কাজী মেহেদী হাসানের ৬ টি কবিতা

২৯ই এপ্রিল, ২০২০ || ০৪:৪৪:২২
152
Print Friendly, PDF & Email

লিটারেচার ডেস্কঃ কবিতা শব্দটা অনেকের কাছেই পাঠ্যপুস্তকের বাঁধাধরা কয়েকটা পরীক্ষা পাশের প্রশ্নের মতো। কারও কাছে আরেকটু বেশি, সহজ কথা বলতে না পারার আক্ষেপ, যা হতে চেয়েছিলাম তা না হবার আক্ষেপ এককথায়— নিজেকে দেখার আয়নার মতো। আর একজন কবির কাছে তা সমগ্র জীবন। দেখা যাক, আপনার কাছে এই কবিতাগুলির অর্থ কোনরকমের দাঁড়ায়।

১.

চিহ্ন

পোশাকের ভেতর নিজেকে ঠিকঠাক বুঝে পেয়েছি
লাইটার-ওয়ালেট-সেলফোন— ফেলে গেলাম কিছু?
সহজ কণ্ঠস্বর বলেছিল— স্মৃতি।

হাঁটতে গেলে এক পা অন্য পা’কে ছাড়িয়ে যাবে স্বাভাবিক
তাই চুপচাপ চৌকাঠ পেরিয়ে আসি
ভারি শরীর— বাড়ি ফিরে খুলে রাখি
খবর আসে, বাঘের মুখোশ পরা মেয়েটি ঘরে নেই
তার সমস্ত নিয়ে চলে এসেছি।

২.

বেহালা বাদক

আমারে ক্যান ভালোবাসবার পারো নাই?
পরান বিছায়া যে উঠান তোমারে দিছি
তার ভিত্রে ছবির লাহান নাইচা ওঠে
পিরিতের চুমা খাওয়া পাও; তার থিকা বেশি
তোমারে চাইছি; কইলজার ভিতর থিকা
যে ডাক দিবার পারে মানুষ; তার থিকা বেশি
কইছি মাইনসের গলায়—
পাখির বিদ্যা জানো তাই শুনবার পারো নাই।

আমারে ক্যান ছুঁয়া দেখবার চাও নাই?
রাইতের রুমাল থিকা যে আগুন ছিটকা পড়ে
তার ভিত্রে ঢুইকা জানছি—
খোদা জাহান্নাম বইলা কিচ্ছু তৈয়ার করে নাই;
তোমার বন্ধ চোখ আমার মনে আছে
নখের দাগগুলা মেশে নাই
এহনও ছবি আছে কিছু যাদুমন্ত্রের ভিতর, চেহারা মনে নাই।

আমারে ক্যান থুয়া যাইবার পারো নাই?
ঘরে আর ভিড়ে যেইহানে যাই, যার লগে কথা কই
তোমার সমান আদর ফেরত দিবার চাই
তার গায়ের পশম, তোমার শরীল হয়া কাঁটা দ্যায়।
কবিতা লিখবার বইলে আঙুলে দেহি
ভাত খাইবার গেলে এক লহমার দাবি
রাস্তার স্মৃতিফলকের লাহান খাড়ায়া থাকে;
তার পাশ দিয়া তুমি অন্য মরদের হাতে,
হাতের দখল নিয়া হাইটা যাও, সাবধানে যাইও;
সোনা আমার, আমি দুঃখ পাই নাই, দুঃখ পাই নাই।

৩.

যদিদং হৃদয়ং তব

মানুষ বড় সরল
কথা শুনে নিশ্চিন্ত হতে চায়;
জানতে চায় ভালোবাসি কি না।
আষাঢ়ের জলের মতো সারাদিন
‘যদিদং হৃদয়ং তব’ বলেছি কি না।

বলি— বহুদূর থেকে এলে
রাস্তাগুলোর বেহাল দশা
চায়ে দু’চামচ চিনি নাকি কম লাগে তোমার?
এখানে বিদ্যুৎ সুবিধের নয়
বারান্দায় চেয়ার পেতে দেই?
সেখানে কাঁঠালচাঁপা আর শেষ ক’টি শেফালী ফুলের ঘ্রাণ পাবে।
বেড়ালটা চারটে আদুরে বাচ্চা নিয়ে সংসার পেতেছে
দ্যাখার মতো দৃশ্য।

উঠে গিয়ে সিগারেট ধরাই
ধোঁয়াগুলো বাড়তে থাকে
চোখ জ্বলে।
ধবধবে শিফনের শাড়ি মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়
কথা বলে না;

কথায় কথায় তার চোখে জল আসে।

৪.

