বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা: প্রভাব ও তাৎপর্য

৭ই জুন, ২০২০ || ০৯:৩৬:৪৯
49
Print Friendly, PDF & Email

ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল:
প্রেক্ষাপটঃ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বরাবরই শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিমপাকিস্তান। বিশেষ করে পাঞ্জাবি সামরিক ও বেসামরিক আমলারা যেভাবে চাইতেন সেভাবে দেশ শাসিত ও পরিচালিত হতো। প্রথমে তারা আঘাত করলেন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। তারপর আঘাত করলেন প্যারিটিব নামে সংখ্যাসাম্য চাপিয়ে দিয়ে। এরপর নড়বড়ে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল তাও বাতিল করে দিয়ে চাপানো হলো জবরদখলকারী সামরিক শাসন। এ সময় ঘোষিত হয় আওয়ামী লীগের তথা বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা। ৬-দফা ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের কাছ থেকে সত্যিকার এক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো, এতোদিন কার কায়েমি শাসন এবং শোষণের ভিত নড়ে উঠলো।

আওয়ামী লীগের ৬-দফাঃ

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনার জন্যে বিশেষ ৬-দফা দাবি পেশ করেন। এ ৬-দফাকে ‘বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ’ বলে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানবাসীদের বাঁচার দাবি হিসেবে ৬-দফা কর্মসূচি দেশবাসী ও ক্ষমতাসীন দলের বিবেচনার জন্যে পেশ করছি।’ বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবিত ৬-দফায় যা ছিল তার সংক্ষিপ্ত সার হলো :

  • ১ নং দফাঃ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার ফেডারেশন রূপে গড়তে হবে। তাতে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার থাকবে। সকল নির্বাচন সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত হবে। আইনসভাসমূহের সার্বভৌমত্ব থাকবে।
  • ২ নং দফাঃ ফেডারেশন সরকারের এখতিয়ারে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রীয় ব্যাপার—এ দুটি বিষয় থাকবে। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় স্টেটসমূহের (বর্তমান ব্যবস্থায় যাকে ‘প্রদেশ’ বলা হয়) হাতে থাকবে।
  • ৩ নং দফাঃ এ প্রস্তাবে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ দুটো থেকে যে-কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করলেই চলবে। ক. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রার প্রচলন করতে হবে। এ ব্যবস্থা অনুসারে টাকা-পয়সা কেন্দ্রের হাতে থাকবে না, আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে। খ. দুই অঞ্চলের জন্য একই টাকা থাকবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকবে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে যাতে পূর্বপাকিস্তানের টাকা পশ্চিমপাকিস্তানে পাচার হতে না পারে। এ বিধানে পাকিস্তানের একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।
  • ৪ নং দফাঃ সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা এবং কর ধার্য এবং তা আদায়ের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফেডারেল সরকারের সে ক্ষমতা থাকবে না। আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রাজস্বের নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে নিজ থেকেই জমা হয়ে যাবে। এ মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রেই থাকবে। এভাবে জমাকৃত টাকাতেই ফেডারেল সরকারের তহবিল হবে।
  • ৫ নং দফাঃ এ দফাতে বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে কয়েকটি শাসনতান্ত্রিক বিধানের সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো : ১. দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রাখতে হবে। ২. পূর্বপাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পূর্বপাকিস্তানের এখতিয়ারে এবং পশ্চিমপাকিস্তানের অর্জিত মুদ্রা পশ্চিমপাকিস্তানের এখতিয়ারে থাকবে। ৩. ফেডারেশনের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দুই অঞ্চল হতে সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রের নির্ধারিত হারাহারি মতে আদায় হবে। ৪. দেশিয় দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে উভয় অঞ্চলের মধ্যে আমদানি-রফতানি চলবে। ৫. ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্বন্ধে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের, বিদেশে ব্যবসায়িক অফিস স্থাপনের এবং আমদানি-রফতানি করার অধিকার আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করে শাসনতান্ত্রিক বিধান করতে হবে।
  • ৬ নং দফাঃ আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলো স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা-সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।

