লাল পিঁপড়া-কালো পিঁপড়া এবং কাজী নজরুল ইসলাম

২৭ই Auguই, ২০২০ || ০১:১৪:০৪
11
Print Friendly, PDF & Email

লিটারেচার ডেস্কঃ

আজ কাজী নজরুলের প্রয়াণ দিবস। তিনি বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি, মানুষের কবি। তিনি আপাদমস্তক কবি। কিন্তু এর সাথে আরেকটা বিশেষণও যোগ করা হয়। মুসলমানের কবি। যেহেতু তার কিছু বিখ্যাত গজল আমরা শুনেছি। কিন্তু তার যে অনেক বিখ্যাত শ্যামা সঙ্গীতও আছে সেটা অবশ্য আমরা অনেকেই জানি না। কাজী নজরুল ইসলাম এবং তার সাহিত্যকর্মের সাথে ধার্মিকের যে দ্বান্দ্বিক ধারণা সেই অবস্থা থেকেই লিখেছেন এ সময়ের একজন কবি- কাজী মেহেদী হাসান।

কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!

বাঙালী মুসলমানের সাথে কবি ও কবিতার সম্পর্কের দুস্তর ব্যবধান কোনকালেই ছিল না। পারস্যের ওমর খৈয়াম কিংবা ফার্সি কবি জালাল উদ্দিন রুমি বরাবরই মুসলমানদের আশীর্বাদপুষ্টই ছিলেন। যদিও এখানে তাদের নিয়ে বিশেষ কিছু বলার উদ্দেশ্য নেই।  তদানিন্তনকাল বলি আর এই সময় পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে প্রিয় কবির নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। এবং তিনিই আলোচ্য, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে তার ‘মানুষ’ কবিতাই আলোচ্য। তার আগে কিছু সম্পূরক কথা আবশ্যক। কবিতায় ইসলাম এবং স্রষ্টার সবচেয়ে বেশি গুণগ্রাহী বোধহয় উনার মতো কেউ ছিলেন না। অসংখ্য গজলের লেখক তিনি। কাজী নজরুল ইসলাম বলতে বাঙালি মুসলমানের কাছে প্রশ্ন এলে হয়তো সবার আগে শোনা যাবে-

মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই


কিংবা ঈদ-উল-ফিতর নিয়ে

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।

নিঃসন্দেহে অনেক বেশিই প্রতিভাবান ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তার সেই সময়ে বসে আর অমন দৈন্যদশায় যা তিনি লিখে গেছেন সেটা কেবল অলৌকিক ক্ষমতাবলেই সম্ভব। তবে বাঙালি মুসলমানেরা বরাবরই চালাক। তারা অতটুকুই নিয়েছেন যতটুকু স্বার্থের সাথে যায়। যতটুকু নিলে তাদের কাজের সাথে কোন প্রশ্ন আসবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যা ঘটে গেলো, সেই সাথে কাঠ-মোল্লাদের ঈমানী দ্বায়িত্বের যে কাঠিন্য আমরা দেখলাম সেটা তাই প্রমাণ করে। সেখানকার ইউএনও কিংবা সন্মানিত ‘পশুসম্পদ মন্ত্রী’র মহাকাব্যিক ডায়লগ ‘মালাউনের বাচ্চা’ নিশ্চয়ই ইসলামের ঝান্ডা আরও উঁচুতেই নিয়ে গেছে!

কাজী নজরুল ইসলামের মানুষ কবিতার যে দুটো লাইন এই পরিস্থিতিতে সবার আগে শেখা উচিত সেটা লেখার শুরুতেই দিয়েছি। আবারও দিচ্ছি—

কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি!

যদিও এতে মুসলমানদের কিছু যায় আসে না। ছোটবেলায় পড়া শেখ ফজলুল করিমের-

কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর।

এই দুটো লাইন তারা ভুলে গিয়েছে। আর মনে থাকলেও বা কি? মানলাম না! আর আল্লাহ বলতে তো আল্লাহই বলতে হবে। ঈশ্বর, গড, জেসাস, ভগবান এসব তো বিধর্মীরা বলে। যেভাবে আমরা ছোটবেলায় লাল পিঁপড়ে-কালো পিঁপড়ের কথা জেনেছি, জল আর পানির কথা জেনেছি, মাংস আর গোশতের কথা জেনেছি। এই সূত্র ধরে মাননীয় পশুসম্পদ মন্ত্রীর কাছে একটা আর্জি করাই যায়। যেহেতু তিনি ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে মানুষের ভেতরে খুব সুন্দর একটা শ্রেনীবিভাগ দেখালেন। আশা করি তিনি এইভাবে গরু, ছাগল, হাস, মুরগি, মাছ, শাকসবজির ভেতরেও একটা শ্রেনীবিভাগ দেখাবেন। মালাউন গরু, মালাউন ছাগল…… মালাউন শাকসবজি। মুসলমান হয়ে আমরা নিশ্চয়ই মালাউন জিনিস খেতে পারি না। এগুলো তো ওরাও খায়।

মানুষ কবিতায় ফিরে আসি—

মসজিদে কাল শিরনি আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এল মুসাফির গায়ে আজারির চিন,
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা-ফাখা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’

তেড়িয়াঁ হইয়া হাকিল মোল্লা— “ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গো-ভাগারে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?”
ভুখারি কহিল, “না বাবা!” মোল্লা হাঁকিল— “তা’ হলে শালা,
সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

ভিখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে—
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু,
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!”

