দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বাড়ছে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা

57

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
● দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বাড়ছে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা,
● ডিসি আহমেদ কবীরের (ওএসডি) নারী কেলেঙ্কারি এখন টক অব দি কান্ট্রি
● মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি
● ১০ বছরে আড়াই হাজারের বেশি কর্মকর্তা অভিযুক্ত
● বিভাগীয় মামলা হয়েছে ৩৬৫ জনের বিরুদ্ধে
● এ সব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ওএসডি

প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা আমলাদের বিরুদ্ধে একের পর এক নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটলেও খুব কম ক্ষেত্রেই তারা শাস্তি পাচ্ছেন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিসি, ইউএনও ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রায়ই যৌন হয়রানি ও যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন তাদের সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতা নারীরা। যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও ব্যবস্থা নেয়া হয় খুবই নগন্য। জনপ্রশাসনে এসব গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ওএসডি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এসব তথ্যই পাওয়া গেছে।

জনপ্রশাসনের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে মাত্র ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্নিষ্ট বিধিমালার আলোকে ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর আগে সর্বমোট ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড, ১২৬ জন কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড ও ২০৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৪টি বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগই সবচেয়ে বেশি। সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতা নারী, জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষও অভিযোগ করছেন। লঘুদণ্ড হিসেবে বেশিরভাগেরই সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে মৌখিক সতর্কতা। কয়েকজন কর্মকর্তার শাস্তি হিসেবে কেটে নেয়া হয়েছে দুটি করে ইনক্রিমেন্ট। তারা আবার এই দণ্ডেও সন্তুষ্ট না হয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। অনেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারে সন্তুষ্ট না হয়ে হাইকোর্টেও যাচ্ছেন। তবে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলে পদোন্নতি বন্ধ থাকে। অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

সম্প্রতি জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির দুটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রোববার (২৫ আগস্ট) তাকে বদলি করে ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি) হিসেবে পাঠানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখা) মুশফিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জামালপুরের এই ডিসিকে চলতি বছর বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা হিসেবে ‘শুদ্ধাচার পুরষ্কার’ দিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের তৎকালীন কমিশনার মাহমুদ হাসান।

গত বছরের অক্টোবরে নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগ, ডিসি তাকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে অনৈতিক প্রস্তাব ও রাতে সার্কিট হাউসে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তাকে দাফতরিকভাবে হয়রানি করেন ডিসি। এর প্রতিকার চেয়ে ওই ম্যাজিস্ট্রেট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই যৌন হয়রানির অভিযোগের এক মাস পর গোলামুর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ‘ওএসডি’ করা হয়। আর ওই নারী কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে প্রায় এক বছর ধরে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করে আসছিলেন উপ-সচিব এ কে এম রেজাউল করিম রতন। এ ঘটনার মামলায় চার্জশিট প্রকাশের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার নারী সুবিচার প্রার্থনা করে ওই সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেন। মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মাঠ প্রশাসনকে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেয়। দুই দফা তদন্ত শেষ হলেও এখন পর্যন্ত ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।