শুভ বন্ধুত্ব দিবস

৩০ই জুলাই, ২০২০ || ১১:৫৪:০৮
90
Print Friendly, PDF & Email

সাবাব সামিন পূর্ব, ফেসবুক থেকে:
‘বন্ধু’ শব্দটি ছোট। কিন্তু এর গভীরতা অনেক। বন্ধুত্বের ব্যাপ্তি সীমাহীন। অন্তত একটা বন্ধু সকলের খুবই প্রয়োজন। বন্ধুহীন জীবন হলো লবণ ছাড়া তরকারির মতো। বন্ধুত্ব নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি রয়েছে আবেগ। সহজ কথায় সহজ ভাষায় এর সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাই আলাদা। আসলে ‘বন্ধু’ হল আমাদের জীবনে সেই বিশেষ মানুষ, যাদের অনেক সময় চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায়, বলে ফেলা যায় এমন অনেক কথা যা আপনি চাইলেও আর কাউকেই বলতে পারবেন না। কেন না বন্ধু হল মানুষের এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক।

পৃথিবীতে যত ধরনের সম্পর্ক আছে তার মাঝে সবচেয়ে মজার, সবচেয় জটিল, সবচেয়ে বিষ্ময়কর সম্পর্ক হল বন্ধুত্ব..। অন্য সব সম্পর্কের মতো বন্ধুত্বে কোনো বস্তুগত দায়বদ্ধতা নেই বললেই চলে। বাকি অনেক সম্পর্কের মতো বন্ধুত্বে কোনো আইনি বা পারিবারিক বাধ্যবাধকতাও নেই। বন্ধুত্বে অহংকার ও হিংসার স্থান নেই। ‘বন্ধুত্ব’ এমন একটা বিষয়, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবনের চেয়েও দামি হয়ে দাঁড়ায়। এমন নজির পৃথিবীতে বহু আছে। বন্ধুত্ব এমন একটি সম্পর্ক যাতে এক বন্ধু বিপদে পড়লে আরেক বন্ধু না জেনেবুঝেও আগুনে ঝাঁপ দিতে পারে। তবে আজকাল এমন বন্ধুর সংখ্যা খুব বেশি নেই।

বন্ধু জিনিসটা যে কী, সেটা বুঝতে বুঝতেই বেজে যায় স্কুলের শেষ ঘণ্টাটা। স্কুল জীবন পার হবে, কলেজ জীবনে পদার্পণ করতে হবে, কলেজ জীবনও শেষ হবে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে, দেখতে দেখতে একদিন প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ হবে। কিন্তু সেই স্কুল জীবনের স্বার্থপর, দুষ্টু বন্ধুর বন্ধুত্বটা শেষ হবে না। দীর্ঘদিন যোগাযোগ থেকে দূরে থাকা বন্ধুগুলো একই ছাদের নিচে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে। কিন্তু সবই প্রকৃতির লীলাখেলা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়াতে থাকে বন্ধুরা। পাল্টাতে থাকে বন্ধুদের পরিবেশ, সেই সঙ্গে পাল্টাতে থাকে মানসিকতা। বন্ধুত্বের বাঁধনটাও হয়ে যায় নড়বড়ে।

বন্ধুত্ব কখনো হারায় না, হারিয়ে যায় সেই মানুষগুলো, যারা বন্ধুত্বের মূল্যর কথা কখনো ভাবে না..।

পৃথিবীতে একটা সম্পর্ক কোনও কিছু কোনও শিকলে বন্দি থাকে না। সেটা শুধুই বন্ধুত্বে। বন্ধুত্ব মানেই হচ্ছে সমস্ত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়ে একে অপরের জন্য নিজের মতোই সবকিছু পছন্দে-অপছন্দে রাখা, একে অপরের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একজন আরেকজনের বন্ধু। এই বন্ধুর নাম ফ্রেন্ড। বন্ধুর নাম বন্ধু। বন্ধুর নাম দোস্ত। কেউ কেউ প্রভাবিত ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে ইয়ার কিংবা অন্য কোনও শব্দেও অভ্যস্ত। এসবের কিছুই আসলে ধরার মধ্যে নেই। বন্ধু এমন এক অসীম বিষয়, যেখানে ডাক ও সম্বোধন একদম কিছু না, কিছু না মানে কিছুই না।

ব্যস্ততার জন্য বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির জন্যে এখন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেকের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করা যায় না। তবে তাই বলে বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা কিন্তু কমে যায় না। বন্ধু তো একদিনের জন্য নয়। বন্ধু হচ্ছে সারা জীবনের পথ চলার অনুপ্রেরণা।

