নৌকাবিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘একঘরে’ নীতিতে আ.লীগ

17

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
বিগত উপজেলা নির্বাচনে নৌকাবিরোধীদের বিরুদ্ধে দল থেকে ‘একঘরে’ করার নীতি নিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে তাদেরকে দলীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে না রাখার পাশাপাশি দলীয় কোনো কার্যক্রমেও তাদের ডাকা হচ্ছে না। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকেই নৌকাবিরোধীদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও পদ শূন্য করার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে দলটি।

‘একঘরে’ করার নীতি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বিভিন্ন উপজেলায় যে দলীয় কার্যক্রমগুলো করেছি তাতে আমরা কিন্তু ওই চিহ্নিত অর্থ্যাৎ এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ওই নেতাদের বাদ দিয়েই করেছি। এছাড়া যারা নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে তাদের বিষয়েও দল সতর্ক রয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত উপজেলা নির্বাচনে যারা ‘নৌকা’র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচন করেছেন তাদের নানাভাবে শাস্তি দেয়া হবে। এতে যেসকল সংসদ সদস্য যুক্ত হয়েছে তাদের ভবিষ্যতে আর দলীয় মনোনয়ন দেবে না আওয়ামী লীগ। এছাড়া আগামীতে জেলা পর্যায়ের সম্মেলনগুলোতেও দলীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের আসতে দেয়া হবে না। এ জন্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় ছাড়াও তৃণমূল পর্যায়েও অনেকে সচেষ্ট রয়েছে যাতে দলীয় কোনো কার্যক্রমে ওই নেতারা যুক্ত না হতে পারেন। কারণ ওই সকল নৌকা বিরোধীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকায় রয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা স্বয়ং। এর মধ্য দিয়ে যারা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই লক্ষ্য বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ১১ জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে বলেছিলেন, উপজেলাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেসব এমপি নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন তারা আগামীতে দলের মনোনয়ন পাবেন না। নৌকা মার্কা নিয়ে বিজয়ী হয়ে এলাকায় নৌকার বিরুদ্ধেই কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। নৌকার বিরুদ্ধে যেসকল এমপি-মন্ত্রী বিদ্রোহ করতে মদদ দিয়েছে তাদের বিষয়ে গত জুলাই মাসে দলের এক সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘একজন মন্ত্রী বা এমপি যদি বিদ্রোহে মদদ দিচ্ছে বা দিয়েছে, তার শাস্তি পরবর্তীতে তাকে আর মন্ত্রী-এমপি বানাব না। শাস্তি শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলে হয় না, এটাও তার জন্য শাস্তি।’

নৌকা বিরোধীদের একঘরে করার বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, যারা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ‘অপরাধ’ করেছে তাদের বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়েও একটি সচেতনতা তৈরি হয়েছে, যেহেতু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এ বিষয়ে অনেক তৎপর রয়েছে। তা ছাড়া যারা অপরাধী তারাও জানে তারা অপরাধ করেছে, মানসিকভাবে তারাও কিন্তু শক্ত থাকবে না।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, আমরা জেলা পর্যায়ে বিরুদ্ধে অভিযোগের সততা রয়েছে অর্থাৎ যারা বিদ্রোহী প্রার্থী বা বিদ্রোহী প্রার্থীর হয়ে কাজ করেছেন, তাদেরকে আমরা সভা-সমাবেশে ডাকছি না। এছাড়াও আমরা তিনভাবে তাদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নিচ্ছি- যারা উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে, তাদেরকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। যারা বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে সরাসরি জড়িত থেকে দলের বিরুদ্ধে কাজ করেছে তাদেরকেও আমরা দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া যারা নৌকার বিরুদ্ধে অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষ হয়ে ইন্ধন দিয়েছে অর্থাৎ ইন্ধনদাতাদের শোকজের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা আমরা পালন করে যাচ্ছি।

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে যে- দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রত্যেক সাংগঠনিক সম্পাদক ওই সমস্ত বিষয়ের সারসংক্ষেপ জমা দেবেন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ওই নৌকা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো শুরু হবে। ওই বিষয়ের সকল অভিযোগ এখন দলীয় হাইকমান্ডের কাছে। নৌকাবিরোধীদের মধ্যে অভিযোগ আকারে প্রত্যেকটির কেইস ভিন্ন। এ জন্য যার ক্ষেত্রে সত্যতা পাওয়ার পর যে সিদ্ধান্ত দলের গত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে নিরূপিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে সেই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শাস্তি হবে কেইস টু কেইস। অর্থাৎ কোনো কেইস আছে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করতে হবে, কোনো কেইস আছে পদ শূন্য ঘোষণা করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কেউই রেহাই পাবে না।

একাধিক দলীয় সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার কারণে আওয়ামী লীগের দলীয় পদ হারাচ্ছেন তৃণমূল পর্যায়ের অন্তত দুই থেকে আড়াইশ নেতা। এদের অনেকেই উপজেলা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা জেলা-উপজেলার সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও আছেন। অন্যদিকে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রণোদনা জুগিয়েছেন ও দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন এমন অর্ধশত এমপি-নেতাকেও শনাক্ত করা হয়েছে।

এর আগেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অনেক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি দল। তবে এবার আর কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে প্রথমে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের। পরবর্তীতে দলের সব পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। একইসঙ্গে আগামীতে এসব ব্যক্তি যেন দলের পদ-পদবিতে আসতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব বিদ্রোহীর মদদদাতাদের এরইমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেয়া না হলেও ‘সময় মতো’ উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমি কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে যদি ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত হই হবে আমিও রেহাই পাব না। কোনো মন্ত্রী-এমপিও রেহাই পাবে না। এক্ষেত্রে দলে কোনো বিশৃঙ্খলা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এর কারণ যিনি অপরাধ করেছেন, তিনি অপরাধী। অপরাধীর যে জায়গা- সেটা আমরা চিহ্নিত করেছি।

জানা গেছে, পাঁচ ধাপের উপজেলা নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ৫ শতাধিক নেতা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। এর ফলে ৫০ থেকে ৫৫ জন এমপি-মন্ত্রী শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছেন বলে আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক নেতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল পদ-পদবিতে রয়েছেন। এ ছাড়া যারা পদে নেই তাদের চিহ্নিত করে রাখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা এরইমধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই চূড়ান্ত চিঠি দেয়া হবে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের গত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নৌকাবিরোধীদের শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে দেশে চলমান বন্যা ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণেই সেই শাস্তি কিছুটা পিছিয়ে দেয়া হয়। আগামী সেপ্টেম্বরে তা চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, যারা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রিপোর্ট তৈরি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।