৬-দফার প্রভাব ও তাৎপর্যঃ

১৯৬৬ সালে যখন ৬-দফা ঘোষিত হয় তখনো জুলফিকার আলী ভুট্টো আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পশ্চিমপাকিস্তানের অন্যান্য নেতার মতো তিনিও এর ভেতরে পাকিস্তান বিভক্তির বীজ দেখতে পেলেন এবং ৬-দফা নিয়ে সরাসরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে প্রকাশ্য বাহাসে অবতীর্ণ হতে চাইলেন। আওয়ামীলীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে জানালেন ভুট্টো সাহেব যখন যেখানে চান আমরা বাহাসে বসতে রাজি আছি। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বের কঠোর মনোভাব দেখে ভুট্টো পিছু হটলেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, পরবর্তীকালে পূর্ববাংলার যারা ৬-দফার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিল তাদের পেছনে ভুট্টো ও অন্যান্য পাকিস্তানি নেতার মদদ ছিল। কোনো কোনো রাজনীতিক একে সি.আই.এ-র দলিল বলে অভিহিত করতেও কার্পণ্য করেননি।

সম্প্রতি হামদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট থেকে জানা যায়, পাকিস্তানে স্বেচ্ছা নির্বাসিত দুই বাঙালি নেতা নুরুল আমিন ও মাহমুদ আলী ৬-দফাকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের মস্তিষ্কজাত বলেও দাবি করেছেন। তাদের এ দাবির পেছনে রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছাড়া কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। যে ৬-দফার আন্দোলন আইয়ুবের পতন ঘটিয়েছে সেই ৬-দফার প্রণেতা তার বিশ্বস্ত তথ্যসচিব হন কী করে? এ সব বাঙালি নেতা কখনো দেশবাসীর আকাক্সক্ষাকে উপলব্ধি করতে পারেননি। ক্ষমতার জন্য তারা আজীবন পশ্চিমাদের তোয়াজ করে চলেছেন, শেষমেষ জন্মভুমি ছেড়ে পাকিস্তানকেই নিজের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

সমসাময়িক অন্য বাঙালি নেতারা ৬-দফার মর্মার্থ না বুঝলেও পশ্চিমপাকিস্তানি নেতারা ঠিকই বুঝেছিলেন। লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলন ভেঙে যায় ৬-দফার কারণেই। পশ্চিমপাকিস্তানি নেতারাও আইয়ুবের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন কিন্তু তারা কায়েমি স্বার্থ ত্যাগ করতে চাননি। রাজি হননি ক্ষমতা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে বাঙালির ন্যায্য অধিকার ছেড়ে দিতে। এ কারণেই আইয়ুব অস্ত্রের ভাষায় ৬-দফাকে স্তব্ধ করে দিতে চাইলে পশ্চিম পাকিস্তানের কেউ টু শব্দটি করেননি। ৬-দফা ঘোষণার অব্যবহিত পর ১৫ মার্চ চট্টগ্রামে এক জনসভায় প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঘোষণা করেন, ‘পাকিস্তান ধ্বংস করার অজুহাত হলো ৬-দফা। এটি একটি বীভৎস স্বপ্ন এবং যুক্তবাংলার পক্ষে একটি অবাস্তব কল্পনা বিলাস। এ কর্মসূচি পূর্বপাকিস্তানিদের দাসে পরিণত করবে।’

৬-দফা নিয়ে রাজনৈতিকমহলে যখন তীব্র বাদানুবাদ চলছিল দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের কয়েকজন প্রবীণ নেতা মিলে ‘পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ নামে একটি জোট গঠন করেন। এ জোটে পশ্চিমপাকিস্তান থেকে আজগর খান ও ওয়ালি খান এবং পূর্ববাংলা থেকে নুরুল আমিন, মাহমুদ আলী প্রমুখ ছিলেন। জোট আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ ৮-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। জোট নেতারা আওয়ামীলীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেও তাদের সাথে যোগ দেওয়ার আহবান জানালে তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, ৬-দফার ব্যাপারে কোনো আপোষ নয়। তবে নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের একটি অংশ জোটে যোগ দেয়। তারা পরবর্তীকালে পিডিএমপন্থী আওয়ামীলীগ হিসেবে পরিচিত হন।

