একজন নিখাদ মানুষ কর্ণেল কাজী শরীফ উদ্দিন

274
Print Friendly, PDF & Email

মামুন উল হক, ফেসবুক থেকে:
বেশ কিছু প্রিয় মানুষের মৃত্যু আর হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে অসহায় লড়াই মানসিক চাপ আর বিসন্নতায় সময়টাকে ঘিরে রাখে। সকালে কিছুটা অবসাদ আর বিষন্নতা নিয়ে মোবাইলে চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম।

হোয়াটস অ্যাপ এ আমার প্রিয় একজন মানুষ কর্ণেল কাজী শরীফ উদ্দিনের মেসেজ ও ছবি। তাঁর হৃদয়ের উদারতা আর মহানভূবতার স্মারক হিসেবে আমাকে স্মরণ করেছেন। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় সকল অবসাদ মিলিয়ে গেলো।

কর্ণেল কাজী মো. শরীফ উদ্দিন। সম্ভবত ২০১৩ সালের কোন একটি সময়ে নায়েমের প্রশিক্ষণ সেশনে প্রথম দেখা। সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষদের মাঝখানে লেঃ কর্ণেল এর রেংকব্যাজ পরিহিত সামরিক পোশাক তাঁর টান টান হয়ে বসার ভঙ্গিটা দৃষ্টি কেড়েছিল। জাতিসংঘ মিশন থেকে দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরেছেন। সেনাবাহিনীর ইনফেন্ট্রি শাখার অফিসার হিসেবে পুরোদস্তুর সৈনিক। তবুও শান্তিরক্ষী বাহিনীর স্কুল পরিচালনার মধুর স্মৃতিটা ভুলতে পারেননি বলেই দেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালনের সুযোগ আসায় কৌতুহল থেকেই নিয়ে নিলেন। প্রশিক্ষণ সেশনে আমার রুটিন দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য একটি মোটিভেশনাল সেশন পরিচালনা করা। একজন শিক্ষকের কাছে কথাগুলো আটপৌরে হলেও একজন সৈনিকের কাছে হয়তো সেগুলো একেবারেই নতুন মনে হয়েছিল। সেই থেকেই আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষের তিনি বন্ধু ও অনুরাগী হয়ে গেলেন।

এরপর থেকে বারবার নানান অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। পরবর্তী প্রতিটি প্রশিক্ষণ কোর্সে আউটস্ট্যান্ডিং পদক পেয়েছেন।

সৈনিকের পোশাকে থেকেও নিজেকে একজন শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করলেন। নানান অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যেই বলতেন, আমার সান্নিধ্য তাঁকে সৈনিক থেকে শিক্ষকে পরিণত করেছে। প্রত্যাশার অতীত এই স্বীকৃতিতে লজ্জায় আমি কুঁকড়ে যেতাম। তাঁর দায়িত্ব নেয়ায় দুর্বল প্রতিষ্ঠানটি একসময় ভতিচ্ছুকদের আরাধ্য হয়ে গেল। আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জেনে অনেকেই তদবির নিয়ে আসতেন। সবিনয়ে সকলকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তাঁর এই বিশ্বাস ও ভালোবাসা হারানোর ভয়ে নিজে থেকেই দুরত্ব বজায় রেখেছি।

চাকুরির স্বাভাবিক নিয়মে আমাদের সকলকে একসময় বিদায় নিতে হয়। তাইতো পদোন্নতি পেয়ে কর্ণেল মর্যাদার গৌরবের পালক মুকূটে ধারণ করে তিনি প্রিয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিলেন। রেখে গেলেন আমাদের সামনে নিষ্ঠা, একাগ্রতা আর দৃঢ় প্রত্যয়ের অসাধারণ অনেক উদাহরণ। নিয়ে গেলেন অগনিত শিক্ষার্থীর ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা। হয়তো একজন সৈনিক হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালন শেষে পাওনা বুঝে নিয়ে সার্ভিস থেকে বিদায় নিতেন। কিন্তু শিক্ষকতার যে অসামান্য সুযোগ পেয়েছেন, সেটি তাঁর জীবনকে বহুমাত্রিক সফলতা ও তৃপ্তিতে ভরে দিয়েছে। কামনা করি, এই ভালোবাসার স্মৃতি আর সুতোগুলো তাঁকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত জড়িয়ে রাখুক।

কৃতজ্ঞতা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এর প্রতি, যেই প্রতিষ্ঠান আমাকে এমন সব অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পাবার সুযোগ করে দিয়েছে। সকলের জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

লেখকঃ পরিচালক (শিল্প ও প্রশিক্ষণ কো-অর্ডিনেশন), বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)।