পশ্চিমবঙ্গের ভোটের খেলায় মোদিকে টানছে মতুয়া সম্প্রদায়ের ওড়াকান্দি

10
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন রিপোর্ট:
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আগামীকাল ২৬ মার্চ ঢাকায় পৌঁছাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার বিধানসভার নির্বাচনি প্রচারণা শেষ হওয়ার একদিন পর তিনি ঢাকায় আসছেন। ২৭ মার্চ ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি মন্দির পরিদর্শনে যাবেন তিনি; একই দিন পশ্চিমবঙ্গের আট দফার নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

সেখানে পৌঁছে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন মোদি। ১৮১২ সালে তৎকালীন পূর্ববাংলার ওড়াকান্দিতে জন্মগ্রহণ করেন মতুয়াদের এই প্রতিষ্ঠাতা। হরিচাঁদ ঠাকুরকে মতুয়া সম্প্রদায় ‌‘ঈ‌শ্বরের অবতার’ হিসেবে মনে করে।

সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে হরিচাঁদ ঠাকুর এই সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। এই গোষ্ঠীটি পরবর্তী সময়ে হরিচাঁদ ঠাকুরের ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এবং সমগ্র বাংলাজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। মতুয়ারা বর্তমানে মতুয়া মহাসংঘের অধীনে সংগঠিত; যারা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের অন্তত ৩০টি আসনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এছাড়া বিধানসভার ৭০টি আসনে তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটার রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্য নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান থাকলেও তাদের সংখ্যা ৩ কোটির ওপরে। তবে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনে আনুমানিক সাত কোটি ভোটারের মধ্যে মতুয়া ভোটার রয়েছে প্রায় এক কোটি।

তবে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচনে আনুমানিক সাত কোটি ভোটারের মধ্যে মতুয়া ভোটার রয়েছে প্রায় এক কোটি। হরিচাঁদ ঠাকুর পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সাতক্ষীরায় মতুয়া মন্দির ও হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মতুয়াদের ভোটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশভাগের পর হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের বংশধর প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর এবং তার স্ত্রী বিনাপানী দেবী মতুয়া মহাসংঘের ছায়ায় পশ্চিমবঙ্গে মতুয়াদের সংগঠিত করেছিলেন। মতুয়া সম্প্রদায়ের বনগাঁওয়ের সাংসদ শান্তনু ঠাকুর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ওড়াকান্দিতে যাবেন।

পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া ভোটার:
ভারত ভাগের পর বৃহৎ সংখ্যক মতুয়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। তারা উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, কোচবিহার এবং বর্ধমানের মতো জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন।

এই সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক শরণার্থী রয়েছে; যাদের এখনও ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি।

মতুয়া এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ):
মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে এই বাংলাদেশি শরণার্থীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মতুয়াদের কাছে ভোট চেয়েছিল বিজেপি।

কিন্তু ওই নির্বাচনের কয়েক মাস পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হলেও মতুয়াদের দেওয়া বিজেপির সেই প্রতিশ্রুতি এখনও অধরা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের এই সম্প্রদায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন দেয়।

সিএএ পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের অমুসলিম শরণার্থী বা অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার পথ তৈরি করেছে নয়াদিল্লি।

গত ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরে বিজেপির এক নির্বাচনি সমাবেশে বক্তৃতায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‌‘করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিএএর আওতায় নাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আপনারা (মতুয়া সম্প্রদায়) এ দেশের সম্মানিত নাগরিক হবেন।’

উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ঠাকুরনগর মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম একটি ঘাঁটি।

মমতা এবং মতুয়া ভোট ব্যাংক:
দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নিম্নবর্গের সম্প্রদায়ের কোনো ভোট ব্যাংক ছিল না। ২০০০’র দশকে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনি প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই রাজ্যে বামফ্রন্টের ভোটের দুর্গ ভেঙে ফেলার জন্য মতুয়া সম্প্রদায়ের দ্বারে দ্বারে যান তিনি। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে মতুয়া মহাসংঘ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

মতুয়া মহাসংঘ অতীতেও সক্রিয় ছিল; কিন্তু আলাদা ভোট ব্যাংক হিসেবে তাদের পরিচয় সুস্পষ্ট ছিল না। প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর কংগ্রেসের সাংসদ ছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী বিনাপানী দেবী বাংলায় বাম শাসনের বিরুদ্ধে প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছিলেন।

২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিনাপানী দেবীর বাসায় গিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে তার সমর্থন চেয়েছিলেন। ওই বছরের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিনাপানী দেবীর দ্বিতীয় ছেলে মনজুল কৃষ্ণ ঠাকুরকে মাঠে নামিয়েছিলেন। একই কাজ করেছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে; ওই সময় বিনাপানী দেবীর বড় ছেলে কপিল কৃষ্ণ ঠাকুরকে মাঠে নামান তিনি।

বিজেপিমুখী মতুয়া সম্প্রদায়:
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিনাপানী দেবীর পরিবারে রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়। লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার পাঁচ মাস পর বিনাপানী দেবীর বড় ছেলে কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর মারা যান। পরে উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস কপিল কৃষ্ণের স্ত্রী মমতা বালা ঠাকুরকে মনোনয়ন দেয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দেন মনজুল কৃষ্ণ ঠাকুর। নমশূদ্র-মতুয়া শরণার্থীদের নাগরিকত্বের দাবিতে তার ছেলে শান্তনু ঠাকুর কলকাতায় আন্দোলন করেন।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিনাপানী দেবীর সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় মতুয়া শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে মোদি কথা বলার পর এটি আরও বড় ইস্যুতে পরিণত হয়।

বিজেপি বনগাঁও আসনে শান্তনু ঠাকুরকে মনোনয়ন দিয়েছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনে এই আসনে মমতা বালা ঠাকুরকে পরাজিত করেন শান্তনু ঠাকুর।

মতুয়া ভোটের জন্য বিজেপি-তৃণমূল লড়াই:
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সিএএ কার্যকর করা হয়। আর এটি মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজেপির জন্য আরেকটি ইতিবাচক ঢেউ তৈরি করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকা (এনআরসি) চালু হওয়ায় মতুয়াদের ভারতীয় নাগরিকত্বপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

দেশটির সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তৈরিকৃত এনআরসির তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ে যান। ভারতীয় নাগরিকত্ব হারানো এই ১৯ লাখের বেশিরভাগই দেশটির হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

অন্যদিকে, মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানোর জন্য নতুন করে জোর প্রচেষ্টা শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মতুয়া উন্নয়ন বোর্ড এবং নমশূদ্র বিকাশ পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিন ১১ মার্চ মতুয়া সম্প্রদায়ের জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণার আশ্বাস দিয়েছিলেন তৃণমূলের এই নেত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জোর প্রচেষ্টা শুরু করে বিজেপি।

অমিত শাহ রাজ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের এক নেতার বাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন। আর এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় জন্মভূমিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া ট্যুডে।