এক কবিতার দাম এক লাখ টাকা

৯ই মে, ২০২০ || ০৩:৫৬:১২
171
Print Friendly, PDF & Email

কাজী মেহেদী হাসান, লিটারেচার ডেস্কঃ

করোনা দুর্গতদের জন্য অনেকেই অনেকভাবে করছে। করছে বাজারমূল্য, জনপ্রিয়তামূল্য দিয়ে। সাকিবের ব্যাট, আকবরের বিশ্বকাপ জয়ী স্মৃতি, হুমায়ূন ফরীদির চশমা। কিন্তু বাজারমূল্য নেই এমন কিছু যদি হঠাৎ বিকোয়, অবাক হবেন? একটা কবিতার দাম যদি হয় প্রায় এক লাখ টাকা? কবিতার দাম, একটা আপাত অপার্থিব বস্তু। লোকে পাশ করার জন্য পড়ে, এরপর তাকে আউট বই বলে। ১০০ টাকা দামের একটা কবিতার বই ছুঁতেই যেখানে মানুষের এত অনীহা সেখানে এক কবিতার দাম এক লাখ? বাংলা কবিতার ইতিহাসেই যা প্রথম ঘটনা।

ফেসবুক ভিত্তিক কবিতার সংগঠন Poem Vein Bangla পেজ থেকে জানা যায়—

করোনাদুর্গতদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে একটি মানবিক সংগঠন ‘Auction 4 Acton’ ০৬ মে ২০২০, গত বুধবার রাত ১০:৩০ মিনিটে কবি নির্মলেন্দু গুণের হাতে লেখা ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন’কবিতাটি নিলাম করেন। সেই নিলামে কবিতাটি ৯৯,৯৯৯ টাকায় বিক্রি হয়। কবিতাটি কিনেছেন গুলশানের মিসেস সায়মা মাশরুর।

কবির হাতে লেখা সেই বিখ্যাত কবিতাটি

তবে কবিতাটি ৯৯,৯৯৯ টাকায় নিলাম হলেও ক্রেতা দিয়েছেন ১০০,০০০ টাকা। পরবর্তীতে এই টাকা অর্ধেক করে (৫০,০০০) দুটি ফাউন্ডেশনের হাতে তুলে দেন Auction 4 Acton-এর পরিচালক অরিফ হোসেইন। ফাউন্ডেশ দুটি হলো—

বন্ধু ফাউন্ডেশন (যারা যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন) ও লাইফ স্টক অ্যাডভান্সমেন্ট (যারা মালিকানাহীন কুকুর ও বিড়াল নিয়ে কাজ করেন)।

নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতা তথা আর্টসের জগতে এক বিরাট খবর, একই সাথে বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রথমবার। এ ব্যাপারে কবি নির্মলেন্দু গুণ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন—

করোনাদুর্গত মানুষদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে একটি মানবিক ত্রাণ সংগঠন অন লাইনে নিলামে বিক্রি করার জন্য আমার কাছে আমার একটি হস্তলিখিত কবিতার পান্ডুলিপি চেয়েছিলো। প্রথমে আমি রাজী হইনি। ভেবেছিলাম যদি আমার কষ্ট করে কাগজের ওপর কলম দিয়ে লেখা কবিতাটি বিক্রি না হয়, কেউ যদি কবিতাটি কিনতে আগ্রহী না হয়? তবে তো আমার জন্য তা খুবই লজ্জার বিষয় হবে।

আমি মেয়েকে বললাম, আমার কবিতা তো সাকিবের ব্যাট নয়। ঐ সংগঠনের পক্ষ নিয়ে আমার কন্যা আমাকে বললো, তবু তুমি দাও। বিক্রি না হলে, না হবে। এখন তুমি যদি না দাও, তো নিলামে বিক্রি করে ফান্ড তৈরি করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণকারীরা ভাববে, তুমি ঐ সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতা করলে না।

কবি’র ফেসবুক স্ট্যাটাস

হ্যাঁ, তা ভাবতে পারে বৈকি। এই ভেবে আমি অনেক কষ্ট করে মোটা কাগজের ওপর একটু মোটা শিসের কলম দিয়ে আমার একটি মাঝারি আকৃতির জনপ্রিয় কবিতা লিখে— কবিতাটির ছবি তুলে আমার মেয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

আমার মেয়ে দ্রুতই আমার হস্তলিখিত ঐ কবিতার পান্ডুলিপির একটি ফটো-কপি উদ্যোক্তাদের কাছে ইমেইলে পাঠিয়ে দিলো। ফেসবুকের চেয়ে ইমেইলে ছবির রেজুলুশান ভালো হয়। ঐ দিনই সমাজের বিভিন্ন সেলিব্রেটির কাছ থেকে পাওয়া সামগ্রীসমূহ নিলামে তোলার শেষ দিন ছিলো।

আমি একটু উৎকন্ঠার মধ্যে ছিলাম। রাত বারোটার দিকে আমার কন্যা আমাকে ফোন করে বললো, বাবা, তোমার কবিতাটির জন্য তুমি কতো টাকা আশা করেছিলে? আমি বললাম, এক লাখ টাকা। তাই? তুমি তো দেখছি খুবই দূরদর্শী। তোমার আশা তো প্রায়ই পূর্ণ হয়েছে। আমি বললাম, তবে প্রায়ই বলছো কেন? এক লাখ হয়নি?
মেয়ে বললো, না, তোমার কবিতাটি বিক্রি হয়েছে ৯৯৯৯৯ হাজার টাকায়।
আমি খুব প্রাণ খুলে হাসলাম। বুঝলাম, যিনি কবিতাটি কিনেছেন, তাঁর হয়তো 0 সংখ্যাটি নিয়ে এলার্জি আছে। তাই ১ লাখের পরিবর্তে তিনি আমার কবিতাটির দাম হাঁকিয়েছেন ৯৯৯৯৯ হাজার টাকা। আমি জানতে চাইলাম— তোমার উদ্যোক্তা বন্ধুরা কি খুশি? মেয়ে বললো, হ্যাঁ, ওরা খুব খুশিমনেই আমাকে এই খবরটা দিলো।

আমাদের সমাজে এখনও কবিতার অবস্থান পরীক্ষা পাশের নিমিত্তেই কেবল। খুব কম সংখ্যক মানুষই আছেন যারা সাহিত্য অনুরাগী। যারা জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে কবিতাকে বেছে নেন। স্বয়ং কবি ছাড়া এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক কম। বইমেলাতে ১০০ টাকা মূল্যের একটা কবিতা বই বিকোতে যেখানে নাভিশ্বাস ওঠে সেখানে এই খবর অবশ্যই আনন্দের। ভালো মানের কবিতার মূল্যায়ন এখনও আছে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। সৃষ্টি এবং স্রষ্টার জয় হোক। জয়তু বাংলা কবিতা।