৬-দফা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিজের ভাষ্য হলোঃ

১৯৬১ সালে আমার দেশবাসী জানতে চায়, পরিষ্কার রাস্তা কোথায়? বাঙালি চায় কী? তাদের সামনে কী আছে? তখন ‘ডিফেন্স অফ পাকিস্তান’ নামে একটা পদার্থ ছিল। ফান্ডামেন্টাল রাইট ছিল না, আইয়ুবের শাসন চলছিল তখন বাংলার মাটিতে। অত্যাচারের স্টিম রোলার চলছিল বাংলার মাটিতে—আমাদের চোখের সামনে। আমি আমার সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম—পরিষ্কার রাস্তা দিতে হবে। বাংলার মানুষকে এভাবে শোষিত হতে দিতে পারি না। মানুষকে একদিন মুক্ত করতে হবে। পরিষ্কার রাস্তা হিসেবে ৬-দফা দেওয়া হলো। আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করবেন বলে হুমকি দিলেন। আইয়ুব খান বুঝতে পারলেন ৬-দফা আওয়ামীলীগ কেন দিয়েছে? এর পেছনে উদ্দেশ্য কী? পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে পেছনে উদ্দেশ্য কী?

[১৯৭৪ সালে আওয়ামীলীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণ]

ঠিক এ ঘটনার ছয় মাস পরে ১৯৬৬ সালের ১৫ মার্চ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সর্বপ্রথম জানালেন যে, ‘পূর্বপাকিস্তানের নিরাপত্তার দুটি পরাশক্তির আলোচনার বিষয় ছিল। … সেপ্টেম্বরের যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক‚টনীতিবিদরা পোল্যান্ডের রাজধানী ওর্য়াসতে পূর্বপাকিস্তানের নিরাপত্তা বিষয়ে অবস্থা গ্রহণ করেন।’ কি অদ্ভুত কান্ড! যুদ্ধ হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে, প্রতিপক্ষের অস্ত্র তাক করে আছে পূর্ববাংলার সীমান্তে। ভুট্টোর এ হাস্যকর যুক্তির জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেনঃ

পূর্বপাকিস্তানকে ১৭ দিনের যুদ্ধকালীন সময়ে এতিমের মতো ফেলে রাখা হয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা যদি দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত লেফ্ট রাইট করে হেঁটে যেতো তবুও তাদেরকে বাঁধা দেওয়ার মতো অস্ত্র বা লোকবল কিছুই পূর্ববাংলার ছিল না। আর চীনই যদি আমাদের রক্ষা কর্তা হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানের বদলে চীনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেই হয়।

আমেরিকান গবেষক লরেন্স জিরিং এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ

The West Pakistani opposition leaders rejecred Mujib’s plan interpreting it was a seocessicnist and henee outside the purview of their deleberations … the Awami League programme pointed up the semi-independent character of East Pakistan and the Six demand were judged fundamental to a healthy relationship with in and between the provinces. But the west Pakistanis world have none of this and the Ayub Government joined with the politicians in continuning the proposal. (Bangladesh : from Mujib to Ershad : An inter-pretive Study)

বলা যায় যুক্তফ্রন্টের ২১-দফার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৬-দফার মিল আছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু ৫৪ সালে ২১-দফার প্রণেতারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই কেবল জড়িয়ে পড়লেন না, তারা নানাভাবে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে আপোস করতে থাকলেন। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক—যিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, কলকাতায় দুই বাংলার অভিন্নতা সম্পর্কে আবেগপ্রবণ মন্তব্য করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী দ্বারা বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি গভর্নর পদ টিকিয়ে রাখতে আবার সেই শাসকদের তোয়াজ করেছিলেন, ২১-দফার অন্যতম নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বাঙালির ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা ভুলে গিয়ে সংখ্যা লঘিষ্ঠ পশ্চিমপকিস্তানিদের সঙ্গে ‘প্যারিটি’ গড়ে তুলেছিলেন। আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পূর্ববাংলার ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হয়েছে বলে ঘোষণাও দিয়েছিলেন।

