করোনায় আইটি কোম্পানিগুলো টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে

৮ই জুন, ২০২০ || ০৯:৩১:০২
18
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট:
বৈশ্বিক মহামারি করোনায় অন্যান্য খাতের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতও মন্দায় পড়েছে। এই কয়েকমাসে আইটিভিত্তিক অর্ধেকেরও বেশি কাজ কমে গেছে। এতে কমেছে রফতানি আয়ও। ফলে বেতন দিয়ে কর্মী ধরে রাখাই এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাশপাশি রয়েছে অফিস ভাড়ার বোঝা।

এ পরিস্থিতিতে আগামী ছয় মাস আইটি কোম্পানিগুলোর টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ২০২৩ সাল নাগাদ তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে বছরে যে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা আছে, তা পূরণ নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। যদিও লক্ষ্য পূরণে সরকার এরই মধ্যে নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কতটুকু সফল হবে তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। বাংলাদেশের আইটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)’র তথ্যমতে, ২০১৫ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রফতানি আয় ছিল ৪৪৪ মিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। মূলত এই বছর থেকেই আইটি খাতকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৭ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে আয় আসে ৮০০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৮ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন এবং ২০১৯ সালে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় আসে। তবে এখন পর্যন্ত বেসিসের ২০২০ সালের মাসভিত্তিক তথ্য জানা যায়নি।

বেসিসের তথ্য মতে, দেশ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ২৮ লাখ (২ দশমিক ৮ মিলিয়ন) ডলারের সফটওয়্যার রফতানি হয়। ২০০৩ সালে দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সফটওয়্যার রফতানি শুরু হয়। পরে ধারবাহিকভাবে প্রতিবছরই সফটওয়্যার রফতানিতে আয় বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছিল, রফতানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্পকে ছাড়িয়ে যাবে আইটি খাত। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে।

এদিকে, করোনাকালীন ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ১৯টি প্যাকেজে ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যা দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়ে চিঠি দিয়েছে বেসিস। অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। অনেকে বাসায় বসে অফিস করছেন। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে ও বিশ্ববাজারে সফটওয়্যার এবং আইটিখাতের কাজ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। রফতানি চাহিদা কমে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসার মন্দা কমপক্ষে আরও ৬ মাস থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্থানীয় আইটিখাতে কমপক্ষে ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (স্থানীয় বাজারে ৫০০ মিলিয়ন ও রফতানিতে ৮০০ মিলিয়ন) ক্ষতি হতে পারে, যা টাকার অংকে ১১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। এই ক্ষতি বিবেচনায় বেসিস সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছে।

জানতে চাইলে বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘২০২৩ সাল নাগাদ বছরে আমাদের ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা আছে। গত বছর আমরা প্রথমবারের মতো এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি আয় করেছি। এ বছর এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে এরই মধ্যে এক বিলিয়ন ডলারের মতো ক্ষতি হয়েছে। ফলে এ বছর রফতানি আয় কমে যাবে। তবে কতটুকু কমবে, তা এখনও বলা যাচ্ছে না।’

অন্যান্য ব্যবসা বন্ধ থাকাই তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে বেসিস সভাপতি বলেন, ‘খাতটি অন্যান্য ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আইটি খাত প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে। এ কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু না হওয়া পর্যন্ত এই খাত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে না। এই সময়টা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পর খাতটিতে নতুন সুযোগ আসবে। নতুন নতুন সফটওয়্যারের প্রয়োজন পড়বে, কাজের ক্ষেত্র বাড়বে। এছাড়া দীর্ঘসময় এই অবস্থা চলতে থাকলে খাতটিতে জনবল ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আইটি কর্মীরা অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবে; যা খাতটির জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। সেইসঙ্গে অর্থায়নের সমস্যা তো সব সময় আছেই।’

