অপরূপ সৌন্দর্যের মায়াভূমি মনপুরা দ্বীপ!

১২ই মে, ২০১৯ || ০৯:৪৭:০০
85
Print Friendly, PDF & Email

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অপরূপ সৌন্দর্যের  মায়াভূমি মনপুরা দ্বীপ। মেঘনা নদীর বুকে সবুজ বনভূমি বেষ্টিত মনপুরা দ্বীপ। দ্বীপের একপাশে উপকূলীয় বনাঞ্চলে রয়েছে মায়াবী চিত্রা হরিণ, আর শীতে আসে হাজারো অতিথি পাখি।

কিছুদিন আগেই ঘুরে এলাম মনপুরা দ্বীপ থেকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় দ্বীপগুলোয় সুপেয় পানি নিয়ে গবেষণা কাজ করতেই গিয়েছিলাম মনপুরা দ্বীপে। আকাশে মেঘ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর কালবৈশাখীর ভয় মাথায় নিয়ে ঢাকা থেকে মনপুরাগামী লঞ্চে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। মুন্সীগঞ্জ পেরিয়ে মেঘনায় চলে এল আমাদের লঞ্চ, বৃষ্টি থেমে গিয়ে মিষ্টি হাওয়া বইতে শুরু করল। রাত বাড়তেই আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল। আমাদের লঞ্চ মনপুরা পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাবে। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ভোরের প্রথম আলো জানালার ফাঁক দিয়ে মুখে এসে পড়ল, বাইরে এসে দেখি সূর্যোদয়ের প্রথম স্নিগ্ধ আলোয় চারদিকে এক অদ্ভুত মায়াবী আবেশ। দু-একটা জেলে মাছ ধরছে, সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে নদী। মেঘনার কোনো এক শাখা দিয়ে আমাদের লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ছোট ঘাট পেরিয়ে মনপুরা ঘাটে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। ঘাটটি ছোট হলেও অনেক মানুষ এখানে। আমরা একটা অটোয় করে পৌঁছলাম হাজিরহাট বাজারে।

সরকারি ডাকবাংলোসহ বেশকিছু সাধারণ মানের হোটেল রয়েছে। আমরা হোটেল থেকে বের হয়ে হাজিরহাট বাজারে নাশতা শেষে একটা অটোরিকশা নিয়ে মনপুরা ঘুরতে বের হলাম। মনপুরা ভোলা জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। মনপুরা উপজেলায় চারটি ইউনিয়ন, প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। অধিকাংশ মানুষ মত্স্যজীবী, আবার অনেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। মনপুরায় একটিই পাকা রাস্তা, যা কখনো বাঁধের ধারে, কখনো বাজারে, কখনো গ্রামের মাঝ দিয়ে পুরো মনপুরায় বিস্তৃত। আমরা দক্ষিণের উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়ন হয়ে একেবারে দক্ষিণে অবস্থিত দক্ষিণ সাকুচিয়া পর্যন্ত গেলাম। একপাশে সবুজ উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন আর অন্য পাশে মুগ ডালের বিস্তীর্ণ সবুজ ক্ষেত। এসব মাঠে বর্ষায় কেবল একবার ধান জন্মায়, কিন্তু এখন অনেক চাষী অন্য মৌসুমেও মুগ ডাল ও বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কারণ অল্প পানিতেই এসব চাষ সম্ভব।

দ্বীপের একেবারে দক্ষিণে অনেকটা সৈকতের মতো ছোট একটা জায়গা। দূরের ছোট ছোট সবুজ দ্বীপ দেখা যায় এখান থেকে। ফেরার পথে আমরা এক জায়গায় একদল চিত্রা হরিণ দেখতে পেলাম। রাস্তা দিয়ে একপাশ থেকে অন্যপাশে যাচ্ছিল। এত কাছে থেকে এই প্রথম হরিণ দেখা, সুন্দর লাগছিল হরিণগুলো। ঝটপট কিছু ছবি তুলে ফেললাম। লোকালয়ের এত কাছে হরিণের দেখা পাওয়ায় মনে খটকা লাগল। আমাদের গাড়িচালককে জিজ্ঞেস করতেই বলল, প্রতিনিয়ত অবাধ গাছ কাটা আর নতুন বসতি স্থাপনের ফলে ম্যানগ্রোভ বন ছোট হতে হতে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, লোকালয় চলে এসেছে বনের খুব কাছে। আগে প্রচুর হরিণ ছিল, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই এখানে হরিণ শিকার হয়। এত সুন্দর প্রাণীগুলো হারিয়ে যাবে এই দ্বীপ থেকে, ভাবতেই মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। অথচ এই প্রাকৃতিক পরিবেশে হরিণের বিচরণ দেখার জন্য এই দ্বীপটা হতে পারত প্রকৃতিপ্রেমীদের এক নতুন গন্তব্য।

দুপুরের খাবার শেষে গেলাম সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গড়ে ওঠা মনপুরা ফিশারিজে। প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ খামারবাড়িটি চমত্কারভাবে সাজানো, দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে এটিকে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার। খামারবাড়িতে সারি সারি নারকেল গাছ ও বিশাল চার-পাঁচটি পুকুর রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন খামারবাড়িটি হতে পারত ভ্রমণপিয়াসীদের বাড়তি আকর্ষণ। খামারবাড়িটির পূর্ব পাশেই বিশাল ম্যানগ্রোভ বন। আমরা ফিরে এলাম হাজিরহাটে। হাজিরহাট ঘাট থেকে সূর্যাস্ত দেখব। আসতে আসতে আমাদের অটোরিকশার মামা জানালেন, একসময় এ দ্বীপে পর্তুগীজদের আস্তানা ছিল। তারই নিদর্শন হিসেবে নাকি দেখতে পাওয়া যায় কেশওয়ালা কুকুর, যদিও আমাদের চোখে পড়েনি। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সারি সারি বাগান। মনপুরায় ছোট-বড় ৮-১০টি চর এবং বন বিভাগের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে সবুজ বিপ্লব। শীত মৌসুমে শত শত পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এসব চরাঞ্চল। এই চরগুলো হলো চরতাজাম্মুল, চর পাতালিয়া, চর পিয়াল, চরনিজাম, চর সামসুউদ্দিন, লালচর, ডালচর, কলাতলীর চর ইত্যাদি।

লম্বা জেটির মতো ঘাটে মাতাল করা বাতাস, একসময় আকাশ লাল করে ডুবে গেল সূর্য। বাজারে এসে এখানকার বিখ্যাত মহিষের দই খেলাম। সাধারণত মহিষের টক দইটা বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু এখন মিষ্টি দইও পাওয়া যায়। আমাদের পরের দিনটি গেল গবেষণার কাজে। লঞ্চে ঢাকায় ফেরার সময় বার বার এই মন ভোলানো মনপুরার কথা মনে পড়ছিল। না জানি বর্ষা ও শীতে কেমন লাগবে এ মায়াবী দ্বীপকে!

মনপুরাতে ভালো মানের পর্যটন হোটেল নেই, তাই যারা প্রকৃতিকে তার নিজস্বরূপে দেখতে চান, তাদের জন্য মনপুরা এক আদর্শ জায়গা। তবে মনপুরায় যদি ভালো মানের হোটেল গড়ে ওঠে, তাহলে পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলে মনপুরাও হতে পারবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।