আর্টিজানে হামলা: বোমা-গুলির জবাবে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে

26

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক শফিউদ্দিন শেখসহ দুই ডাক্তারের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এ সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেন। একইসঙ্গে পরবর্তী সাক্ষ্য নেওয়ার জন্য আগামী ২৯ আগস্ট দিন ঠিক করেছেন বিচারক।

সাক্ষ্য দেওয়া অপর সাক্ষীরা হলেন, গুলশান থানাধীন ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র হাউজ অফিসার ডা. সাদিয়া ইসলাম স্বর্ণা ও একই প্রতিষ্ঠানের ডা. নাদিম মহবুব। এই তিন জনসহ এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১০০ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত।

এদিন সাক্ষ্যগ্রহণকালে সাক্ষী টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক শফিউদ্দিন শেখ আদালতকে বলেন, ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান থানাধীন এলাকায় ডিউটিরত অবস্থায় রাত ৮.৫০ মিনিটের দিকে সংবাদ আসে হলি আর্টিজানে বেকারীতে সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। এ সংবাদ পাওয়া মাত্র আমিসহ একটা টিম হলির উদ্দেশ্যে রওনা হই। এরপর রাত ৯টার সময় ঘটনারস্থানে পৌঁছানো মাত্রই সন্ত্রাসীরা আমাদের লক্ষ্য করে বোমা-গুলি নিক্ষেপ করতে থাকে। জবাবে আমরাও পাল্টা গুলি করি। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে একটি অভিযান পরিচালনা করি। এ অভিযানের সময় দেশি-বিদেশি ২২ জনেরও বেশি আহত হন। আহতদের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি অবস্থায় এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম সকালে একটি অভিযান পরিচালনা করেন। এরপরই জানতে পারি ঘটনাস্থলে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়েছেন।

সাক্ষ্য গ্রহণকালে শফিউদ্দিন শেখ আরও বলেন, ২০১৬ সালের ৩ জুলাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ঘটনাস্থলে আমি তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করি। সেখানে কোনো বোমা-গুলি অন্যান্য জিনিস আছে কি না চেক করি। তবে সেই স্থান থেকে কোনো প্রকার তাজা বোমা উদ্ধার হয়নি।

ডা. সাদিয়া ইসলাম বলেন, ‘২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান থানাধীন ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র হাউজ অফিসার হিসাবে আমি কর্মরত ছিলাম। ঘটনার সময় রাত ৮ থেকে পরের দিন আমি হাসপাতালে ছিলাম। হলি আর্টিজানে আহত হওয়ায় রোগীরা সকাল সাড়ে ১০ দিক থেকে আমাদের কাছে আসতে থাকে। এসব রোগীরা ওটি, ইমার্জেন্সি, স্পেশাল কেয়ারসহ অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট হয়ে আমাদের কাছে আসেন। আমি ২২/২৩ জন রোগীর চিকিৎসা দিই।’

এ তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেন। তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে বিচারক পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ঠিক করেন।

মামলাটিতে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। ওই বছরেরই ২৯ আগস্ট পলাতক আসামি শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদের সম্পত্তি ক্রোক এবং তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেন আদালত।

মামলার আসামিরা হলেন, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা ওরফে র‌্যাশ, নব্য জেএমবির অস্ত্র ও বিস্ফোরক শাখার প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, জঙ্গি রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশিদ ও শরিফুল ইসলাম।

গত বছরের ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির মামলাটির চার্জশিট ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম (সিএমএম) আদালতে দাখিল করেন। এরপর ২৬ জুলাই সিএমএম আদালত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন।

অন্যদিকে, চার্জশিটে ২১ জন আসামির নাম থাকলেও তাদের মধ্যে ১৩ জন বিভিন্ন সময় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়। এই ১৩ জনকে বাদ দিয়ে বাকি আট জনকে অভিযুক্ত করা হয় চার্জশিটে।

মামলাটিতে গত ৮ আগস্ট আট আসামির বিরুদ্ধে দাখিল করা চার্জশিট গ্রহণ করেন আদালত। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিমের বিরুদ্ধে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় ইতালির ৯ জন, জাপানের সাত জন, ভারতীয় একজন ও বাংলাদেশি দু’জন নাগরিক নিহত হন।

রাতভর সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলার পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর অভিযানে এর সমাপ্তি ঘটে। পরে সেখান থেকে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ সাইফুল ইসলামের লাশ উদ্ধার হয়। আর সাইফুলের সহকারী জাকির হোসেন শাওন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

একই ঘটনায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের গ্রেনেডের আঘাতে রেস্তোরাঁর বাইরে নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম ও বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দিন খান। পাঁচ জঙ্গিসহ শেফ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী শেফ শাওনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে দীর্ঘদিন পরে থাকার পর বেওয়ারিশ ঘোষণা করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।