাড়াও, ওই বাইসাইকেলটির ক্যারিয়ারে বাঁধা থাকে বইগুলি।

লোকমান জানান, ‘ছেলেবেলা থেকেই বই আর পত্র-পত্রিকার সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে। গরীব বলে শখ থাকলেও সাধ্য মত বই দিতে পারিনা। ছোটবেলায় তাঁর গ্রামে ছিলনা কোন পাঠাগার। শুধু তাঁর গ্রামই নয়, বরং আশ-পাশের গ্রামেও ছিলনা কোন পাঠাগার। তাই ছোটবলো থেকেই আমার গ্রামে একটি বড় পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতাম। সে জন্য, আমি পথে-ঘাটে, হাট-বাজারে, পায়ে হেঁটে ও বাইসাইকেল করে ২১ বছর ধরে বই বিক্রি করি।’

তিনি আরও জানান, ‘জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি এই কাজে যুক্ত থাকতে চাই। সকলকে দিতে চাই আনন্দময় এক নতুন পৃথিবীর খোঁজ। যে নতুন পৃথিবীর খোঁজ তিনি পেয়েছেন বইয়ের ভিতর ছাপানো অক্ষরে অক্ষরে। আর বই পড়ার আনন্দ জানান দিতে তিনি অবিরাম ছুটে চলেন মাইলের পর মাইল। প্রত্যাশা নতুন, সুন্দর পৃথিবীর।’