টুইটারের মতো নিজস্ব ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে ভারত

16
টুইটারের মতো ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘কু’। ছবি: আউটলুক থেকে নেওয়া
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট:
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে নিয়ে ইতোমধ্যেই বিশ্বের কয়েকটি দেশের সরকার উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা সেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণও আনতে চাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিয়ন্ত্রণ আনতে নিজস্ব নিয়মকানুনও তৈরি করেছে।

একইভাবে, ইন্টারনেটে নিজেদের তৈরি প্ল্যাটফর্মগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে শুরু করেছে ভারত।

আজ মঙ্গলবার সিএনএন’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর থেকে ‘ভারতীয় প্রযুক্তি জাতীয়তাবাদ’র প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। দেশটিতে অনেকগুলো নিজস্ব প্ল্যাটফর্মও তৈরি হয়েছে।

সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর থেকে মোদি সরকার বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর চাপ দিতে শুরু করেছে। সম্প্রতি দেশটিতে ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, টিকটক ও উইচ্যাটসহ কয়েক ডজন চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করার পর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে কারাদণ্ডের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

ভারতে নিজস্ব অ্যাপগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অ্যাপ্লিকেশন বিশ্লেষণ সংস্থা সেন্সর টাওয়ারের তথ্য মতে, টুইটারের আদলে তৈরি ভারতীয় প্ল্যাটফর্ম কু (koo) এক বছরেরও কম সময় আগে তৈরি করা হয়েছিল। চলতি মার্চ পর্যন্ত অ্যাপটি ৩৩ লাখ বার বার ডাউনলোড করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতে টুইটার ডাউনলোড করা হয়েছে ৪২ লাখ বার।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারাও ‘কু’ ব্যবহার করছেন।

সিএনএন জানিয়েছে, ভারত সরকারের নতুন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিক্ষোভ নিয়ে বিদেশিদের টুইট নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পর গত ফেব্রুয়ারিতে টুইটারের চেয়েও বেশি বার ডাউনলোড করা হয় ‘কু’। মোদি সরকারের অভিযোগ, ‘হিংসাত্মক ও ভিত্তিহীন’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার বন্ধের জন্য মার্কিন সংস্থাটি যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে না।

‘কু’র সহ প্রতিষ্ঠাতা মায়াঙ্ক বিদাওয়াতকা বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে হঠাৎ করে আপনাকে কেউ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে এবং সবাই আপনাকে ও আপনার টিমকে দেখছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্লোবাল টেক জায়ান্টরা তাদের রোডম্যাপের একটি অংশ হিসেবে ভারতের জনসংখ্যাকে চিন্তা করে থাকে। কিন্তু, ভারতের নিজস্ব প্রতিভা আছে, সম্পদ আছে, অনেকের অভিজ্ঞতা আছে। এখন আমাদের স্বপ্নপূরণের মতো অর্থায়নও আছে। আমরা এমন পণ্য তৈরির বিষয়ে বলছি যেগুলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।’

এক বছরেরও কম সময়ের আগে ভারতে টিকটক, উইচ্যাটসহ জনপ্রিয় কয়েকটি চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

অ্যাপ্লিকেশন অ্যানালিটিক্স সংস্থা সেন্সর টাওয়ারের মতে, ২০২১ সালে ভারতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া দুটি অ্যাপ্লিকেশন হলো টিকটকের আদলে তৈরি সংক্ষিপ্ত ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম এমএক্স টাকাটাক ও মোজ। স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের চেয়েও বেশিবার এই অ্যাপটি ডাউনলোড করা হয়েছে।

চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করার পর ভারতীয় সংস্থাগুলো লাভবান হয়েছে। দেশটিতে ২০ কোটির বেশি টিকটক ব্যবহারকারী ছিল, তারা সবাই এখন ভারতীয় এমএক্স টাকাটাক ব্যবহার করছেন।

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন নিজস্ব সেন্সরশিপ ব্যবহার করে কয়েক দশক ধরে বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলো থেকে দেশের মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। গুগল ও ফেসবুক বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টারনেট বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে টেনসেন্ট, ওয়েইবো ও আলিবাবার মতো নিজস্ব সংস্থা নিয়ে। এদের মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববাজারেও ব্যাপক জনপ্রিয়।

সম্প্রতি, ভারতও ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে তার জাতীয় সুরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে।

প্রশ্ন হলো, ভারত সরকার কি তবে চীনের মতো বিদেশি প্ল্যাটফর্মের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে নিজ দেশে তৈরি অ্যাপকে সামনে নিয়ে আসবে না কি নিজেদের মতো করে একটি নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ তৈরি করবে?

সংবাদ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতে বর্তমানে প্রায় ৭৫ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছেন এবং প্রতি বছরই কয়েক লাখ মানুষ প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটে আসছেন।

ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয়দের আকর্ষণ করতে তারা কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে থাকে।

এদিকে, ভারত সরকার নিজস্ব অ্যাপগুলোর প্রচারণার ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয়। কু ও চিংগারি অ্যাপ দুটি ‘অ্যাপ উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জ’ এ বিজয়ী হয়েছিল। তারা পুরস্কার হিসেবে সরকারের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছিল।

সিএনএন জানিয়েছে, ভারত সরকার যদি টুইটার ও ফেসবুকের মতো অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেই কেবল ভারতীয় অ্যাপগুলো প্রতিযোগিতায় জিতবে। হয়তো ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সেগুলো জায়গা করে নেবে।

ভারতের ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস এমন একটি সম্ভাব্য বিশ্বকে তুলে ধরে যেখানে প্রতিটি দেশ প্রযুক্তি জাতীয়বাদের প্রচার করে ও নিজস্ব অ্যাপ ব্যবহারেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে, ইন্টারনেটের যে উন্মুক্ত প্রকৃতি, গোটা বিশ্বের মধ্যে সংযোগ তৈরির যে লক্ষ্য— তা ভবিষ্যতে একইরকম থাকবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠতেই পারে।