বোর্হেসের অবশ্যপাঠ্য কবিতা এবং দুটি কথা

২৪ই Auguই, ২০২০ || ০১:৫০:৫০
28
Print Friendly, PDF & Email

লিটারেচার ডেস্কঃ

জীবনে আমরা কতো কবিতাই তো পড়লাম। মনে রেখেছি কয়টা। তবে কিছু কিছু কবিতার কথা আজও ভুলতে পারি না। অবসরে, কাজকর্মে, ভ্রমণে মাথার ভেতরে ঘুরে ঘুরে আসে। যেমন জীবনানন্দের ’ঘোড়া’, ’আকাশলীনা’ । জন কীটসের ’নাইটিংগেলের প্রতি।” বিনয় মজুমদারের ’একটি উজ্জল মাছ’ সহ কতো কবিতা। তেমনই এক কবিতার কথা বলছি আজ। আর্জেন্টাইন কবি হোর্হে লুইস বোর্হেসের কবিতা।



নির্দিষ্ট এই কবিতা ছাড়াও আরও অনেক লেখা আছে, এখন সবগুলোর নাম মনে পড়ছে না এক সাথে। কেন মনে থাকে হয়ত এর কিছু কারণ আছে। হয়তবা তার বিষয়, ভাষা তার উপস্থাপনা রচনাশৈলী অথবা কোন কারণ ছাড়াই ভালো লাগে। এমনিতেই-যেহেতু কবিতার কোনো ব্যাখ্যা হয় না আসলেই। এমনভাবে একটি কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কবিতার যে মাদকতা যে ব্যাখ্যহীন আবেশের আঁচড় আছে, আর আছে পাঠককে অনির্বচনীয় আনন্দপ্রদানের ক্ষমতা সেটি বুঝেছিলাম। আজো সেই আনন্দ পাই এই কবিতাটি পড়ে। একজন পাঠকের কাছে এই বুঝি কবিতার অমরতা! কবিতটির নাম ’এন্টিসিপেশন অব লাভ’ আর কবির নাম হোর্হে লুইস বোর্হেস। আসুন কবিতাটি একটু পড়ি।

Anticipation of Love
Jorge Luis Borges


Neither the intimacy of your look, your brow fair as a feast day
not the favour of your body, still mysterious, reserved, and childlike,
nor what comes to me of your life, settling in words or silence
will be so mysterious a gift
as the sight of your sleep enfolded
in the vigil of my arms.


Virgin again, miraculously, by the absolving power of sleep.
quiet and luminous like some happy thing recovered by memory,
you will give up that shore of your life that you yourself do not own.
Cast up into silence
I shall discern that ultimate beach of your being
and see you for the first time, perhaps,
as God must see you-


the fiction of Time destroyed,
free from love, from me.

কবিতাটির মূল বিষয় বা আয়োজন এরকম যে একটি নারী একটি পুরুষের হাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। পুরুষটি আশ্চর্য- নারী নয় প্রেম নয় নারীর সৌন্দর্যতাড়িত কোনো যৌনকাতরতা নয়- যে স্থিরতার নিঃসঙ্গ আনন্দভার- যার নাম ঘুম সেই ঘুমই তার লক্ষ্য।

সে অনুভব করছে ঘুমের সেই যাদুময়, ট্রান্সডেন্টাল শক্তিকে- যার স্পর্শে নারীটি আবার কুমারী হয়ে উঠছে। তারপর সেই পুরুষ ঘুমের মধ্যে প্রাপ্ত এই আশ্চর্য সুখী মুহূর্তের মালিক হতে চাইছে। সে দাবি করছে সেই ঘুমের মাধ্যমে প্রাপ্ত চূড়ান্ত শান্তিবাস বা নিষ্পাপতার মালিকানা যার মাধ্যমে সে দেখবে নারীকে প্রথমবারের মতো!

ঘুম এখানে গল্পের সেই সর্বনিরাময়ের প্রতীক যা ফিরিয়ে দেবে তার নির্জ্ঞানকে ফলত তার নিষ্পাপত্ব তার অসীমতাকেও। আর তার সাথে সাথে মুক্ত হয়ে পড়বে সে- নিষ্ঠুর টাইম-স্পেসের বন্ধন থেকে যা তাকে নশ্বরতার দণ্ডে দণ্ডিত করেছে। একদিকে এই ঘুম না-জন্মানোর আকুলতাকেই যেন নির্দেশ করছে-

