ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি: রাজত্ব ছাড়তে হচ্ছে দীর্ঘদিন ডিএমপিতে থাকা পুলিশ কর্তাদের

11

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি ইস্যুতে আমলনামা তৈরি হচ্ছে ডিএমপির থানার ওসিসহ বিভিন্ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের। যারা বেশিরভাগ সময় একইস্থানে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। আমলনামা যাচাই-বাছাই শেষে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন হেডকোয়ার্টার ও ডিএমপি প্রশাসনের শীর্ষমহল।

পুলিশ-র‌্যাবসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তা-ব্যক্তি ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে এ সব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশ সদর দফতর ও ডিএমপি সূত্র জানায়, ডিএমপির ৫০ থানার বেশিরভাগ অফিসার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও সমমানের পুলিশ কর্মকর্তার কর্মস্থল ডিএমপির বাইরে পরিবর্তনই হয়নি প্রায় একদশক। এসব অফিসাররা ক্যাসিনোসহ নানা অপকর্ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলেই তদন্তে উঠে এসেছে। ডিএমপিতে কর্মরত এ রকম ২৭ জন অফিসার ইনচার্জের তালিকা করা হয়েছে। সেই তালিকা ধরেই পুলিশ সদর দফতর থেকে সরাসরি তাদের বদলি করা হবে জেলা-উপজেলায় পর্যায়ে। আর তাদের জায়গায় তুলনামূলক এসিআর বা অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট ভালো এমন কর্মকর্তাদেরই পদায়ন করা হবে। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির পর থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এখন বাস্তবায়ন করার পর্যায়ে বিষয়গুলো রয়েছে।

প্রসঙ্গত; ‘ডিএমপির থানায় কী এত মধু?’ শিরোনামে গত ১০ সেপ্টেম্বর এসব নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল অনলাইন পত্রিকা নিউজবিটোয়েন্টিফোর.কম।

জানা গেছে, ক্যাসিনো কাণ্ডে বেশ বিব্রত সদ্য যোগদান করা ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম। তিনি এরই মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা, ইণ্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ডিভিশন-আইইডিকে দিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছেন যাদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোসহ নানা দুর্নীতি-অপকর্ম সংক্রান্ত জোরালো অভিযোগ রয়েছে। ডিএমপি কমিশনার নিজেই তার যাচাই-বাছাই করছেন বলে দাবি করেছে সূত্রটি।

সূত্র জানান, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ক্যাসিনো চলতো রাজধানীর মতিঝিল ক্লাবপাড়ায়। এই এলাকার পুলিশ কর্মকর্তারা ক্যাসিনো সম্পর্কে প্রায় সবকিছুই অবগত ছিলেন বলে বিভিন্ন কথা উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে মতিঝিল বিভাগে উপ-কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আনোয়ার হোসেন ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শিবলী নোমান। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সবকিছুই জানতেন। কিন্তু এসব বন্ধে কোনও উদ্যোগই নেননি তারা। গুলশান বিভাগেও একাধিক ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন ক্লাবে মদ-জুয়ার আসর বসতো নিয়মিত। বিভিন্ন ভবনে ভাড়া নিয়েও চলতো স্পার নামে অসামাজিক কর্মকাণ্ড। গুলশান বিভাগের তৎকালীন উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ এসব বিষয় জানতেন বলে পুলিশেরই একটি সূত্র দাবি করেছেন। কিন্তু তিনিও এসব বন্ধে কোন উদ্যোগই নেননি। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত রয়েছেন। সূত্র দাবি করেছেন, এ সংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদন রয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে। সেগুলো কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে কে, কোথায়, কার কতুটুকু সম্পৃক্ততা রয়েছে সেইসব বিষয়।

সদর দফতরের এক কর্মকর্তা জানান, যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর বন্ধ করার ক্ষমতা নেই মাঠপর্যায়ের পুলিশের। একাধিকবার এসব বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে ডিএমপি কমিশনার বরাবর পাঠানোও হয়েছিল। কিন্তু কোনও নির্দেশনা আসেনি। কিন্তু ডিএমপি থেকে বলা হয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার এমন কোন প্রতিবেদন কখনও পাঠানোই হয়নি। উল্টো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে বিদায়ী জনপ্রিয় কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া মতিঝিলের প্রীতম-জামান টাওয়ার ও কলাবাগান ক্লাবের রমারম জুয়ার আসর পুরোপুরি বন্ধ করেছিলেন একদিনে।

ওই কর্মকর্তা দাবি করে বলেন, ডিএমপি কমিশনারের সরাসরি তদারকিতে ইণ্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ডিভিশন-আইইডি নামে একটি বিভাগ রয়েছে। ওই বিভাগ আইন-শৃঙ্খলাসহ পুলিশের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম-দুর্নীতি ও অপকর্মসহ সব তথ্য আপডেট করে নিয়মিত ডিএমপি কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন পাঠায়। ফলে সদ্যবিদায়ী কমিশনারের এসব না জানা থাকার কোনও কারণ নেই। মাঠপর্যায়ের মধ্যম সারির কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষাভাবে জড়িত ছিলেন বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।

সূত্র মতে, র‌্যাবের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর ডিএমপি নড়েচড়ে বসেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর (সোমবার) তেজগাঁও লিংক রোডের ফু-ওয়াং ক্লাবে অভিযান চালায় ডিএমপির গুলশান বিভাগ। কিন্তু তারা সেখানে অবৈধ কিছু না পেয়ে ফিরে আসে। তার দুইদিন পরই ২৫ সেপ্টেম্বর (বুধবার) রাত ১২টার দিকে র‌্যাব আকষ্মিক অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণে মদ, বিয়ার ও অর্থ উদ্ধার করে। আটক করা হয় ৩ জনকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারই জেরে পুলিশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুন্ন হয়েছে। তাদের আন্তরিকতা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ঠিকাদার জি কে শামীমকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার পর তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা ছাড়াও গ্রেফতার অন্য ব্যক্তিরা ক্যাসিনো চালাতে গিয়ে কোন কোন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সহায়তা নিয়েছেন এবং কাদের নিয়মিত মাসোহারা দিতেন তাদের নামও বলেছেন। ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম সে সব তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।