ক্লাবপাড়া যেন ভুতুড়ে বাড়ি: দেশ ছাড়ছে ক্যাসিনো প্রশিক্ষিত শতাধিক নেপালি

24

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
রাজধানীর ব্যস্ততম মতিঝিল এখন সন্ধ্যার পর পরই ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়। দোকানপাট বন্ধ, ঘুটঘটে অন্ধকার, নেই ক্যাসিনোর খেলোয়াড়দের হাঁক ডাক। সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল ক্লাবপাড়ার প্রতিটি ক্লাবের সামনে কেউ নেই। দারোয়ানরা আতঙ্কে গেটের ভেতরে বসে ভয়ে একটু ফাঁকা করে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। ক্লাবগুলোর পাশে এবং সামনের ফাষ্টফুড ও খাবারের হোটেল বন্ধ ও গোয়েন্দা পুলিশের টহলের কারণে কেউ সে দিকে পা-ও বাড়াচ্ছে না।

এদিকে, গ্রেফতার আতঙ্ক এবং বিড়ম্বনার আশঙ্কায় ক্যাসিনো প্রশিক্ষিত অন্তত শতাধিক নেপালি নাগরিক তাদের নিদির্ষ্ট আবাসিক কোয়াটার এবং বাসা ছেড়ে দিয়েছে। গত বুধবার মতিঝিল ক্লাবপাড়ায় র‌্যাব এবং পুলিশের ক্যাসিনো নির্মূল অভিযানের পর থেকেই নেপালি ও থাইল্যান্ডের অধিবাসীরা এলাকা ছেড়ে স্বজনদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। ইতোমধ্যেই তারা তাদের স্বজনদের দিয়ে তাদের দেশে যাওয়া নিশ্চিত করেছেন। তারা পর্যায়ক্রমে স্বদেশে চলে যাচ্ছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, গুলশানের বনানী ও মতিঝিল ধানমন্ডি এবং মগবাজার ইস্কাটনের বার ও ক্যাসিনোতে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানের পরই বিদেশিরা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তাদের পাসপোর্টসহ বৈধ কাগজপত্র গুলশানের স্ব স্ব দূতাবাসে জমা দিয়ে ভিসার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। গত তিনদিনে প্রায় শতাধিক বিদেশি দেশের বাইরে তথা নিজ দেশে চলে গেছেন। অনেকেই যাত্রার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন না হওয়ায় যেতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে, একাধিক ক্লাবের মাঝ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, নেপালি ও থাইল্যান্ডের প্রশিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা মতিঝিলের বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো পরিচালনায় সহযোগিতা করতেন। কেউ কেউ আবার ক্যাসিনোতে মালিকানায় ছিলেন। গত বুধবার র‌্যাব মতিঝিল এলাকার কয়েকটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালানোর পর থেকে তাদেরকে আর খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে হণ্যে হয়ে খুঁজছেন। কিন্তু কিছুতেই তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। অভিযানের পরপরই গ্রেফতার এড়ানো এবং বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা বাসা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

র‌্যাবের সূত্র বলছে, নেপালি নাগরিকদের ভারতে যেতে কোন ভিসা লাগে না। তাই তারা সীমান্ত দিয়ে অনায়াসে হয়তো ভারত হয়ে নেপালে চলে গেছে। তবে ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসার বিস্তারে নেপালিদের সম্পৃক্ততা থাকায় তাদেরকে আটকের চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। কারণ ক্যাসিনো নিয়ে তাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে।

এদিকে, গত বুধবার মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় অভিযানের রাতে পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা সেগুনবাগিচার একটি বাসা থেকে বেশ কয়েকজন নেপালি নাগরিককে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ওই বাড়ির সিসি টিভির দুটি ভিডিও ফুটেজ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাইরাল হয়েছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় এরকম রিপোর্ট প্রকাশের পর পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি হেডকোয়াটাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৬০টির মত ক্লাবে ক্যাসিনো চলত। এসব ক্যাসোনি পরিচালনার জন্য ক্লাব কর্তৃপক্ষ ক্যাসিনো পরিচালনায় পারদর্শী নেপালি নাগরিকদের নিয়ে আসত। হিমালয়ের দেশ হিসাবে খ্যাত নেপাল ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য খুবই প্রিয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম দেশ যেখানে বৈধভাবে ক্যাসিনো চলে। নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে ৯টি ও বাইরে আরও ২টি ক্যাসিনো পরিচালনা করা হয়। তাই নেপালিরা ক্যাসিনো পরিচালনায় খুবই দক্ষ। তাই ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব নেপালিদের সহযোগিতা নিতো।

সূত্র বলছে, ঢাকায় নেপালি নাগরিক দীনেশ ও রাজকুমারের হাত ধরেই ক্যাসিনো ব্যবসার শুরু হয়। বিশেষ করে ঢাকার যুবলীগ দক্ষিণের কয়েকজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত নেতা এই নেপালিদের ক্যাসিনো পরিচালনার জন্য নিয়ে আসেন। ক্যাসিনোতে বাংলাদেশিদের আগ্রহ দেখে নেপালিরা একের পর এক ক্যাসিনোতে যুক্ত হয়।

জানা গেছে, ভিজিট ভিসা নিয়ে নেপালি কর্মীরা ঢাকায় আসতেন। উচ্চ বেতনে তারা ক্যাসিনোতে কাজ করতেন। আবার অনেক নেপালি ক্যাসিনোতে শেয়ারেও কাজ করতেন। তারা তাদের পেমেন্ট নিতেন ডলারে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঢাকার ক্যাসিনোতে কাজ করে নেপালি নাগরিকরাও হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লে কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল বলেন, বুধবারের অভিযানের পর আমরা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনেছি, মতিঝিলের চারটি ক্যাসিনোতে অন্তত ১৬ জন নেপালি কাজ করত। তাদের কাউকেই আমরা গ্রেপ্তার করতে পারিনি। অভিযানের খবর পেয়েই তারা পালিয়ে গেছে। নেপালিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নেপালিদের একটা সুবিধা আছে তাদের ভারতীয় ভিসা লাগে না। বুড়িমারি হয়ে খুব সহজেই ভারতে চলে যেতে পারে। আর ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সময়ের ব্যাপার। তারা যদি এই পথ অবলম্বন করে তাহলে হয়তো চলে গেছে। কিন্তু ক্যাসিনোতে নেপালিদের সম্পৃক্ততা জানার পর থেকেই আমরা তাদের ওপর নজরদারি রেখেছি। আমাদের গোয়েন্দারা তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ওই দিন আমরা কিছু বাংলাদেশি নারীদের আটক করেছিলাম। নেপালিরা প্রশিক্ষণ দিয়ে এই নারীদেরও দক্ষ করে তুলেছিলো।