করোনার উপসর্গে চিকিৎসার অভাবেই মারা যাওয়া সেই আহাদের স্বজনের আবেগঘন স্ট্যাটাস

৭ই জুন, ২০২০ || ০৯:০১:১১
53
Print Friendly, PDF & Email

তানজির হোসেন, ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে:
বুকের বাপাশে চিন্ চিন্ ব্যথাটা এখনো ভালোই টের পাচ্ছি। ভাবছি অনেক সময় খাওয়া হয়নি তাই বোধ করি একটু ব্যথা করছে। নিমিশেই সব এলোমেলো। অনুভূত হচ্ছে তোর চলে যাওয়া।

তুই অভিমান করে চলে যাবি- তো একটু সময় তো দিবি। কতজনই তো দিনের পর দিন হাসপাতালের বিছানায় প্রহর গোণে মৃত্যুর। আমরা না হয় সেভাবেই তোকে চোখের সামনে রেখে বিদায় দিতাম।

শরীরে জ্বর আর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজধানী ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে অসুস্থ স্বামী নুর আল আহাদকে নিয়ে পাগলের মত ঘুরেছেন স্ত্রী রিনা ইসলাম। কিন্তু করোনা উপসর্গ দেখে সব হাসপাতালই ভর্তি না নিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। এভাবে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দুদিন আগে (৫ জুন) চোখের সামনেই বিনা চিকিৎসায় স্বামীকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন স্ত্রী রিনা ইসলাম।

কুষ্টিয়ার খোকসার একতারপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের শহীদুল ইসলাম বিশ্বাস ও নুর নাহার দম্পতির একমাত্র সন্তান নুর আল আহাদের (৩২) অস্বাভাবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত এই মৃত্যু নিয়ে নিজের ফেসবুকে আজ এক আবেগপূর্ণ স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার স্বজন তানজির হোসেন। সেই স্ট্যাটাসটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

তানজির হোসেন তার স্ট্যাটাসে আরও বলেন, ছোটবেলায় তোকে সবাই মিলে কাদাতাম জানিস! একটু ধমক দিলে বা জোরে কথা বলেলই তুই কাদতিস। আজকে কী সেই শোধ নিতেই তুই সবাইকে এভাবে কাদারিলে? চোখের পানি তো আটকাতে পারি না। মাঝরাত, সকাল, দুপুর যখনই হোক চোখের পানি ঠেকাতে পারিনা রে।

এই তো সেদিনের কথা তোর অনার্স শেষ হবার পর মামা-মামী বলায় তোকে ঢাকা আনলাম মাস্টার্স করার জন্য। স্কুলের বিকেলের কোচিং, কয়েকটা টিউশনি, একটা সমিতির পার্ট টাইম সময় দেওয়াসহ তোর সব কিছুই তো করেছি আমরা। তুই মাস্টার্স ফাস্ট ক্লাস পাবার পরও তুই সরকারী চাকুরীর তেমন চেষ্টা করলি না। তোর তো ইন্টারভিউ বোর্ডকে অনেক ভয়! সেই ভয়ই তোকে আমাদের থেকে দূরে নিয়ে গেল। অনেক দূরে।

সবাই নিয়ে তোর অনেক রাগ-অভিমান ছিল। অফিস শেষে আমাকে এসে বললে, একটু বুঝিয়ে দিলেই তুই তো মাটির মানুষ হয়ে যেতিস! এখনো তো আমি প্রতিক্ষায় ছিলামরে তোর মান ভাঙাতে। কিছুই বললি না আমায়। তবে কি এবার আমার উপরেই তোর অভিমান ছিলরে।

জানি স-ব আগের নিয়মে চলবে। সবাই সব ভুলে যাবে। থাকবে না করোনার অকাল প্রাণহানি। কিন্তু আমি তো ফোন দিলেই পাবো না প্রিন্টারের কালি। পাবোনা কাউকে তোর মতো দায়িত্ব নিয়ে অনলাইন প্রজেক্ট শেষ করাতে। তুই খুব পছন্দ করতি W. Contact এই ফাইলের কাজ। এই ফাইলের নামটাই বদলে দিলামরে। তোর নিজের জন্য ফ্রিল্যান্সারে একটা প্রোফাইল রেডি করালাম। যাতে ইনকামের চাকাটা ভালোভাবে ঘুরে। তোকে কয়েকটা প্রজেক্ট পাইয়ে দিলাম। তুই যাতে ভালো থাকিস, থাকতে পারিস তাই তোকে সবচেয়ে বেশি দিয়েছি সব সময়। তোর টাকার প্রয়োজন হলেও আমি পূরণ করতাম। আজ আর এই প্রতিদান দিলি! এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবি? ভুলতে পারি না-রে।

জানি তোর মনে অনেক কষ্ট ছিল। তুই সবকিছু মনে চাঁপা দিতিস আর শুধু আমাকে বলতিস। কারো সাথে ঝগড়া করা শিখিসনি, জোরে কথা বললেই তোর গা কেঁপে উঠত। সেই তুই কিনা আবারও কষ্টের পাহাড় বুকে চাঁপা দিয়েই চলে গেলি। একবারও বললি না তোর নি:শ্বাস নিতে এত কষ্ট হচ্ছে! এখন তো আমাদেরও নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তোর জন্য। শুধু তোর জন্য।

তুই কি জানিস মানুষ তোকে কত ভালোবাসে? তোর জন্য আজ সারা বাংলাদেশ কাঁদে। সারা পত্রিকায় আজ তোর খবর। সত্যিই এখবর দেখতে চাইনিরে। তুই শুধু কাঁদাতেই এসেছিসরে। তোর জন্য ঢাকা শহরের সব বড় বড় হাসপাতালে ফোন করেছি। শুধু তোকে একটু বুক ভরে নি:শ্বাস নেওয়ার জন্য আইসিইউ সাপোর্ট দিতে। কেউ রাজি হয়নি করোনার ভয়ে। পারিনি রে। সত্যিই পারিনি। ক্ষমা করিস আমাদের।

তুই বোধকরি তোর সুখের ঠিকানা পেয়ে গেছিস। কেউ কোনদিন তোকে কষ্ট দেবে না। তোকে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না। আর কোনো হাসপাতালের করোনা ইউনিটে তোকে পিপিই পড়ে যেতে হবে না। মাস্ক তোকে খুব বেশি কষ্ট দিয়েছে। ওটাও ছেড়ে দিলি। আর আমাদেরও!

তুই অনেক ভালো থাকিস কল্লোল। পরপারে যদি দেখা হয়, তোকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর দেবো। যা এ জন্মে পারিনি।