ক্ষমতার অপপ্রয়োগঃ নেতিবাচক ফল

32
Print Friendly, PDF & Email

মো: নুরুজ্জামান:
শক্তির সাথে সেবা, কল্যাণ ও সন্মান নিবিড় সম্পর্ক-সুত্রে গাঁথা। মানুষ, জীব ও প্রকৃতির অফুরন্ত কল্যাণের জন্য প্রাপ্ত এ-ই ক্ষমতা কিন্তু কারও জীবনকালেই সীমাহীন নয়। সৃস্টিকর্তা, রাস্ট্র কিংবা কোন এজেন্সি এটি যোগ্য ব্যক্তিকে কিছুকালের জন্য কল্যাণকর কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আমানত হিসাবে দিয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। সমাজের মানুষ বা অনুগতরা যতক্ষন আপনাকে মানছে, ততক্ষন ই আপনি সন্মানিত, আপনার ক্ষমতাও থাকছে শাণিত/সুরক্ষিত। কেবলমাত্র ক্ষমতার যুক্তিসংগত প্রয়োগই আপনাকে সুরক্ষিত করতে পারে। এটির অযথা প্রয়োগ বা অহেতুক প্রদর্শণেচ্ছা ব্যক্তির জন্য কাঙখিত নাও হতে পারে।

পৃথিবীর সব শক্তিমানেরাই কিন্তু অস্ত্র বা দেহ শক্তি ব্যায় করে ক্ষমতাবান হননি। কেউ কেউ শুধু মাত্র মানুষকে ভালবেসে, ঐশী জ্ঞানের চর্চা করে কিংবা শুধুমাত্র মানুষের নিস্বার্থ সেবায় নিবেদিত থেকেই দেবতার আসনে বসেছেন। মহানবী (সাঃ) ন্যায় প্রচারের জন্য বহু যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্ত তিনি নিজের অস্ত্র দিয়ে কাউকে সামান্য আঘাতও দিয়েছেন; এমন তথ্য কারও কি জানা আছে? অথচ তিনিই কিন্তু ইহ ও পরজগতে সবচেয়ে শক্তিমান পুরুষ। মহামতি গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, কিংবা আলেকজান্ডার দি গ্রেট-কেউই কিন্তু নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেননি।

শক্তির বারবার প্রয়োগ কিংবা ভুল প্রয়োগের কারণে বহু সেনাপতির অস্ত্রের ধার কমে গিয়েছে, কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে করুণ ভাবে পরাজিত হয়েছেন। সমাজে ‘ক্ষমতার বাহাদুরী’ প্রদর্শনকারীকে গুটিকয়েক মানুষ খুশী হলেও কিন্তু তার ভুল ধরার জন্য ওঁত পেতে থাকে শত শত মানুষ, সেটার কারণেও এসব বাহ্যিক ক্ষমতা ধুলি ধুসরিত হয়ে যেতে পারে। ক্ষমতাবান মানুষ নিজে যতটা বিনয়ী কিংবা পরিমিতিবোধ সম্পন্ন হবেন, তার সন্মানের জায়গাটা ততই প্রসারিত হবে। ক্ষমতার প্রয়োগ কার ওপরে কিংবা কি পন্থায় করছেন, সেটাও কিন্তু মানুষ পর্যবেক্ষণ করছে।

দুর্বলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ অথবা একই সমান্তরালে সবল তথা ওপর তলার লোকদেরকে তোষামোদি করা চরম হিপোক্রেসি। মনে রাখা উচিৎ, এ ধরনের কথিত ক্ষমতাবানের ডুবন্ত তরীকে দুর্বলেরাও ডুবিয়ে দিতে পারে। ক্ষমতা থাকলেই যে সেটা সবক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে, সেটা কেবল অর্বাচীনেরাই ভেবে থাকে। মানুষ আর সমাজের কল্যানে শক্তির ব্যবহার অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু এটা অহেতুক চর্চা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ক্ষ্মমতার সহজ প্রকাশ ঘটে দম্ভ ও অহংকারের মত নেতিবাচক আচরণের মাধ্যমে। অথচ অহংকার কেবলই বিশ্ব জাহানের রবের জন্যই সংরক্ষিত। এটা স্রস্টার ‘গায়ের চাদর’; একে নিয়ে টানাটানি করা কিন্তু স্রস্টার অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ করার শামিল।

ক্ষমতার ব্যবহার আর জুলুমের সীমারেখা খুবই সুক্ষ। দুর্বিনীত, অহংকারী এবং জালিমের ওপর স্রস্টা, সৃস্টি ও প্রকৃতির ধারাবাহিক প্রতিশোধের ছক মাফিক চলতেই থাকে। সহজ কথায়; নিজের অসর্কতা, বাড়াবাড়ি এবং প্রদর্শনেচ্ছার কারনে যেকোন ক্ষমতাবান ব্যক্তিই নিজেকে ক্ষমাহীন অপরাধের জালে যেকোন সময় আটকে ফেলতে পারেন। ক্ষমতা প্রয়োগের কিন্তু উর্ধ ও নিম্নগামীতা রয়েছে। উর্ধতনের সুপারভিশন বা মনিটরিং সিস্টেম যেখানে দুর্বল, সেখানে কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রকট, মানুষের দুর্ভোগ এবং জুলুমের মাত্রাও সেখানে প্রলম্বিত।

দৃস্টান্ত তুলে না ধরলেও, সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত ক্ষমতার অপব্যবহার, অযাচিত ব্যবহার, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং দৃষ্টিকটু ব্যবহারের সামাজিক প্রতিক্রিয়া আমরা সবাই লক্ষ্য করছি। ক্ষমতার ন্যায়সংগত, ও গ্রহনযোগ্য প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আপনি আমি যেকোন সময়ই অরক্ষিত কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে অসন্মানিত হতে পারি। আল্লাহ প্রত্যেকটা পদক্ষেপে আমাদেরকে সুরক্ষিত রাখুন।

লেখকের ফেসবুক পোষ্ট থেকে।