২১-দফার সবচেয়ে সাহসী নেতা মওলানা ভাসানী তখন নীতি ও আদর্শের ব্যাপারে অবিচল থেকেছিলেন সত্য, কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলেছিলেন এ কথাও কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু পরবর্তীকালে এ বয়োবৃদ্ধ রাজনীতিক আইয়ুবের বিশেষ দূত হয়ে চীন সফর করেছিলেন। ফিরে এসে বলেছিলেন ‘ডোন্ট ডিসটার্ব আইয়ুব।’ এরা তিনজনই আমাদের জাতীয় নেতা এবং বিভিন্ন সময় বাঙালির স্বাধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রেখেছেন। গণতন্ত্রের সংগ্রামেও তারা জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন। তারপরও এ-কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় পশ্চিমপাকিস্তানিদের সঙ্গে আপোস রফা করতে সচেষ্ট ছিলেন। ৬-দফা প্রণয়নকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেটি করেনি অথবা করার চেষ্টা কোনোদিনই করেননি। আর সে-কারণেই তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত আপোষহীন জননেতা, গণনায়ক।

৬-দফা পূর্ববর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনীতি ছিল মূলত প্রস্তুতিপর্ব। নিজেকে গড়ে তোলার। যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামীলীগ সরকারে তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রীত্ব তাঁর লক্ষ্য ছিল না, তাঁর লক্ষ্য ছিল আওয়ামীলীগকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা। মওলানা ভাসানী কিংবা সোহরাওয়ার্দী দলের প্রধান থাকতেও তিনি ছিলেন দলের মধ্যমণি, দলকে সংগঠিত করতে অনেক সময়ে নীতির বাইরেও কাজ করেছেন। দল ও কর্মীদের ব্যাপারে তার এ অন্ধ আনুগত্য জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি তার ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ, কলকাতায় ছাত্রাবস্থায় বলতে গেলে সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনীতিতে আসা।

কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সাহেব যখন ৫৬ সালে সংখ্যা সাম্যভিত্তিক সংবিধান মেনে নিলেন বঙ্গবন্ধুর তাতে আপত্তি ছিল। সোহরাওয়ার্দী বেঁচে থাকতে এ ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু না বললেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে তিনি তা প্রকাশ করেছেন। ১৯৬৪ সালে এক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ‘সেদিন পশ্চিমপাকিস্তানিদের বিশ্বাস করে আমাদের নেতা সোহরাওয়ার্দী প্যারিটি মেনে নিয়েছিলেন। আজ মনে হচ্ছে তাদের কথায় বিশ্বাস করা ভুল হয়েছে। আজ আমরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ন্যায্য হিস্যা চাই। এ জনসভায়ই আইয়ুবের মন্ত্রী খান এ. সবুরকে উদ্দেশ্য করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আরো বলেছিলেনঃ

‘মন্ত্রী ভায়া’, বাংলার ইতিহাস আপনি জানেন না। এই বাংলা মীরজাফরের বাংলা। আবার এই বাংলাই তিতুমীর, সুভাষ, নজরুল, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ইসলামাবাদীর বাংলা। এই বাংলা যদি একবার রুখে দাঁড়ায় তবে আপনাদের সেপাই বন্দুক কামান গোলা সবই স্রোতের শ্যাওলার মতো কোথায় ভেসে যাবে হদিসও পাবেন না।’
(১২ জুলাই ১৯৬৪ সাল, জুলুম প্রতিরোধ দিবসে দেওয়া ভাষণ)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন স্বৈরশাসক আইয়ুবের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত, ভুট্টো তখন আইয়ুবের মন্ত্রী। ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খান এক আদেশ বলেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে যে অভিনব শাসন পদ্ধতি দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন তার পরামর্শদাতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা জেলে। অনেকে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এলেও মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসেননি। ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুব এ মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করলে পূর্ববাংলা ও পশ্চিমপাকিস্তানে তার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন শুরু করে।

