সাজেদা হাসপাতাল—করোনা মোকাবেলায় সন্মুখ যুদ্ধের প্রতিষ্ঠান (ভিডিও)

২ই মে, ২০২০ || ১১:৩৮:৪৫
227
Print Friendly, PDF & Email

কাজী মেহেদী হাসান, ঢাকা:

করোনা মোকাবেলায় অনেক মন্দ খবরের মাঝে আছে কিছু আলোকবর্তিকাও। যারা নিজ অবস্থান থেকে লড়ছে এই আপাত অসম যুদ্ধ। প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা কৌশল। তবে সামনের সারিতে থেকে যারা সর্বোচ্চ ঝুঁকিটা নিচ্ছে তারাই তো সন্মুখযোদ্ধা। সাজেদা হাসপাতাল তেমনই একটি নাম। সাজেদা ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত নারায়ণগঞ্জের এই হাসপাতালটির এই সাহসী গল্পটাই অন্যদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর।

দেশে করোনার আক্রমণের শুরুতে অনেক হাসপাতালই চাইছিল না নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে। অনেক নতুন প্রস্তাবনাও মালিক এবং উন্মাদ জনগোষ্ঠীর অনিচ্ছায় থমকে গিয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের এক স্বাক্ষর রাখে সাজেদা হাসপাতাল।

এই হাসপাতালে কোয়ারেন্টিন সুবিধার পাশাপাশি, কোভিড-১৯ রোগীর সেবা, ডায়ালিসিস, ভেন্টিলেশন এবং আইসিইউ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত ২৩ মার্চ এই সামগ্রিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে এ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করে সাজেদা ফাউন্ডেশন এবং রেনাটা। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরী ও পর্যবেক্ষন সেবা দেবার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। উপস্থিত ছিলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং সাজেদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী জাহেদা ফিজ্জা কবীর।

এপ্রিলের ২৯ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালটি নিউমোনিয়ার লক্ষ্মণযুক্ত ৫৯ জন রোগীকে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি নিয়েছে। হাসপাতালে কর্মরত ৩০ জন ডাক্তার, ৫০ জন নার্স এবং ৭০ জন সেবাকর্মী দিন-রাত সেবা দিয়ে যাচ্ছে তাদের জীবনের ঝুঁকির কথা জেনেই। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, হয়তো জীবন নিয়েও শঙ্কা কাজ করে, তবু মানুষের পাশে মানুষই দাঁড়াবে এই সত্য শ্লোগান তারা উচ্চকিত করে রেখেছেন।

এ বিষয়ে হাসপাতালে কর্মরত এক ডাক্তার বলেন—

রোগীর সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েই আমাদের কাজ করতে হয়। কারন দেখা যায় একটা রোগীকে আমি ইনকিউবেশন করছি বা ভেন্টিলেশন দিচ্ছি বা আমার যে সহকর্মীরাও রোগীকে সাকশনিং দিচ্ছে সবাই মিলেই থাকছি। সবচেয়ে কাছে গিয়েই এই কাজটা করতে হচ্ছে। এখানে ১ মিটার দূরত্ব রাখারও কোন পথ নেই। রোগীর মুখ আর আমার মুখের দুরত্ব এই এতটুকু… সেক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি মানসিক চাপ তো আছেই।

যারা রেখেছিল জীবন বাজি

এভাবেই বলছিলেন সত্যিকারের সেবাব্রত নেয়া একজন মানুষ, প্রকৃত মানুষ। দীর্ঘদিন যারা এই হাসপাতালেই পড়ে আছেন, কেবল অন্যের সুস্থতার জন্য নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই। এ বিষয়েই হাসপাতালের অন্য এক ডাক্তার বলেন—

