“বিষন্নতায় ভুগছেন দেশের ৪২.৯ শতাংশ সাংবাদিক, পেশা ছেড়ে দিতে চান ৭১.৭ শতাংশ”

30
Print Friendly, PDF & Email

মুনজুরুল করিম, ফেসবুক থেকে:
“বিষন্নতায় ভুগছেন দেশের ৪২.৯ শতাংশ সাংবাদিক। এই পেশা ছেড়ে দিতে চান ৭১.৭ শতাংশ।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশনা সংস্থা ‘আইজিআই গ্লোবাল’ এর গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এই পেশার সাথে যারা সম্পৃক্ত তারা কেউই এমন ফলাফলের সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন বলে মনে হয় না। আমার ১ যুগেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তনটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে যা শিখিয়েছে-

বাংলাদেশের খুব কম গণমাধ্যমই নির্ভেজাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি হয়েছে। এ কারণেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই কোন বিজনেস মডেল নেই। তাই শুরুটা যত রমরমা হয়, কয়েক বছরের মধ্যে ঠিক ততটাই ঝিমিয়ে পড়ে। কারণ, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে মালিকরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়।

মালিকদের সুদৃষ্টি বা নিজেরা চলতে পারার মতো উপার্জন না করতে পারায়, পেশাজীবি হিসেবে সাংবাদিকের নিয়মিত বেতন পাওয়া যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি পদোন্নতি বা পেশাগত উন্নয়ন হোঁচট খায়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশায় এটা এখন চরম বাস্তবতা।

উপরের দুটি কারণে আর্থিক স্বচ্ছলতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে সাংবাদিকরা। এদিকটাতে সরকারি চাকরিজীবিরা যতটা এগিয়েছে, বেসরকারি চাকরিজীবিরা ততটাই পিছিয়েছে। এটা প্রতিযোগিতার কোন বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজারে গেলে সামর্থ্যের একটা প্রতিযোগিতা করেই ফিরে আসতে হয়।

খুব সচেতনভাবে হোক বা না হোক, সাংবাদিকতা একটা গ্ল্যামারাস পেশা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশে এর উত্থানের সময়টাতে, অনেক তরুন/তরুনী এই পেশায় ঢুকে পড়েছে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতার ডিগ্রী নিয়ে যত মানুষ এই পেশায় প্রবেশ করছে বা প্রবেশ করার অপেক্ষায় আছে, তত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই।

এ কারণেই যারাই সাংবাদিকতায় আসছে, তারাই ২/৩ বছরের মধ্যে একটা জায়গায় স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এই স্থবিরতা হতাশা এবং বিষন্নতার জন্ম দিচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েরা সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করেছে এবং তারা দুর্দান্ত সব কাজও করছে। কিন্তু সে অনুযায়ী নিজের কোন ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারেনি অনেকেই। কারণ, সে যে মাধ্যমে কাজ করে বা তার কোন প্রতিবেদন যখন নির্দিষ্ট মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত হচ্ছে, দর্শক হয়তো তখন অন্য কোন চ্যানেল দেখছে।

সাংবাদিকতার হতাশায় অনেক বড় অবদান (!) রেখেছে ফেসবুক, ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। একজন সাংবাদিক অনেক খেটে যে প্রতিবেদনটি তৈরি করে- বাস্তবে দেখা যায় তার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার আগেই স্যোশাল মিডিয়ায় সবকিছু প্রকাশিত হয়ে যায়। তখন ওই সাংবাদিকের কাজ দর্শক বা পাঠকের কাছে নতুন কিছু হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে না।

গাড়ি, বাড়ির টার্গেটও হতাশার একটি বড় কারণ। এই পেশায় যাদেরকে আইকন মনে করে তরুনরা সাংবাদিকতায় আসে, ঠিক তাদের মতো না হতে পারা বা তাদের মতো হতে পারার অনিশ্চয়তা বা কেউ কেউ যে ভিন্নপথে গেছে, সেই পথে না যেতে পারাটাও প্রতিমুহুর্তে একজন সাংবাদিককে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে পারে।

বনসাই ইফেক্ট: যে কিশোর বা কিশোরী টেলিভিশনে কোন সাংবাদিককে দেখে অথবা পত্রিকায় কোন সাংবাদিকের দুর্দান্ত প্রতিবেদন পড়ে, খুব ভালো সাংবাদিক হওয়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে এই পেশায় প্রবেশে করেছে, তার জন্য প্রথম অর্জনের বিষয় হলো- সে হয়তো তখন ওই সাংবাদিক যার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে, তারই সহকর্মী হয়। বিষয়টা প্রথমে খুব মজার মনে হলেও, ১/২ বছরের মধ্যেই সে টের পায়, তার ঐ আইকন ব্যক্তির মাথা ছাদে ঠেকে গেছে। উপরের গাছ ছাদে ঠেকে গেলে, নিচের গাছ তো বেশি বাড়ার কথা না।

আর যদি বাড়তে না পারে তবে সে হয় কোন রকমে মানিয়ে নিয়ে চাকরি করে যাবে নয়তো প্রতিমুহুর্তে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকবে। এমন আশঙ্কা যেখানে থাকে, সেখানে বেতন অনিয়মিত হলেও, হতাশা আর বিষন্নতা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

এমন আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। সবশেষে একটা বাস্তব গল্প বলি- একটা প্রতিষ্ঠানে মাঝে মাঝেই দুই-আড়াই মাস করে বেতন বকেয়া পড়ে। এতে মোটা বেতন পাওয়া লোকদের তেমন কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু যাদের প্রতি মাসের বেতন দিয়ে সংসারের বাজার করতে হয়, বাড়িভাড়া দিতে হয়, বাচ্চাদের স্কুলের খরচ দিতে হয় তারা ভয়ানক যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। তো যে কথা বলছিলাম- ঐ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ব্যক্তি পাড়ার দোকান থেকে বাকি বাজার করতে শুরু করলেন। দোকানদারও জানেন, মাসের শেষে বেতন পেলেই টাকাটা তিনি পরিশোধ করে দেবেন। প্রথম মাস গেলো বেতন হলো না, দ্বিতীয় মাস গেলো বেতন হলো না। দোকানদারের সম্মান প্রদর্শনটাও কমে আসতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত সে বলেই বসলো-
‘কি রে ভাই, আপনার কি চাকরি নাই?’
এই কথা শুনে লজ্জায় তিনি পাড়ার অন্য দোকান থেকে বাকি নিতে শুরু করলেন। অফিসে সেই ব্যক্তির কাজের গুণগত মান কেমন হবে, একবার চিন্তা করুন।

একটা সময় ছিল যখন সাংবাদিকদের বিয়ে করাটাই কঠিন কাজ ছিল। পাত্রীপক্ষ বলতো-‘ছেলে সাংবাদিকতা করে বুঝলাম। কিন্তু আর কি চাকরি করে?’

মাঝখানের বছরগুলোতে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। আবার সেই অবস্থা ফিরে আসে কি না, কে জানে !
লেখকঃ গণমাধ্যমকর্মী