এ সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করলে পূর্ববাংলায় ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ২৪ জুন ৯ জন রাজনৈতিক নেতা যুক্ত বিবৃতি দেন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আইয়ুব প্রণীত শাসনতন্ত্র বাতিলের দাবিতে। এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, আবু হোসেন সরকার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, মাসুদ আলী, সৈয়দ আজিজুল হক, ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) এবং পীর মোহসেন উদ্দিন। ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের মুখে ১৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জামাআতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম ও মুসলিম লীগের একটি অংশের সমন¦য়ে গঠিত হয় ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ)। মূলত সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এ ফ্রন্টের উদ্যোক্তা। তার জীবদ্দশায় আওয়ামীলীগ পুনরুজ্জীবিত হয়নি। ১৯৬৪ সালে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করা হয়। ভিন্ন মতের কারণে তখন আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীণ নেতা এর বিরোধিতা করে দল ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর দল আওয়ামীলীগের উপর শাসক গোষ্ঠীর চরম আঘাতটি আসে ৬-দফা ঘোষণার অব্যবহিত পরই। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে বিরোধী দলের সম্মেলনে ৬-দফা প্রথম উত্থাপিত হয়। পরে মার্চের কাউন্সিলে ৬-দফাকে অনুমোদন করিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু। সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতিতে তিনি তখন দলের প্রায় একক কর্তৃত্বের অধিকারী। এ কাউন্সিলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামীলীগের সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। কাউন্সিল শেষ হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারা দেশে ৬-দফার পক্ষে প্রচারাভিযান শুরু করেন। কিন্তু তাঁর প্রচারাভিযান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জনসভা করতে যান সেখানেই মোনেম খানের পুলিশ তাড়া করে, জনসভা থেকে ফেরার পথে তাঁকে গ্রেফতার করে। আদালতের জামিন নিয়ে বেরিয়ে এলে পরবর্তী জনসভায় এলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রতিবারই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক বক্তব্য রাখার অভিযোগ আনা হয়। মাস খানেকের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ১৫-১৬টি মামলা হয়। এমন কি তাকে একবার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে জেলগেট থেকে ফের গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এ সময়ে পূর্বপাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খান দম্ভ করে বলেছিলেন,
‘আমি যতো দিন গভর্নর আছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ততো দিন জেলেই থাকতে হবে।’

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ‘পূর্বপাকিস্তানের বাঁচার দাবি’ ৬-দফা যখন ঘোষণা করেন, ঘোষণার সাথে সাথে জেনারেল আইয়ুব মুজিবকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে এবং দলের সদর দপ্তরে অভিযান চালায়। ঘটনাটি গোটা পূর্বপাকিস্তানে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এক বছরের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরগুলোতে আন্দোলন আরো বিস্তার লাভ করে। ১৯৬৬ সালের শেষ নাগাদ কয়েকশো লোক হতাহত হয়। দেশ প্রায় গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি।

পিন্ডির সামরিক সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা যায়। যদিও তখন আইয়ুব সূচিত বিপ্লবের মনুমেন্ট হিসেবে গড়ে উঠেছিল বিশালকায় নতুন রাজধানী ইসলামাবাদ। এ সময় জুলফিকার আলী ভুট্টো দেখলেন পশ্চিমপাকিস্তানে তার সমকক্ষ কোনো নেতা নেই। পূর্বপাকিস্তানে মুজিব জনপ্রিয়তার শীর্ষে। অতএব তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। নিজেকে পূর্বপাকিস্তানের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকায় এক প্রবন্ধ ফেঁদে বসলেন। ১৯৬৭ সালের ১২ জানুয়ারি ‘মাই ডিবাইট ইন জার্নালিজম’ প্রবন্ধে ভুট্টো লিখেছেনঃ

জন্মসূত্রে আমি একজন কৃষক এবং শিক্ষাগতভাবে আইনজীবী হওয়া সত্তে¡ও রাজনীতিই হচ্ছে আমার সকল অনুপ্রেরণার উৎস এবং এ-ক্ষেত্রেই স্থায়ী শিহরণ অনুভব করি। রাজনীতি একটি অত্যাধুনিক বিজ্ঞান এবং শিল্প … রাজনীতিকে অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে। এটি কখনোই নেতিবাচক মনোভাব, শ্লোগাননির্ভর এবং দস্যুতার শিহরণ-নির্ভর হতে পারে না।

ভুট্টো এ নিবন্ধে কারো নাম উল্লেখ না করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন। জেনারেল গুলহাসান—যিনি দু জনকেই চিনতেন, পরে বলেছেন, ‘আমরা এমন দু জন জনপ্রিয় নেতাকেই পেয়েছি এবং এদের কেউই সত্য কথা বলতেন না।’

ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনীতিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকান্ড’ বলে অভিহিত করলেও জেনারেল আইয়ুবের দমন-পীড়নকেও সমর্থন করেননি। অন্যত্র তিনি লিখেছেন ‘সন্ত্রাস অথবা নির্যাতন কোনোটিই রাজনৈতিক সমাধান নয়। সমালোচনা অবশ্যই সঠিক এবং সমাধান ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবমুখী হতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রতিহিংসা ও নিপীড়নের সম্পর্ক থাকতে পারে না। দু পক্ষের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য অবশ্যই থাকবে।’ তবে পরবর্তীকালে শাসনক্ষমতায় এসে ভুট্টো তাঁর নিজের কথারই বরখেলাপ করেছেন, বিরোধীদের উপর চালিয়েছেন অত্যাচারের স্টিম রোলার। ভুট্টো জেনারেল আইয়ুবকে উদ্দেশ্য করে ব্যক্তিগত শত্রুতা ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আইয়ুব তা কখনো ভুলে যাননি। তিনি শিয়া ধর্মাবলম্বী জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে নতুন সেনাবাহিনী প্রধান এবং এস.জি.এম. পীরজাদাকে অ্যাডজুট্যান্ট নিযুক্ত করেন। তারা দু জনেই উপলব্ধি করেছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো সহজ মনের মানুষ নন। তার সাথে পেরে উঠা আসলেই অত্যন্ত কঠিন।

এদিকে ৬-দফা’র প্রতিপক্ষ কেবল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব নন, পাঞ্জাব তথা পশ্চিমপাকিস্তানের সমগ্র শোষক গোষ্ঠী। বাংলার মানুষ তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পশ্চিমের ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার। ৬-দফা আন্দোলন দ্রুত আওয়ামীলীগকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। জনগণের মধ্যে এমন ধারণাও পরিলক্ষিত ছিল যে, পাঞ্জাবি ও পাঠান শাসনের অবসান ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালির স্বাধীনতার পথেই এগুচ্ছেন। কিন্তু এই সময় বঙ্গবন্ধুর নামে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। ৬-দফাকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রায় এক বছর ধরে মামলা সাজানো হয়। পরে আইয়ুব ভাবলেন, মুজিবের ৬-দফার বিরুদ্ধে আইনগত লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা খর্ব করাই উত্তম পথ। এ মামলা দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে এবং মামলা লড়ার পক্ষে ‘প্রমাণাদি’ যথেষ্ট ছিল না। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে চূড়ান্তভাবে মামলাটি পরিত্যাজ্য হয়।

১৯৬৮ সালে আইয়ুব যখন রোগশয্যায়, মুজিব জেলখানায় আর ভুট্টো তখন উচ্চকণ্ঠ রাজনীতিক হিসেবে আবির্ভুত হন। এ সময়ে তিনি সমগ্র পাকিস্তানের নেতা হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। বক্তৃতা-ভাষণেও তিনি পূর্বপাকিস্তানের জনগণের পক্ষে কথা বলেন। সিন্ধুর নওয়াব শাহ আইনজীবী সমিতির সমাবেশে ভুট্টো বলেন ‘অনেকেই বলে বেড়াচ্ছেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হতে চায়। আমি বিশ্বাস করি না, সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হতে চায়। পূর্বপাকিস্তানের মানুষ প্রভু নয়, বন্ধু চায়।’ এই সময়কালে ভুট্টো সরাসরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি এবং তাঁর ও আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে আনীত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ তুলে নেওয়ার দাবি জানান। ইতোমধ্যে পশ্চিমপাকিস্তানে ভুট্টোর দলের নেতা-কর্মীদেরও ব্যাপকভাবে ধরপাকড় শুরু হয়। পুলিশ পিপিপি আয়োজিত সভা ভেঙে তছনছ করে দেয়, কর্মীদের হয়রানী করে। দেশের উভয় অংশে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রাম ঠেকাতে সরকারি দমন-পীড়ন শুরু হয়।