যেমন জন্ম না নিলে কোনো কিছুই স্পর্শ করেনা মানুষকে- দঃখ জ্বরা এসব এমন কি ভালোবাসাও- যা মূলত দেওয়া-নেওয়ার মৌল স্বার্থপরতা তথা মৃত্যুতে বিলীন। তাই এই ঘুমের মাধ্যমে প্রাপ্ত- সৃষ্টির আদি মূহর্তে ফিরে গিয়ে এই আর্থলি মায়া থেকে সে মুক্তি কামনা করছে।

এ রকম অনুষঙ্গ কিন্তু আমাদের মনে করিয়ে দেয় জন কিটসের ’নাইটিংগেলের প্রতি’ বা এলিয়টের ’লাভ সং অব আলফ্রেড প্রুফক’ কে অথবা জীবনানেন্দর ‘বনলতা সেন’ কে। যেমন কবি কীটস পাখির মৃত্যুহীন সঙ্গীত শুনে ভুলে যেতে চাচ্ছে পৃথিবীর সন্তাপ জ্বরা আর মৃত্যুকে। আবার এলিয়ট চাইছে সেই মৎস্যকন্যার সাথে সমুদ্রের নিচে বেড়াতে- যেখানে তার তুচ্ছ জীবনের মৃত্যু দিয়ে সুন্দর এক জন্মের স্বাদ সে পাবে। যেমন জীবনানন্দ নাটোরের ‘বনলতা সেন’ নামক নারী-প্রকৃতির কাছে পেয়েছিলেন সেই ট্রান্সডেন্টাল শান্তি।(আসলেই কি পেয়েছিলেন!)

সবশেষে কবিতাটি পাঠে তিনটি প্রস্তাবনা থাকতে পারেঃ

প্রথমত শুধুমাত্র এর সুপারফিসিয়াল দিকটি ধরে একজন পাঠক একে পাঠ করতে পারেন। একটি নারী পুরুষের হাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ছে- এই রোমান্টিক মুহুর্তটির দিকে চোখ রেখে- বস্তুত যা নরনারীর ব্যক্তিগত ইন্দ্রিয়ঘন পরিবেশকে তথা আমাদের কোটি কোটি অর্থহীন নশ্বর সময়ের মধ্যে হঠাৎ প্রাপ্ত এমন অতি সুখের দিকটি মাথায় রেখে।

দ্বিতীয় পাঠ হতে পারে- এর ভেতরে লুক্কায়িত দুটি অভিজ্ঞতাকে- ম্যাটার(মানুষ) আর স্প্রিট(ঘুম)এর পাশাপাশি তুলনামূলক পাঠ করে। ফিজিক্যাল অস্তিত্ব পরিবর্তনশীল এবং ভঙ্গুর আর মেটাফিজিক্যাল অসীম অনন্ত। যার সাথে শেষ পর্যস্ত একটি স্প্রিচ্যুয়াল চিন্তাভাবনার যোগাযোগ আবিস্কার করা যায়।

তৃতীয় পাঠ- গ্রেকো-বিব্লিক্যাল আদি পাপকে মনে করে যেখানে মানুষ জ্ঞানফল খাওয়ার কারণে দোষী সাব্যস্ত, অশেষ দায় দায়িত্ব নিয়ে ব্যথিত এবং একটি দায়মোচনের প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে অবশেষে স্বর্গপ্রাপ্তি আশা করে। এখানে ঘুমের মাধ্যমে- সেই পাপক্ষয়ের একটি মুহূর্ত হিসাবে।

ভালোবাসার প্রত্যাশা
হোর্হে লুইস বোর্হেস

তোমার নিবিড় দৃষ্টি, ভ্রু যুগোল সুন্দর নয় কোনো উৎসবের মতো
তোমার শরীরের দান আর রহস্যময়, সংরক্ষিত, শিশুর মতো নয়।
আমার কাছে তোমার জীবন থেকে যা আসবে শব্দে অথবা নিঃশব্দে
রহস্যময় উপহার হবে না সেই দৃশ্যের মতো-

তুমি ঘুমিয়ে আছো আমার হাতের পাহারায়
অলৌকিকভাবে, ঘুমের নিরাময়ী শক্তিতে আবার কুমারী তুমি
শান্ত এবং উজ্জ্বল কিছু আনন্দময় মূহূর্ত যেমন জেগে ওঠে স্মৃতিতে।
তুমি ছেড়ে দেবে তোমার জীবনের এই সৈকতকে
যার মালিক তুমি নও।

নিজেকে নিঃশব্দের কাছে ছুঁড়ে দিয়ে
আমি আবিস্কার করবো তোমার সত্তার সেই চূড়ান্ত সমুদ্রতীর
সম্ভবত তোমাকে দেখবো আবার প্রথমবার
যেমন ঈশ্বর তোমাকে দেখেন।
সময়ের কাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়
ভালোবাসা থেকে মুক্ত, মুক্ত আমার থেকে।