ভূমিদস্যুদের সঙ্গে ৩ কোটি টাকা লেনদেন করেন পুলিশের ডিসি ইব্রাহীম

51

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের বাড়ি দখলে ভূমিদস্যু দুই ভাই আবেদ ও জাবেদের সঙ্গে ৩ কোটি টাকা লেনদেন করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সাময়িক বরখাস্তকৃত উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান।

মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়েই রাজধানীর বংশালের ওই বাড়িটি দখল করেন তারা। রাতারাতি দখলকৃত তিনতলা বাড়ি ভেঙে, ২০০ জন শ্রমিক দিয়ে শুরু করেন নতুন ভবন নির্মাণ। আর এইসব কাজে সহযোগিতা করে পুলিশ নিজেই।

তদন্ত সূত্র বলছে, অভিযোগ ছিল রাজধানীর বংশাল থানার ২২১ নবাবপুর রোডের বাড়িটি দখলে সহায়তার জন্য পুলিশের ডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান ২ কোটি টাকা ঘুষ নেন। আর সংশ্লিষ্ট থানার ওসি শাহিদুর রহমান নেন এক কোটি টাকা। এরপর বাড়িটি দখলে নিতে সব ধরনের সহায়তাই করেন ডিসি-ওসি ও এসআই জাহাঙ্গীর হোসেন। পুলিশ পাহারাতেই রাতারাতি দখল হয় বাড়িটি।

নিরুপায় শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর সঙ্গে দেখা করেন। আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও তড়িৎ নির্দেশে যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলমের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। ওই কমিটি প্রতিবেদনে শেষ রক্ষা হয়নি ওই পুলিশ কর্মকর্তার। শাস্তির আওতায় আসছেন পুলিশের আরও সদস্য।

পুলিশের করা ওই তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ওসি, এসআই জাহাঙ্গীর আলম ও এসআই মাহবুবের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলে জড়িত থাকার ঘটনার সত্যতা পান। মামলাটি আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার, অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং ভিকটিমের জানমালের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি পুলিশ। পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে জনমনে পুলিশ সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা জন্ম নিয়েছে। সার্বিক অনুসন্ধানে এবং প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রে অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ককে অবৈধভাবে আটক করে ডাকাতি বা সম্পদ লুণ্ঠনসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রচলিত আইনে মামলা রুজুর নির্দেশ না দিয়ে এবং বিল্ডিং ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং চরম গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধে পরোক্ষ সহায়তার শামিল।‘

অন্যদিকে, ডিসি (উপ-পুলিশ কমিশনার) মোহাম্মদ ইব্রাহীম খান সম্পর্কে উল্লেখ আছে, ‘’তিনি তড়িঘড়ি করে দায় এড়ানোর জন্যই তদন্ত তদারকি প্রতিবেদন দিয়েছেন। তিন তলা ভবনটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে সেখানে নতুন করে ভবন তৈরির নিমিত্তে বেজমেন্ট করাসহ নির্মাণকাজ চলমান থাকার বিষয়ে তাকে মৌখিকভাবে অবহিত করা হলেও তিনি (ডিসি) যথাযথ পদক্ষেপ নেননি। অবৈধভাবে দখলসহ নতুনভাবে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার বিষয়ে ডিসি লালবাগ মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে, তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও চরম গাফিলতির প্রমাণপত্র কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়েছে।‘’

তাছাড়া গত ১১ ফেব্রুয়ারি সুযোগ্য পুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়ার মৌখিক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার সুষ্ঠু অনুসন্ধানের নিমিত্তে গঠিত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হলে তার (ডিসি) ওপর তলব করা ব্যাখ্যার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় কমিশনার কর্তৃক ‘অসন্তোষ জ্ঞাপন’ করা হয়।

পুরো প্রতিবেদন হাতের পাওয়ার পর, আইজিপি ডিসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রোববার রাতে ডিসি মোহাম্মদ ইব্রাহিম খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এদিকে, নিউজবিটোয়েন্টিফোর.কমের পক্ষ থেকে ওয়ারী বিভাগের ডিসি ইব্রাহিম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে, তা সম্ভব হয়নি। তবে বংশাল থানার তৎকালীন ওসি (বর্তমানে ওসি কোতোয়ালি) শাহিদুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে অনিত অভিযোগ মিথ্যা। আমার সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদনে কি আছে সেটা আমি জানি না। তিনি কোতোয়ালি থানায় ওসি হিসেবে এখনো বহালই আছেন।