শেষ কথাঃ

পৃথিবীর অবিসংবাদিত নেতা, বাংলার রাখাল রাজা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা শুধু পূর্ববাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেই উজ্জীবিত করেনি, পশ্চিমপাকিস্তানের ক্ষুদ্র প্রদেশসমূহের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। তারাও এর মধ্যে তাদের স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা দেখতে পেয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬-দফা ঘোষণা করেন। এর আগে সেপ্টেম্বরে সংঘটিত হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। যুদ্ধের সময়ে সমগ্র পূর্ববাংলা ছিল অরক্ষিত। পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাঞ্জাব রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালালেও এক হাজার মাইল দূরের বাংলা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। শেখ মুজিব ৬-দফায় তাঁর প্রদেশের এ সমস্যাটি তুলে ধারার পাশাপাশি প্যারা মিলিটারি গঠনের প্রস্তাব করেন। এ প্যারা মিলিটারি থাকবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রস্তাব যেমন পূর্ববাংলার মানুষের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল তেমনি সিন্ধু বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষও স্বাগত জানিয়েছিল। এ বিষয়ে তৎকালীন সিন্ধু রাজনীতিক ও বিশ্লেষক জিএম সৈয়দের ভাষ্য হচ্ছে, ‘প্যারা মিলিটারি গঠনসহ ৬-দফায় বর্ণিত প্রত্যেক প্রদেশের জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তসাশনের প্রস্তাবকে আমরা সর্বান্তঃকরণে সমর্থন জানাই।’

যদিও পাঞ্জাবি শাসকরা কখনো ৬-দফাকে ভালোভাবে দেখেনি। ৬-দফা ঘোষণার কিছুদিন পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। একই সময়ে জি.এম. সৈয়দ সিন্ধুতে এক ইউনিট বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুললে আইয়ুব শাহী তাকেও গ্রেফতার করে। জিএম সৈয়দ জানান, ৬-দফা ঘোষণা ও আইয়ুব কর্তৃক আগরতলা মামলা দায়েরের মাঝখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একবার পশ্চিমপাকিস্তান গিয়েছিলেন। তারিখটা ছিল ১০ আগস্ট ১৯৬৬। সিন্ধু মুত্তাহিদা মাহাজ-এর উদ্যোগে করাচির হোটেল মেট্রোপোলে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ সংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে সিন্ধুর নেতা বাঙালি নেতাকে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনার ৬-দফাকে সমর্থন করি। কেননা এতে প্রত্যেক প্রদেশের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা আছে। এরই পাশাপাশি আমাদের এক ইউনিট বিরোধী আন্দোলনেও আপনার সমর্থন চাই।’ তিনি আরো বললেন, ‘আপনি জানেন, আমাদের সমস্যাটি বিভিন্ন সময়ে আপনার দলের কাছে পেশ করেছি। আপনাদের মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমার করাচি বাসভবনে বসে এক ইউনিট বিরোধী আন্দোলনে আমাদের পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই। ফলে আজ তাঁর প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে আপনার কাছে আমাদের আবেদনটি রাখলাম।