নীরু ২

খুব সামান্য ব্যাপার নিয়ে হৈ চৈ হয়
এই যেমন শাড়ির সেফটিপিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না
কই মাছের ঝোল হাঁড়ির গলা ছোঁবে নাকি পেট অব্দিই সই
টিভি শো’তে হালিমা চরিত্রটা শেষ কবে নুন চুরি করেছে
এইসব তুচ্ছ জিনিসে আমাদের আনন্দ থাকে, বাড়িভর্তি হল্লা।

হঠাৎ মনে হলো বহুদিন শফিক ছেলেটার দ্যাখা নেই
ভুল বানানের হাতচিঠি পৌছে দিয়ে কেউ বলছে না ‘আগে চকলেট’
চকলেট দিতে আমাদের আপত্তি নেই, আনন্দ আছে।

এইসব লিখতে লিখতে পুর্নবার সম্পাদনার কাজে
ফের কাগজে তাকানোটা নিয়ম
ভালো কবিতার কদর না থাকলেও তৃপ্তি থাকে;
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে দেখি এতক্ষণ এতবার
কেবল নীরু’ই লিখেছি— নীরু, নীরু, নীরু…
এক শব্দে কবিতা কতটা বাজে হতে পারে ধারণা নেই
কেবল মনে হলো বহুদিন পর—
বহুদিন পর তুচ্ছ জিনিসে আনন্দ হলো।

এখন কে কোথায়? কেমন আছে?
কার বাড়িতে— আমারই চোখে অন্যকে গেঁথে ফ্যালে;
এসবে আগ্রহ নেই!
তবু পাতার মতো পতনেও জানালায় কান পাততে ইচ্ছে করে
কালুভুলুরা গেটের দিকে তাকালে আমারও প্রতীক্ষা বাড়ে
সামান্য নারীটা এতটা ছড়িয়ে থাকে?
ভাবতে থাকি, তাকিয়ে থাকি, কার বাড়িতে? কেন থাকে?

৫.

আমার বাবার কোন গল্প নেই

ছেলে বড় চাকুরীজীবী হলে বাবার গল্প হয়ে ওঠে
আর যদি হয় কোন বিদেশফেরত ভদ্রলোক
তবে চায়ের কাপে নেমে আসে শীতকাল
তিনি উড়ুক্কু বিমানের কথা বলেন—
ছেলের চোখে বলতে থাকেন বিলাতের বিত্ত-বৈভব
পরিষ্কার রাস্তাঘাট আর খানিক নিচু গলায় সেখানকার সংস্কৃতির কথা
আমার বাবার কোন গল্প নেই!

তিনি হিসেবী বেতনের একজন ভুলে যাওয়া সরকারী কর্মকর্তা
তিনি সংশয়ে থাকেন আগামীকালের বাজারে কাঁচামরিচের দর নিয়ে
পাড়ার চায়ের দোকানে বয়সী পা দুটোকে সাজিয়ে রাখেন ধীরে
রঙ চা খেলে দুটো বাড়তি পয়সা নষ্ট হবে কি না
এই ভেবে উঠে আসেন।

ছেলে কবি হলে বাবাদের কোন গল্প থাকে না
কালে ভাদ্রে কোন পত্রিকায় ছেলেকে দেখে আনন্দিত হন
চাপা স্বরে স্ত্রীকে বলেন— ‘দেখেছো আমাদের ছেলে’

পরক্ষণেই নিকট আত্নীয়ের ছেলের পদোন্নতির মিষ্টি খেতে হয়
তারা বাহারি গল্প করেন।
ঢাকায় বাড়ি, দু’হাত ভর্তি টাকা আর মার্সিডিজ এলো বলে
আমার বাবা চুপচাপ শোনেন
তাকে শুনতে হয়
তিনি সমাজের প্রথাগত মানদন্ডকে ভয় পান
কবি নন একজন দুর্নীতিগ্রস্থ চাকুরে ওজনে অনেক ভারি।

আমার বাবা প্রচন্ড ধর্মানুরাগী
ছোটবেলা থেকেই তিনবেলা আহারের মতো পাঁচবার প্রার্থনা করা শিখিয়েছেন
তবু টেলিভিশনে লেখক হত্যার খবর দেখলে আঁতকে ওঠেন
স্ত্রীকে তাগাদা দ্যান
ছেলে নিরাপদে আছে শুনলে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়েন।
প্রতিদিনের মতো বাজারের ব্যাগ হাতে বের হন
ছোটখাটো জটলার ভেতর দাঁড়িয়ে বড় মাছ কেনার গল্প শোনেন
মফিজ সাহেবের ছেলের পাঠানো দামি পাঞ্জাবীর রঙ দেখে দিতে হয়
তারা গল্প করতে থাকেন
সকাল থেকে রাত
ছেলে বড় হলে বাবাদের এই নিয়ে কথা বলতে হয়
আমার বাবার কোন গল্প নেই।

ছেলে কবি হলে বাবাদের সংশয়ে থাকতে হয়
এই বুঝি কারও তীর্যক কথা হজম করতে হবে
ছেলে কবি হলে বাবাদের দুঃখ বহন করতে হয়
বিএসসি পাশ ছেলেকে টাকা পাঠাতে হয়
বিশ্বাস করুন, আমারও লজ্জা করে
ভীষণ লজ্জা হয়

বলতে ইচ্ছে করে— “বাবা দেখো, একদিন আমরাও…”

আমার বাবার একদিন আসে না
চুলের মতো বাবারও বয়স বাড়ে
বেড়ে যায় পাঞ্জাবীতে দাগের সংখ্যা।

বাবা নামাজ শেষে জিকির করেন
জিকির শেষে নামাজ পড়েন
মানুষের কাছে গিয়ে শুনে আসেন সব সফলতার গল্প
হয়তো বাবাও চান
ছেলের দেয়া চাঁদর ঝুলিয়ে অন্যদের তর্কে ঢুকে পড়তে
অতিথি এলে বিশুদ্ধ জায়নামাজটা দ্যাখাতে
বাবা পারেন না।

ছেলে বাড়ি এলে ফ্রিজে রাখা মুরগিটা রান্না হলো কি না খেয়াল রাখেন
সাবধানে পত্রিকায় পাওয়া চাকুরির বিজ্ঞাপনটা ছেলের বিছানার পাশে রেখে দ্যান
বাজারে গেলে লোকেরা ঘিরে ধরে
ছেলের গল্প শুনতে
কোন ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবী নিয়ে এলো তার গল্প শুনতে
ক’বান্ডিল টাকা এনেছিল তার গল্প শুনতে
একসময় আড্ডা জমিয়ে রাখা বাবা কোন গল্প বলতে পারেন না
ছেলে মাথা নিচু করে হাতখরচ নিয়ে চলে যায়
বাবার একদিন আসে না
আমার অতি কথুকে বাবা ‘নীরবতা’ আবৃত্তি করে পড়েন
ছেলে যাদের কবি
তাদের কোন গল্প থাকে না।

৬.

আত্মজীবনী

যদি কোনোদিন কবি হয়ে দাঁড়াতে পারি
সেদিন এ গল্পটা বলবো
বলবো আমার বাবার এখনো কোন গল্প নেই
বয়সের তুলনায় কপালের ভাজ দু’টো বেশিই পড়েছে
বলবো নীরু’কে নিয়ে আমার প্রতিটি কথা মিথ্যাচার
আমার কবিতাজীবনের দায় সম্পূর্ণ আমার

মানুষ একটা পর্যায়ে এসে কিছু একটা পেতে চায়
হতে পারে অর্থ
হতে পারে তুমি
পাখির জীবন
ইশারা
দুঃখ?
দুঃখ একটা আশির্বাদ বটে
কোনো কোনোদিন পেছনে ফিরে তাকালে যে দৃশ্য আমরা দেখি
মনে হয় সমস্ত আঘাত, না পাওয়া— সঠিক সময়ে পেয়েছিলাম।

আমি কী চেয়েছিলাম?
কবিতা চাইনি—
চাইনি মাঝরাতে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্মাদ মানুষটা
আমাকে পালাতে বলুক
চাইনি মানুষ তার মৃত্যুভাবনার আগে
কতবার মৃত্যুকে এড়িয়ে গেছে ভাবুক
চাইনি মাইলখানেক দূরে তুমি কি বলছো
তা বহু আগেই আমার মুখে উচ্চারিত হোক;

যদি কোনোদিন কবি হয়ে দাঁড়াতে পারি
বলবো— এই মঞ্চ
এই সভাসদ
আলোকসজ্জার থেকে অনেকবেশিগুণ উজ্জ্বলতার কথা
দূরে, আরও অনেক দূর
যার জন্য মানুষ শেষ অব্দি প্রাণপণে লড়ে যাবে
এর মাঝেই অপেক্ষার অনেক ফুল শুকাবে
জোয়ারের আগেই সৈকতের ঘর বাতাসে মুছে যাবে
অনেক নক্ষত্রই তোমার জানালা থেকে দ্যাখা যাবে না
তবুও এটাই একমাত্র যুদ্ধ
যা মানুষের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি
তবু এটাই একমাত্র মিথ্যে
যা তোমাকে কোনোদিন বলিনি

নিজের ভেতর নিজেকে আমি লুকাতে পারি না।