ঝুঁকি তো আছেই, বাকিটা আল্লাহর উপর ভরসা করেই কাজ করতেছি। প্রায় ১ মাস ধরে এখানে আছি, পরিবার থেকে আলাদা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালটিতে এখন প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন রোগী আসছেন। চালু রয়েছে গর্ভবতী সেবা, শিশু বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ, চক্ষু বিভাগ, অর্থোপেডিক্স, সার্জারি, প্যাথলজি, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ সকল ধরনের চিকিৎসা সেবাই। এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা আছে ২৪ ঘন্টাই।

প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীরা দিচ্ছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাইকিং করে সবাইকে মাস্ক এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার তাগিদও দেয়া হচ্ছে। জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি নিয়ে কোন রোগী আসলে তাকে আলাদাভাবে, আলাদাপথে মনিটরিং করা হচ্ছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের আরেকজন ডাক্তার বলেন—

ডব্লিউএইচও এর গাইডলাইনটাই আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি। জেলা অফিসার যখন বলছে এই জায়গা থেকে রোগী আনতে হবে, আমরা সাথে সাথে সেখানে এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে হাসপাতালে এনে সেখান থেকে আমাদের অন্য দুজন সহকর্মী রোগীকে একটা আলাদা রুমে রাখছে। তারাই শুধুমাত্র রোগীদের জন্য নির্ধারিত পথ এবং লিফট দিয়ে বিছানা পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে।

করোনা রোগীদের ট্রিটমেন্ট সম্পর্কে তিনি আরও বলেন—

করোনাভাইরাসের জন্য সার্ভে করে যে ড্রাগগুলো ইফেক্টিভ হিসেবে ধরা হচ্ছে সেগুলিই আমরা ব্যবহার করছি।

এতে যে সাজেদা হাসপাতালও সফলও হচ্ছে তার প্রমাণ, গত ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ২৫ জন রোগীকে এই হাসপাতালের আইসোলেশন থেকে ডিসচার্জড (সুস্থ) করা হয়েছে।

হাসপাতালের কোভিড-১৯ টেস্ট সক্ষমতা নিয়ে একজন রোগীর জবানিতে জানা যায়—
পরীক্ষা করে গত ১১ এপ্রিল জানতে পারলাম আমি পজেটিভ। তারপর ১২ তারিখ আমি সাজেদা হাসপাতালে আসি। এরপর তারা আমাকে আবার পরীক্ষা করার পর জানালো ‘আপনার নেগেটিভ আসছে, আপনি দ্রুত বাড়ি ফিরে যান’।

হাসপাতালের সামনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান-পানির হাত ধোঁয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি, রাখা হয়েছে জীবাণুনাশক টানেলও। যা প্রতিদিন জীবানুনাশক সল্যুশনের মাধ্যমে প্রায় ২০০০ জনকে জীবানুমুক্ত করার ক্ষমতা রাখে।


নারায়ণগঞ্জের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সাজেদা হাসপাতাল ডিরেক্টরেড জেনারেল অব হেলথ সার্ভেসেসের (ডিজিএইচএস) সাথে যৌথ উদ্যোগে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেবার যুদ্ধে নেমেছে। তারা আশা করছেন পরিস্থিতির সাথে সাথে তাদের প্রচেষ্টাও করোনা মহামারীকে রুখে দিতে আরও ধারালো হয়ে উঠবে।

এমন এক সাহসী গল্প হয়তো অনেকদিন পর কারও মুখে উঠে আসবে চা দোকানে, বলার সময় রক্তিম হয়ে উঠবে তার মুখ, যেন গর্ব হচ্ছে এই সময়ে এমন যোদ্ধাদের দেখতে পেরে, বলতে পেরে; নতুন প্রজন্মের জন্য এক সাহসী দ্বীপশিখা জ্বালাতে পেরে। আমরা কেবল প্রার্থনাই রাখতে পারি এমন সৎ আর মানুষ ঘনিষ্ঠ প্রচেষ্টা ও প্রতিষ্ঠান যেন দিন দিন আরও দুর্বার হয়ে ওঠে। সন্মুখ যুদ্ধে সাজেদা হাসপাতাল শেষ পর্যন্ত অটল থাকে স্ব-মহিমায়।