বেসিসের সহ-সভাপতি ফারহানা এ রহমান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ৮০ শতাংশ কাজ বন্ধ আছে। এখনও আমরা স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারিনি। এভাবে যদি আগামী ছয় মাস যদি টিকে থাকা যায়, তাহলে অবস্থার উত্তরণ ঘটবে। তাই এই সময়টা পার করতে হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ বছরে যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা, সেটার চেয়ে হয়তো বেশি হবে। কারণ অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, টেলিমেডিসিন সফটওয়্যারের চাহিদা তৈরি হচ্ছে; আগে যেগুলোর বাজারই ছিল না। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আগামী ছয় মাস কোম্পানিগুলোকে টিকে থাকতে হবে।’

বেতন দিয়ে কর্মী ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ফারহানা বলেন, ‘টিকে থাকতে অনেককেই এখন খরচ কমাতে হবে। অফিস ভাড়াও এখন বার্ডেন হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা তুলে ধরতে হবে। চীন থেকে অনেক আইটি কোম্পানি স্থানান্তরিত হচ্ছে। জাপান এরই মধ্যে তাদের কোম্পানিগুলোর ফ্যাক্টরি চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। সেসব কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হলে অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে জাপান সরকার। এখন এই কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে হবে। এখানে বিনিয়োগ করলে, বাংলাদেশে ফ্যাক্টরি হলে, অনেক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এক্ষেত্রে সরকারসহ সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।’

এ বিষয়ে বেসিসের সাবেক সভাপতি শামীম আহসান বলেন, ‘২০২৩ সাল নাগাদ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার রিচ করা খুবই চ্যালেঞ্জ। এটি ২০২৫ সালের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়। যদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হয়, আইটি কোম্পানিগুলোকে অনলাইনে ক্যাম্পেইন করতে হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোসহ সবাইকে একসঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বহির্বিশ্বে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে তুলে ধরতে হবে। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে আইটি খাতে রিমোট ওয়ার্কিং টুলস, হেলথ কেয়ারসহ নানা সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

এদিকে, ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘রফতানির একটি বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে ই-কমার্সের মাধ্যমে। আমাজনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দেশের বিভিন্ন পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর মাধ্যমে রফতানি আয় বাড়ানো যাবে। এক্ষেত্রে পলিসিগত কিছু সমস্যা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে শুধু ফ্রিল্যান্সিংই নয়, বিপিওসহ আরও অনেক কাজ রয়েছে। দেশে বসেই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অফিস করা যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারকে সবধরনের সহযোগিতা দিতে হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বছরের ৫ বিলিয়ন ডলারের যে টার্গেট ধরা হয়েছে, সেটি তখনও বাস্তব ছিল না, এখনও বাস্তব নয়। কারণ ১ বিলিয়ন থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া সহজ কথা নয়। এছাড়া সামনের দিনগুলোতে একটু ভিন্নরকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হবে। হিসাব-নিকাশ নতুন করে করতে হবে। দক্ষতা বাড়াতে হবে। এখন যে দক্ষতা আমাদের দরকার যেমন- আইওটি, রোবটিক্স, বিগ ডাটা এসব কিন্তু দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়াচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘সফটওয়্যারেরর মার্কেট খুঁজেত গিয়ে আমরা ইউরোপ-আমেরিকাকে বেশি প্রধান্য দিয়েছি। আমার কাছে মনে হয় এটি বড় ধরনের একটি ভুল। আমার কাছে এশিয়ার বাজারকে আরও বড় মনে হয়। এই এলাকায় যদি আমরা মার্কেটিং করতে না পারি তাহলে বড় ভুল করব। টার্গেট অনুযায়ী অ্যাকশন প্ল্যান ছিল না। তারপরও মনে করি, আমাদের যে সুযোগ আছে তা কাজে লাগাতে পারলে পাঁচ থেকে সাত বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় অর্জন অসম্ভব না। তবে এ জন্য পদক্ষেপগুলো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি এসএমএস পাঠিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম বলেন, ‘করোনার কারণে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রফতানি নিয়ে আপনাদের জানা আছে। আমরা এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। দুয়েকদিনের মধ্যে তা চূড়ান্ত করা হবে। আমরা তো অনেক দূর এগিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে কিছুটা হোঁচট খেয়েছি। তবে ভবিষ্যতে পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাব।’