‘বন্ধু’ শব্দটিকে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্নভাবে বলা হয়। যেমন- আলবেনিয়া- মিল্ক, আফ্রিকা- ভ্রেন্ড, চীন- পেনজিউ, ডাচ- ভ্রেন্ড, ভ্রেঞ্জ, ডেনিশ- ভেন, ফ্রেঞ্চ- আমি, জার্মানী ফ্রিউন্ড, জর্জিয়ান- মেগোবারি, হাংগেরিয়ান– বারাট, হিন্দি- দোস, ইটালিয়ান- আমিকো, আইরিশ- কারা, জাপানি- টমোডাচি, কোরিয়ান- জিঙ্গু, ল্যাটিন- আ্যামিকাস, রাশিয়ান- প্রিজাটেল, সংস্কৃত- মিত্রা, স্পেনিশ– আমিগো।

বন্ধুত্ব হয় চিরদিনের। হতে পারে দু’জনে আলাদা কলেজ গিয়েছেন, আলাদা শহরে জীবন-যাপন করেন, প্রাত্যহিক জীবনের নানা কর্মকান্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, কিন্তু এত কিছুর পরও ভালো বন্ধুত্ব কখনোই হারিয়ে যায় না। দুজন ভালো বন্ধু কখনোই একে অপরকে ভুলে যাবে না, বরং আরো বেশি করে একে অপরকে মনে করবে এবং সময় পেলেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করে খুনসুটি করবে, এমনই হতে হবে বন্ধুত্ব। রাগ অভিমান করে পরস্পরকে ভুলে গেলে সেটা কখনোই প্রকৃত বন্ধুত্ব নয়। যেকোনো উপায়ে একে অপরের সাথে যুক্ত থাকা এবং মনের ভাব আদান-প্রদান করার চেষ্টার মধ্যদিয়ে বন্ধুত্বকে জিতিয়ে রাখতে হয়।

সত্যিই কোন রকম রক্ত সম্পর্কের না হওয়া সত্ত্বেও একজন মানুষ আরেকজন মানুষের এতো আপন হতে পারে এবং নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে সেটা একজন সত্যিকার বন্ধুর মাধ্যমেই উপলদ্ধি করা যায়।

সব নিয়ম-অনিয়ম, বিশ্বাস, নির্ভরত আর বাধভাঙ্গা সম্পর্কের মিলনস্থল হচ্ছে বন্ধু। বন্ধু কখনো শিক্ষক, কখনো সকল দুষ্টুমির একমাত্র সঙ্গী। মনের বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস, আবেগ আর ছেলেমানুষী হুল্লোড়ের অপর নামই তো বন্ধুত্ব। চলার পথে যে সম্পর্কে থাকেনা জাতিভেদ, যে সম্পর্ক থাকে সব বাঁধনের ঊর্ধ্বে। সেই তো বন্ধু। অর্থ দিয়ে কেনা যায় না বন্ধুত্ব, কিংবা গায়ের জোরেও হয় না বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব হলো, কখনো সিঁড়ির মতো আবার কখনো একটি বিশ্বস্ত হাতের মতো, যা আপনার শেষ সম্বল কখনো কখনো। সবাই আপনাকে ছেড়ে গেলেও আপনার বন্ধুরা সব সময় আপনার পাশে থাকবে। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও প্রিয় বন্ধুর জীবন বাচানোর মধ্যেই স্বার্থকতা।

বন্ধুত্বের যাত্রা কখনো শুরু হয় স্কুল থেকে, কখনো কলেজ থেকে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে। একসাথে খাবার ভাগ করে খাওয়া, পকেটে টাকা না থাকলে পকেট থেকে ছোঁ মেরে টাকা নিয়ে যাওয়া আর মজায় মজায় বিপদে ফেলা আবার তার থেকে তাকে বাঁচিয়ে আনা কেবল বন্ধুত্বেই হয়ে থাকে। বিপদের সময় যার কাঁধে মাথা রাখা যায়, সেই বন্ধু। যার কাছে মনের কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় সেই বন্ধু। যার সাথে রাতের পর রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায় সেই বন্ধু।

আমাদের সকলের মাঝে যেন বন্ধুত্ব চির সবুজ এবং সতেজ থাকুক সারা বেলা, সারা জীবন…।
পৃথিবীর সব মানুষের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক। সবার বন্ধুরা ভালো থাকুক।

লেখক: কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী।