বিস্ফোরিত হলে এক কিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হতো: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

8
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন রিপোর্ট:
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলার আপিলের রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, আসামিরা রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও মুগদাপাড়া অফিসে বসে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ষড়যন্ত্র অনুযায়ী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যই মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে আসামিরা দুটি বোমা পুঁতে রেখেছিল। বোমা দুটি সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা করে তার প্রতিবেদনে বলেছে, এ বোমা দুটির একটিও যদি বিস্ফোরিত হতো তাহলে এক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী ধ্বংসলীলায় পরিণত হতো। এমনকি ভূগর্ভে নয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি গভীরে এবং ৩৪ ফুট ওপরের দিকে প্রভাব বিস্তার করতো।

বোমা বিস্ফোরিত হলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার চেয়েও বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টি হতো। সুতরাং বিচারিক আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে যে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেছে তা যথার্থ এবং আইনসম্মত।

কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলার আপিলে রায়ে আজ বুধবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব কথা বলেন।

হাইকোর্ট মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন, কোটালীপাড়ায় বোমা হামলার প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। আসামিরা ঢাকাস্থ মোহাম্মদপুর ও মুগদাপাড়া অফিসে মিটিং করেছিল। মিটিংয়ে তারা মতামত প্রকাশ করে বলেন যে, ‘‘আওয়ামী লীগ সরকার ইসলামবিদ্বেষী এবং ভারতের দালাল হিসেবে ইসলাম ধ্বংসের কাজে লিপ্ত। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারকে উৎখাত করতে হবে হত্যার মধ্যদিয়ে।’ কিন্তু কী ধরনের ইসলামবিরোধী কার্যক্রম তৎকালীন সরকার করেছিল বা ভারতের সঙ্গে কী ধরনের আঁতাত করেছিল-এ রূপ কোনো বক্তব্য দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কেউ উল্লেখ করেনি।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কেউ কেউ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গিয়েও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এ ধরনের জঙ্গি তৎপরতার আড়ালে যাদের বিচরণ ছিল তাদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তদন্তের আরও গভীরে যাওয়া উচিত ছিল। তাদের তদন্ত কাজে আরও অধিকতর মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল।

আদালত বলেন, আসামিরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা নিয়ে তৎকালীন সরকারকে দোষারূপ করেছিল। অথচ ইসলামের মূল্যবোধ, হযরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শিক দিকগুলো এদেশের মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠার লাভের জন্য এবং আগত জেনারেশনকে উদ্বুব্ধ করার জন্য বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু তাই নয়, অন্যান্য ধর্মাম্বলীর ব্যাপারেও তিনি সজাগ ছিলেন। আসামিরা যাদের ইসলামবিদ্ধেষী বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারা বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে লিপ্ত। ইসলামের মূল্যবোধ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ও কর্মে পুরো দেশ ও সমাজ অশান্তিতে বিরাজমান ছিল। আসামিদের এ ধরনের ধ্যান ধারণা ইসলাম কোনোভাবেই সমর্থন করে না। কারণ ইসলাম শান্তির ধর্ম।

আদালত বলেন, সেদিন কোটালীপাড়ায় বোমাগুলো ফুটলে বোমা পুঁতে রাখার স্থান থেকে চারপাশে এক কিলোমিটার ধ্বংসাবশেষে পরিণত হতো। মাটির নিচেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি হতো। সব মিলিয়ে ওই হামলা সফল হলে চারপাশ ধ্বংসলীলায় পরিণত হতে পারতো।

এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. মো. বশির উল্লাহ। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নাসির উদ্দিন ও মোহাম্মদ আহসান।

রায়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এছাড়া এ মামলায় দণ্ড থেকে এক ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে একজনের যাবজ্জীবন এবং দুইজনের ১৪ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়।

বেলা পৌনে ১১টা থেকে দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত এ রায় পড়েন হাইকোর্ট। ভাষার মাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলায় এ মামলার রায় দেন আদালত।

মামলার রায়ে যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তাঁরা হলেন—ওয়াশিম আখতার ওরফে তারেক হোসেন, মো. রাশেদ ড্রাইভার ওরফে আবুল কালাম, মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুন, শেখ ফরিদ ওরফে মাওলানা শওকত ওসমান, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর।

আসামিদের মধ্যে মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল, আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমানের ১৪ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সরোয়ার হোসেন মিয়াকে খালাস দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের ২০ আগস্ট কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মমতাজ বেগম উপরিউক্ত ১০ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি দেন। আদালত গুলি করে প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এ ছাড়া চার আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।

এর মধ্যে আসামি মেহেদি হাসান ওরফে আবদুল ওয়াদুদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। আসামি আনিসুল ওরফে আনিস, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান এবং সরোয়ার হোসেন মিয়াকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অনাদায়ে আরো এক বছরের দণ্ড দেওয়া হয়।

পরে এ মামলার রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। আজকের রায়ে হাইকোর্ট শুধু ১৪ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সরোয়ার হোসেন মিয়াকে দণ্ড থেকে খালাস দিয়েছেন। নিম্ন আদালতে দণ্ড পাওয়া বাকি সবার সাজা ও অর্থ জরিমানা বহাল রাখা হয়েছে।

২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। শেখ লুৎফর রহমান মহাবিদ্যালয়ের উত্তর পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছনে এ বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তৎকালীন কোটালীপাড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নূর হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন।