পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন বরগুনার এসপি: হাইকোর্ট

17

স্টাফ করসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
‘একজন দায়িত্বশীল অফিসারের কাছ থেকে এ ধরনের কাজ প্রত্যাশিত ও কাম্য ছিল না এবং তিনি নিজেই তার দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যা দুঃখ ও হতাশাজনক’

বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি আদালতে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তার আগেই গণমাধ্যমে জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) দেয়া বক্তব্যকে অযাচিত এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থী বলেছে হাইকোর্ট। গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে তিনি (পুলিশ সুপার) তার পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেছে আদালত। মিন্নির জামিন সংক্রান্ত হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথাই বলেছে আদালত।

রোববার (১ সেপ্টেম্বর) রায় প্রদানকারী বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান আদালতের রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করার পর ৭ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়।

পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেছেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। তার সঙ্গে একমত হয়েছেন অপর বিচারপতি।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘‘একজন আসামি রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আইনের নির্ধারিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট জবানবন্দি প্রদানের পূর্বেই পুলিশ সুপারের এ ধরনের বক্তব্য তদন্ত সম্পর্কে জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার বক্তব্যের বিষয় যদি ধরেও নেয়া হয় যে সত্য, তা হলেও গণমাধ্যমের সামনে এ পর্যায়ে প্রকাশ ছিল অযাচিত এবং ন্যায়-নীতি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থী। একজন দায়িত্বশীল অফিসারের কাছ থেকে এ ধরনের কাজ প্রত্যাশিত ও কাম্য ছিল না এবং তিনি নিজেই তার দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যা দুঃখ ও হতাশাজনক।’’

রায়ে আরও বলা হয়, ‘‘মামলার তদন্ত যেহেতু চলমান সে কারণে এ বিষয়ে আদালত এই মুহূর্তে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা থেকে বিরত থাকছে। তদন্ত শেষে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল হলে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ বিষয়ে সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘‘এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা খুবই সঙ্গত হবে যে, ইদানিং প্রায়স লক্ষ্য করা যায় যে, বিভিন্ন আলোচিত অপরাধের তদন্ত চলাকালীন পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার পূর্বেই বিভিন্নভাবে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা অনেক সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অমর্যাদাকর এবং অ-অনুমোদনযোগ্য এবং বিভিন্ন মামলার তদন্ত সম্পর্কে অতি উৎসাহ নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে ব্রিফিং করা হয়ে থাকে। আমাদের সকলকে স্মরণ রাখতে হবে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতে একজন ব্যক্তি বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত চুড়ান্তভাবে বলা যাবে না যে তিনি প্রকৃত অপরাধী বা তার দ্বারাই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। গণমাধ্যমের সামনে গ্রেফতারকৃত কোনও ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সঙ্গত নয় যে, তার মর্যাদা ও সম্মানহানি হয় এবং তদন্ত চলাকালে অর্থাৎ পুলিশ রিপোর্ট দাখিলের পূর্বে গণমাধ্যমে গ্রেফতারকৃত কোনও ব্যক্তি বা মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে এমন কোনও বক্তব্য উপস্থাপন সমিচীন নয়, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে বিতর্ক বা প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।

আদালত বলেন, আমাদের আরও স্মরণ রাখা প্রয়োজন, মামলার তদন্ত এবং বিচার পর্যায়ে একজন অভিযুক্তের প্রাপ্য আইনি অধিকার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। উপরোক্ত বিবেচনায় আদালতের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের আদালতে উপস্থাপনের পূর্বেই গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন এবং কোনও মামলার তদন্ত চলার সময়ে তদন্ত বিষয়ে কতটুকু তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা সমিচীন হবে, সে সম্পর্কে একটি নীতিমালা অতি দ্রুত প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। এই নীতিমালা প্রণয়ন ও যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ/সুরক্ষা বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ প্রদান করা হলো।

এর আগে গত ২৯ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে স্থায়ী জামিন দেন হাইকোর্ট। তবে জামিনে থাকাকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনও কথা বলা যাবে না— এই শর্ত দেন আদালত।