এই ক’টা লাইন আজকের কাঠ-মোল্লাদের প্রতি কতটা শক্ত জবাব আমি তা জানি না। যেহেতু তারা পারঙ্গম নিজস্ব দর্শন তৈরি করতে। আগে নামাজ এরপর সব কথা। নামাজ পড়লেন তো পাক্কা মুসলমান হয়ে গেলেন। বাইরে গিয়ে কাকে কি গালি দিলেন, কাকে ক্ষুধায় রাখলেন ওসব তো আল্লাহই দেখবেন। সত্যি কথা। আল্লাহই দেখেন। দেখেন বলেই ঐ ভিখারি আশি বছর আল্লাহকে না ডাকলেও আল্লাহ মুখ ফেরাননি। তবে আমরা স্রষ্টার দোহাই দিয়েই তার চেয়েও একধাপ এগিয়ে। আমরা মুখ ফেরাচ্ছি। আমরা তার সৃষ্টিকে মালাউন বলে গালি দেবো, তাদের গায়ে হাত তুলবো, প্রয়োজনে ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেবো। তারা তো আমাদের ধর্মের না। ঠিকই আছে। তবে কাজী নজরুল বেশ বিপাকে ফেলেছে, যখন তিনি লিখলেন—

ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হতে পারে হরিশ্চন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।

এ কি কথা, তিনি শিবের কথা লিখলেন? হরিশ্চন্দ্র? সে আবার কোথাকার কে?
তিনি আবার লিখলেন—

হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?

মানুষ শব্দটার ভেতর আমরা যখন হিন্দু আর মুসলমান ভাগ করে ফেলি তখনই একটা কাঁটাতার তৈরি হয়ে যায়। তখন আমাদের পাসপোর্ট লাগে, ভিসা লাগে। সীমান্ত প্রহরীর অনুমতি লাগে। তাদের বাড়ির আশেপাশে দিয়ে যাওয়া যায় না। সেখানে খাওয়া কিংবা বসা তো মহাপাপ। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কোন মুসলিম দেবী দুর্গার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে সেটাকে অসাম্প্রদায়িকতা বলি না, বলি ‘জাত গেল, জাত গেল’। অথচ এতসব মানুষ চায়নি। কেবল এতটুকু শান্তি। আমরা মুসলিম-মুসলিম ভাই ভাই। কেবল সবাই মিলে মানুষ-মানুষ হওয়াটা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আজ সিরিয়া কিংবা গাঁজাতে মানুষ মারা গেলে তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোটা মানবতা। মানবতা কেবল আটকে গেছে প্যারিসের সীমান্তে। হিন্দু কিংবা বিধর্মীদের বাড়ির আঙিনায়। তারা মরুক, গৃহহীন হোক। আমাদের কি? ওরা তো ভাই নয় আমাদের!

নজরুল লিখলেন—

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি’
ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে।
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;— গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!

মানুষ এনেছে গ্রন্থ;— গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো! — কী কথা! এই সময়ে তিনি লিখলে নিশ্চয়ই কল্লা হারাতেন। কারা যেন পবিত্র ক্বাবা শরিফের উপর শিবমুর্তি বসিয়েছে, এই নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যখন ভিন্ন মতাদর্শিরা পাথর ছুঁড়েছে, তাকে রক্তাক্ত করেছে। তিনি কেন চুপ ছিলেন। কেন জিবরাঈল (আঃ) কে নিষেধ করেছিলেন যাতে তাদেরকে পাহাড়চাপা না দেয়া হয়। কেন তিনি খোদার উদ্দেশ্যে হাত তুলে বলেছিলেন— ‘এদের ক্ষমা করো প্রভু, হেদায়েত দাও’। আজ ক্বাবা শরীফে শিব মুর্তি বসালেই ক্বাবা মিথ্যে হয়ে যাবে?

আমার ধর্ম, আমার রাসুল, আমার আল্লাহ ছোট হয়ে যাবে? এত দুর্বল ইসলাম? এত ঠুনকো আমাদের বিশ্বাস? ইসলামে কি মানুষতত্ত্ব নেই? জীবে প্রেম নেই? কীভাবে তাকে মারো মানুষ? তাকে মেরে তুমি স্রষ্টাকেই ছোট করছো না তো, ইসলামের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছো না তো? আরেকবার ভেবে দেখা যাক। মানুষের সামনে নাই ভাবলেন। একা বসে নিজের কাছে ভাবেন। খুব ক্ষতি হবে না। ধর্ম মানুষের শান্তিই চেয়েছিল। আমরা সেটার ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছি। প্যারিস আর সিরিয়ার দুঃখ; নাসিরনগর আর বাবরী মসজিদ ভাঙার দুঃখ পৃথক কেন হবে? হিন্দু মরলে, বিধর্মী মরলে তার কি মা থাকে না? ভাই থাকে না, বোন থাকে না, দুঃখ থাকে না? নজরুলেই ফিরে আসতে হয় আবার। ইসলামের ঝান্ডা উঁচুতেই তুলে ধরতেই এটা প্রয়োজন। খুব বেশি প্রয়োজন। মুখস্ত করো মানুষ—

হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!