বাংলাদেশ নির্মাণের নেপথ্য কারিগর শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যেকারণে বঙ্গমাতা

66

অধ্যাপক ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদঃ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শিল্পী। কারিগর তিনি যিনি দুই হাত আর মেধা দিয়ে কাজ করেন। শিল্পী হচ্ছেন তিনি যিনি দুই হাত, মেধা এবং হৃদয় দিয়ে কাজ করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সারা জীবনের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ আর বাঙালীকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনিই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শিল্পী। সৃজিত শিল্পের ঈজেল যিনি যত্ন করে গুছিয়ে রাখতেন তিনি শিল্পের নেপথ্য কারিগর। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যিনি মেধা দিয়ে, সাহস দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকতেন। যেকোনো রাজনৈতিক সংকট আর সমস্যা মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধুকে সাহস যোগাতেন এই মহিয়ষী নারী। গোপালগঞ্জের পাখি ডাকা সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় ‘রেণু’ নরম, সরল আর খুব সহজ ছিলেন। কিন্তু সংকটে সাহসী হতেন প্রকৃতির মতোই।

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট এক শান্ত স্নিগ্ধ গ্রামের ‘রেণু’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কি বিভৎসভাবে প্রিয়তম স্বামীর সঙ্গে জীবনদান করেছেন ভাবতেই গা শিহরিত হয়। ভারত উপমহাদেশে তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। চট্রগ্রাম এ অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উত্তাল পূর্ববাংলার জনগণও। এরকম রাজনৈতিক পরিবেশে গোপালগঞ্জ এ জন্ম গ্রহণ করেন মহিয়সী এই নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা। তখন তিনি শুধুই ফজিলাতেুন্নেছা। তিন বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর মা হোসনে আরা বেগম তার একমাত্র আশ্রয়। জন্মের পর থেকেই অসহায় এক শিশু ফজিলাতুন্নেছা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই মাকেও হারান। চাঁদের আলোর মতো ফুটফুটে গাঁয়ের রং দেখে মা তাকে ডাকতেন রেণু বলে। পিতৃ-মাতৃহীন রেণু এবার দাদার স্নেহ থেকে সারা জীবনের জন্য ভালোবাসায় আশ্রিত হলেন তারই চাচাত ভাই প্রিয় মুজিবের কাছে। রেণু থেকে হলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু তখন সবে পনের বছর বয়সে পা রেখেছেন।

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যিনি রাজনীতির দার্শনিক, মুক্তিযুদ্ধের অমর কাব্যের কবি সারা জীবন সংগ্রামে সংকটে পাশে পেয়েছেন একজনকেই। তিনি আর কেউ নন আমাদের বঙ্গ জননী শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রত্যেকটি আন্দোলনেই বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাদাত্রী প্রিয় রেণু। মমতাময়ী এই মা জন্ম দিয়েছেন রাষ্ট্রনায়ক, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অব হিউমিনিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। হুবহু নিজের আদলে গড়া শেখ রেহানাকে, জন্ম দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল আর আমাদের প্রিয় শেখ রাসেলকে। ১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হলে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার মন্ত্রীপাড়া মিন্টু রোডে চলে আসেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। প্রকৃতির মতই সরল আর স্নিগ্ধ টুঙ্গিপাড়ার পাখি ডাকা গ্রামের সেই মেয়েটিই অস্ট্রপ্রহর বঙ্গবন্ধুর যে কোনো সিদ্ধান্তের নেপথ্যচারী।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিলের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরে পাবার সিদ্ধান্তকে নাকচ করেছিলেন রেণুর অনুপ্রেরণার কারনেই। শুধু তাই না জেলখানার গেটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ছোট্ট শেখ রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন না ছেলেকে দেখে বঙ্গবন্ধু আবেগপ্রবণ হয়ে যাবেন বলে। সংসারের কোনো অভাব অভিযোগ কখনও বলেননি প্রিয় স্বামীর কাছে। মায়ের আদর্শে গড়া দুই মেয়ে শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা ছোট ভাই-বোনদের বাবার অভাব বুঝতে দিতেন না। পরিবারের বড় মেয়ে শেখ হাসিনা যেনো সংসারের আর এক রেণু, যে সমস্ত অভাব অভিযোগ, সংকট সমস্যা মোকাবেলা করতো ধৈর্য্য আর সাহসের সঙ্গে। মায়ের আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা।

১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে সারা পূর্বপাকিস্তানে জনসভা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে পারেননি। বেগম মুজিব ছেলে-মেয়েদের নিয়ে যেভাবেই থাকতেন রাজনীতির রাখাল রাজা প্রিয় স্বামীকে বুঝতেও দিতেন না। ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধু ৬ দফা পেশ করার পর পাকিস্তান সামরিক সরকার নানাভাবে বঙ্গবন্ধুকে জেল-জুলুম দিয়ে হয়রানি করতে থাকে। এক জনসভা থেকে বক্তৃতা করে গ্রেফতার হন আবার জামিন পেয়ে অন্য জনসভায় বক্তৃতা করতে গিয়েও গ্রেফতার হন। এরকম রাজনৈতিক পরিবেশে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকার বেডিংপত্র সবসময় গুছিয়েই রাখতেন। মানসিক দৃঢ়তা ও ধৈর্য্য দিয়ে উদ্ভ’ত পরিবেশ মোকাবেলা করতেন।

১৯৬৪ সালে পূর্ব বঙ্গে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গমাতার সাহস আর অনুপ্রেরণায় বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও নারায়নগঞ্জে দাঙ্গবিরোধীদের নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেন। হিন্দুদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠিত হয়। কমিটির আহবায়ক হিসেবে “পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও” শীর্ষক শিরোনামে জনগণের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করেন।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হলে সামরিক সরকার লাহোরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বৈঠকে আমন্ত্রন জানায়। বঙ্গবন্ধু প্যরোলে গোলটেবিল বৈঠকে যাবেন কিনা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, কিন্তু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে বঙ্গমাতা জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পাঠিয়েছেন ‘কোনোভাবেই প্যারোলে মুক্ত হওয়া যাবে না।’ ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা এই মহিয়সী নারী নিশ্চিত ছিলেন পাকিস্তান সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিক চাপেই মুক্তি দিতে বাধ্য হবে শর্ত সাপেক্ষে নয়। হয়েছিলও তাই। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ জনগণের আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুকে নি:শর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল আইযূব খান।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে জাতির পিতা যখন প্রিয় স্বদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তখনও শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু ছায়ার মতো তার পাশেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস সংসার-সন্তান আর অনিশ্চিত জীবনের প্রতিটি দিনও বঙ্গমাতা মাতৃভূমির মুক্তির অপেক্ষায় কাটিয়েছেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বামী আর কখনও ফিরবে কিনা জানা নেই, উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের মধ্যেও সাহসী বঙ্গজননী মুক্তিযোদ্ধাদের, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মিদের সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে তার নিরন্তর অনুপ্রেরণা, বঙ্গবন্ধুর ছায়া সঙ্গী আর জনগণের প্রেরণাদাত্রী এই মহিয়সী নারী সেকারনেই হয়ে উঠেছেন বঙ্গমাতা।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।