এখানে স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই যে, ১৯৫৬ সালের সংবিধান কোনোভাবেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা অগণতান্ত্রিকভাবে গঠিত একটি পরিষদে এ আইন পাস হয়েছিল। পূর্বপাকিস্তানও ক্ষুদ্র প্রদেশগুলো (পশ্চিমপাকিস্তানে) এর ঐক্যের মাঝেই সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। আপনার প্রতি আছে ক্ষুদ্র প্রদেশসমূহের জনগণের দৃঢ় সমর্থন। পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনসহ জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্বপাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বকে ন্যায়সঙ্গত মনে করি। আমরা এবং আপনারা একই নৌকায়। আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনাদের সমর্থন দিয়ে যাব এবং আপনাদের কাছেও অনুরূপ সমর্থন আশা করব।’ এ অনুষ্ঠানেই আওয়ামীলীগ ও সিন্ধু মুত্তাহিদা মাহাজের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জি.এম. সৈয়দ ১৯৬৯ সালে বেলুচিস্তানে মুত্তাহিদা মাহাজ দল গঠনে সহায়তা করেন। তার চিন্তা ছিল বাংলা ও সিন্ধুর মতো অন্যান্য প্রদেশেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া। পশ্চিমপাকিস্তানের ক্ষুদ্র প্রদেশগুলোর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে শাসক গোষ্ঠী এক ইউনিট ভেঙে দিতে বাধ্য হবে। বিভিন্ন অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমন ও সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও এ ঐক্য সহায়ক হবে।

পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের বিবরণ দিতে গিয়ে জি. এম. সৈয়দ লিখেছেন, ‘আমরা প্রথম জনগণের বাক স্বাধীনতার কথা বলেছিলাম। কেননা কারো বাক স্বাধীনতা বন্ধ করে দিলে সে স্থান পূরণ করে বুলেট। বুলেট শুধু বুলেটের জন্ম দেয়, ছোরা দেয় নতুন ছোরার। এ কারণে আমরা চেয়েছিলাম পার্লামেন্টের মাধ্যমে এক ইউনিট প্রথা বিলোপ করে সিন্ধুর জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা হোক। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী আমাদের সেই কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয় নির্যাতনের মাধ্যমে। ১৯৬২ সালে চাপিয়ে দেওয়া শাসনতন্ত্র সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। এ সময়েই শাসকচক্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে। আওয়ামী লীগ নেতা ও তার সহযোগীদের উপর নির্যাতন চালানো হয়। সেনাবাহিনী মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে অন্তরীণ অবস্থায় হত্যা করে। পূর্ববাংলা জুড়ে আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে। ছাত্র তরুণসহ সকল স্তরের মানুষ কারফিউ ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। আইয়ুবের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে পাঞ্জাবি আমলা-মিলিটারি চক্র নকল হিরো হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে মাঠে নামায়। এ ভুট্টো ছিল আইয়ুব খানের মন্ত্রী এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। প্রকৃতপক্ষে ষাটের আন্দোলন এবং ৬-দফা ছিল জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতালের পর সরকার ৬-দফা’র আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য চরমপন্থা অবলম্বন করে। ১৩ জুনের মধ্যে পুলিশ আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় স্তরের ৯,৩৩০ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে। ১৫ জুন ‘ইত্তেফাক’-এর সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুুন ‘ইত্তেফাক’ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। এভাবে ৬-দফা’র আন্দোলনকে সাময়িকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হলেও আইয়ুব সরকারের শেষ রক্ষা হয়নি। ৬-দফা’র আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে জনতা স্বাধিকারের আন্দোলনে পরিণত করে এবং পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যেই স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করে। এজন্যেই বলা হয় যে, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা কর্মসূচীর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল।

১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিদানে বাধ্য হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে শেখ মুজিব বাঙালির মুক্তির দাবি ৬-দফা আদায়ে আরো সোচ্চার হয়ে ওঠেন। তিনি ৬-দফা প্রশ্নে কোনো দলের সঙ্গে আপোস করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে এটি ছিল আওয়ামীলীগের প্রধান নির্বাচনী ইস্তেহার। নির্বানে শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা’র পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করেন। কিন্তু‘ জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের সাথে রাজনৈতিক মীমাংসার আগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অনষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানে অসম্মতি জানান। এরই পেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় নেতৃবৃন্দসহ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। কিন্তু‘ তা ফলপ্রসূ হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে ৬-দফা কর্মসূচীর পরিসমাপ্তি ঘটে এবং নয় মাস যুদ্ধ করে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে।

ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক