৭ জুন ১৯৬৬; ৭ জুন ২০২০

৭ই জুন, ২০২০ || ০৬:৪৮:১৪
21
Print Friendly, PDF & Email

সুভাষ সিংহ রায়:
প্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ষাটের দশকের কোন এক সময়ে লন্ডনে বিবিসি’তে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সে সময়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক দু’একজন বন্ধুকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে সামনে পেয়েই সৈয়দ হক জিজ্ঞেস করে বসলেন, ছয়দফা কি একটু সহজে বুঝিয়ে দেবেন। বঙ্গবন্ধু তিনটে আঙ্গুল দেখিয়ে বলেছিলেন, আমার আসলে তিন দফা। কত নিছো? কবে দিবা? কবে যাবা?

১৯৪০ সালে লাহোর গিয়েছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। উত্থাপন করেছিলেন লাহোর প্রস্তাব। তা গৃহীত হয়েছিল। তৃপ্তমনে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু জিন্নাহ ১৯৪৬ সালে দিল্লির কনভেনশনে ‘স্টেটস’কে ‘স্টেস’ করে দেন। এই ‘এস’ এর মাহাত্ম বুঝতে সময় লেগেছে বাঙালির। এর ২৫ বছর পর লাহোর যাত্রা করলেন আরেক বাঙালি, শেখ মুজিবুর রহমান। সেই ‘এস’ এর কথা মনে রেখেই করেছিলেন প্রস্তাব। তা প্রত্যাখ্যাত তো হলোই বরং বিচ্ছিন্নতাবাদী উপাধি নিয়ে ব্যর্থ মনে ফিরলেন ঢাকায়। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা একটি বই ‘দুই বাঙ্গালির লাহোর যাত্রা’ থেকে কয়েকটি লাইন তুলে ধরা যেতে পারে:

“বাংলার নেতা এ কে ফজলুল হকের জীবনে সবচেয়ে বড় কাজ কোনটি? ঋণসালিসী বোর্ড প্রতিষ্ঠা, না-কি পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন? দুটি দুই মাত্রার কাজ এবং উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ। গোটা পাকিস্তান আমলজুড়ে শুনেছি আমরা যে, হক সাহেব বিখ্যাত এই জন্য যে তিনি লাহোর গিয়ে সেই বিখ্যাত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন, যার ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হ্যাঁ, ঋণসালিসী বোর্ডের ব্যাপারটাও শোনা গেছে। বাংলার কৃষককে মহাজনী শোষণের জোয়াল থেকে মুক্ত করবার জন্য ওই সালিসী বোর্ডের প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। ভালো কাজ, সন্দেহ কী। কিন্তু কোন্টা কত ভালো? বাংলাদেশে আজ আমরা কাজ দুটিকে নতুন করে মূল্যায়ন করবো নিশ্চয়ই। আমরা যে কৃষকপ্রিয় হয়েছি হঠাৎ করে তা নয়, তবে পাকিস্তানকে সেই দৃষ্টিতে এখন আর দেখি না, যে দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা পাকিস্তান আমলে আমরা খুব করে পেয়েছিলাম। এখন পরিপ্রেক্ষিত বদলেছে, মূল্যায়নও রূপ নিয়েছে ভিন্নতর। কিন্তু সত্য এটা যে, ১৯৪০-এর সেই প্রস্তাবটি বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকই উত্থাপন করেছিলেন। প্রস্তাবটি তাঁর নয়, মুসলিম লীগের। ভারতীয় মুসলিম লীগের সুপ্রিম কাউন্সিলে মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয় ওই বছর মার্চ মাসের ২১ তারিখে। পরের দিন অর্থাৎ ২২ তারিখে কাউন্সিল অধিবেশনে ওটি উত্থাপন করার কথা; উত্থাপন মানে ঘোষণা দেওয়া আসলে। কিন্তু ২২ তারিখে তা করা হয়নি; করা হয়েছে ২৩ তারিখে। কারণ আর কিছুই নয়, হক সাহেবের অনুপস্থিতি। ফজলুল হক তখনও এসে পৌঁছাননি, এলেন তিনি ২৩ তারিখে; তাই ২৩ তারিখেই প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো। তিনিই করলেন। সেই দিনই তিনি ‘শেরে বাংলা’ উপাধি পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেলেন। জিন্নাহ সাহেবই দিলেন, হক সাহেবের জনপ্রিয়তা দেখে নয়, সেটা দেখা গিয়েছিল অবশ্যই, উপস্থিত সদস্যরা সকলে উঠে দাঁড়িয়েছিল একসঙ্গে, বাংলার প্রধানমন্ত্রী প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে, ধ্বনি উঠেছিল তাৎক্ষণিকভাবে। জিন্নাহ সাহেব বললেন, ‘টাইগার অব বেঙ্গল’ এসে গেছেন, খুশি করবার জন্যই বললেন মনে হয়, খুশি করা প্রয়োজন ছিল। স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ওই প্রস্তাবের তখনো নামকরণ হয়নি, পরে সেটা নাম পেলো পাকিস্তান প্রস্তাবের এবং মোটামুটি তার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠা ঘটলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের, সাত বছর পরে, ১৯৪৭ সালে।

ওই লাহোরেই আরেক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন বাংলার আরেক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ২৬ বছর পরে, ওই মার্চ মাসের কাছাকাছি সময়েই, ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধীদলীয় নেতাদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো এবং সেখানে প্রস্তাব এলো সম্পূর্ণ উল্টো ধরনের; ৬-দফার; স্পষ্ট কথায় বলতে গেলে পাকিস্তান ভাঙার। এক বাঙালী প্রস্তাব করেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার, আরেক বাঙালী প্রস্তাব করলেন পাকিস্তান ভাঙার।

একই শহরে সময়ের কিছুটা ব্যবধানে। দুজনের প্রস্তাবই করলেন পাকিস্তান ভাঙার। দুজনের প্রস্তাব কার্যকর হয়েছে। লাহোরে উত্থাপিত এক প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; আরেক প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ভেঙে চুরমার হয়েছে।

অস্বাভাবিক ছিল কি ওই দুটি কাজ? ওই দুই উত্থাপন; প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এক বাঙালীর, ভাঙার প্রস্তাব আরেকজনের? না, হক সাহেবের কাজটা মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি ছিলেন স্রোতের সঙ্গে। ওই প্রস্তাব উত্থাপন তাঁর জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনেনি। কিন্তু শেখ মুজিবের কাজটা ছিল বিপজ্জনক। লাহোর শহর তাঁর ৬ দফার কথা শোনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আইয়ুব তো সঙ্গে সঙ্গেই গর্জন করে উঠেছিলেন। শেখ মুজিবকে জেলে যেতে হয়েছে, ঝুঁকি নিতে হয়েছে ফাঁসিকাষ্ঠে চড়বার। তবে হ্যাঁ, ওই প্রস্তাব তাঁকে জনপ্রিয় করেছিল বাঙালীদের মধ্যে। যেমন হক সাহেবের প্রস্তাব জনপ্রিয় করেছিল তাঁকে মুসলমানদের মধ্যে।”

ছয় দফার তাৎক্ষণিক পটভূমি হিসেবে ১৯৬৫ সাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একই বছর মৌলিক গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনী প্রহসন বাঙালিদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করে। পরের বছর ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের জাতীয় কনভেনশন লাহোরে অনুষ্ঠিত হয়। এই কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। লাহোরে বাধা পেয়ে তিনি ঢাকার তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর গণমাধ্যমে ছয় দফার বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন। বঙ্গবন্ধু ‘৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলোর এক কনভেনশনে বাংলার গণমানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবি সংবলিত বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ খ্যাত ঐতিহাসিক ছয় দফা উত্থাপন করে তা বিষয়সূচিতে অন্তর্ভূক্ত করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু সভার সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী এ দাবি নিয়ে আলোচনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে ১১ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ছয় দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দলীয় কর্মী বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণ ছাত্রলীগ নেতৃত্বের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য। ১৯৬৬ সালে ১৮ থেকে ২০ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাজউদ্দিন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এই কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা দলীয় ফোরামে পাস হয়েছিল । ১৯৬৬ সালের ১০ মের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৫০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু এটি আঁচ করে সংগঠনকে যতোটা পারেন গুছিয়েছেন। কয়েকটি করা হয়েছিল। একবার গ্রেফতার হলে আরেকবার আন্দোলন সংগঠন করবে এই ছিল কৌশল। এই সময় ছাত্রলীগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল অধিবেশনটি ছিল বাঙালির ইতিহাসে বাঁক পরিবর্তন; যা ‘৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন ও ‘৭১-এর মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল। স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘এই আন্দোলনে রাজপথে যদি আমাদের একলা চলতে হয় চলবো। ভবিষ্যৎ ইতিহাস প্রমাণ করে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ।’ কাউন্সিল অধিবেশনের পর বঙ্গবন্ধু সারাদেশ চষে বেড়ান। ৩৫ দিনে মোট ৩২টি জনসভায় তিনি বক্তৃতা করেন। রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস হচ্ছে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা যিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন ব্যতিরেকেই ৬ দফা উপস্থাপন করেছিলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হলেও শেখ মুজিব ছয় দফা পেশ করেন তাঁর ব্যক্তিগত সুপারিশ হিসেবে। কয়েক সপ্তাহ পরেই আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি দলের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ছয় দফাকে অনুমোদন করিয়ে নেন। ছয় দফা না দিলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দলের নেতাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসত না। সরকার আগরতলা মামলাও হয়তো ফেঁদে বসত না। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ম্যান্ডেটও ও রকম হতো না। তার পরের ইতিহাস সকলেরই জানা। পূর্ববঙ্গে যারা ৬ দফার সমালোচনা করেছিলেন তাদের একটা বড় সংখ্যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন।

মুক্তিকামী বাঙালির আন্দোলনের খবরে তিনি খুশি হচ্ছেন, তাদের ওপর নির্যাতনের খবরে বিচলিত হচ্ছেন। কিন্তু কখনও তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি। ১৯৬৬-এর ৬ জুন তিনি লিখেছেন-“ত্যাগ বৃথা যাবে না, যায় নাই কোনো দিন। নিজে ভোগ নাও করতে পারি, দেখে যেতে নাও পারি, তবে ভবিষ্যৎ বংশধররা আজাদী ভোগ করবে। কারাগারের পাষাণ প্রাচীর আমাকেও পাষাণ করে তুলেছে। এ দেশের লাখ লাখ কোটি কোটি মা-বোনের দোয়া আছে আমাদের ওপর। জয়ী আমরা হবই। ত্যাগের মাধ্যমে আদর্শের জয় হয়।”

আবার বঙ্গবন্ধু ৮ জুন তাঁর খাতায় লিখেছিলেন এভাবে। “ছয়দফা যে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রাণের দাবি-পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকশ্রেণী যে আর পূর্ববাংলার নির্যাতিত গরীব জনসাধারণকে শোষণ বেশি দিন করতে পারবেনা, সে কথা আমি এবার জেলে এসেই বুঝতে পেরেছি। বিশেষ করে ৭ই জুনের যে প্রতিবাদে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মানুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবে ফেটে পড়েছে, কোনো শাসকের চক্ষু রাঙানি তাদের দমাতে পারবে না। পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্য শাসকশ্রেণীর ছয়-দফা মেনে নিয়ে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করা উচিত। যে রক্ত আজ আমার দেশের ভাইদের বুক থেকে বেরিয়ে ঢাকার পিচঢালা কাল রাস্তা লাল করল, সে রক্ত বৃথা যেতে পারে না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেভাবে এ দেশের ছাত্র-জনসাধারণ জীবন দিয়েছিল তারই বিনিময়ে বাংলা আজ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। রক্ত বৃথা যায় না। যারা হাসতে হাসতে জীবন দিল, আহত হলো, গ্রেপ্তার হলো, নির্যাতন সহ্য করল তাদের প্রতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতি নীরব প্রাণের সহানুভূতি ছাড়া জেলবন্দি আমি আর কি দিতে পারি! আল্লাহর কাছে এই কারাগারে বসে তাদের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে মোনাজাত করলাম। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এদের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না, সংগ্রাম চালিয়ে যাবো। যা কপালে আছে তাই হবে। জনগণ তাদের দাম দেয়। ত্যাগের মাধ্যমেই জনগণের দাবি আদায় করতে হবে।”
৭ জুন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। ৮ তারিখের পত্রিকা পাওয়া যায়নি। ৯ জুন দৈনিক সংবাদে সরকারি একটি প্রেস নোট ছাপা হয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করলে রক্ষণশীল একটি হিসাব পাওয়া যাবে। ৭ জুন সম্পর্কে পরবর্তীকালেও বিস্তারিত কেউ লেখেননি। ৮ জুন ইত্তেফাক, সংবাদ বন্ধ থাকে। দৈনিক সংবাদ ৯ জুন তারিখে নাটকীয়ভাবে শিরোনাম দেয়- ‘আমাদের নীরব প্রতিবাদ’-“যে মর্মান্তিক বেদনাকে ভাষা দেওয়া যায় না, সেখানে নীরবতাই একমাত্র ভাষা। তাই গতকল্য সংবাদ প্রকাশিত হইতে পারে নাই। আমাদের এই নীরব প্রতিবাদ একক হইলেও আমাদের পাঠকরাও শরীক হইলেন, ইহা আমরা ধরিয়া লইতেছি।”

নতুন প্রজন্মের সামনে আমরা কি বঙ্গবন্ধু’র ছয় দফাসহ তাঁর সংগ্রামের ইতিহাসগুলো উন্মোচন করতে পেরেছি কিনা। জানবার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি। ১৯৯২ সালে প্রোব বার্তা সংস্থা নামে একটি প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মাত্র ২০টি প্রশ্ন নিয়ে ঢাকা মহানগরের ২০০টি স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জরিপ করেছিল। দূভাগ্যজনক হলেও সত্য যে সেই জরিপে অংশগ্রহনকারী ৮৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। কেননা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর টানা একুশ বছর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির দখলে ছিল। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের টানা ১১ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকার কারনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মোচিত হয়েছে।

দু’বছর আগে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এক আলোচনা সভায় বলেছিলেন,‘ দেশে এখন যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বঙ্গবন্ধুকে জানার, উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই আহবান থাকবে, তারা যেন বঙ্গবন্ধুকে জানার চেষ্টা করে। নতুন প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার চেষ্টা করে। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর নাম এ দেশ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। পারা যায়নি। বঙ্গবন্ধু এমনই এক মানুষ, যিনি আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করেছিলেন।’ ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আর ২০২০ সালের ৭ জুনের ৫৪ বছরের ব্যবধান। আজ আমরা যে সমৃদ্ধ অগ্রগতি যে জায়গায় এসে পৌঁছেছি তা বঙ্গবন্ধু ছয়দফার আন্দোলন থেকে উৎসরিত। এই মর্মকথা মর্মে ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনাকে ধারন করে উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণে কোন নেতা, কোন রাজনৈতিক দল উপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে পারবে, সেই সিদ্ধান্ত তরুণ প্রজন্মকে ভেবেচিন্তে নিতে হবে। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, গত এগারো বছর ধরে নানা প্রতিকূলতা পায়ে দলে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় তিন গুণ করেছেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করেছেন তাই তাঁকেই নতুন প্রজন্ম সমর্থন দেবে।
সুভাষ সিংহ রায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক