ডেঙ্গুর প্রকোপে রক্ত সংকট, দিশেহারা স্বজনরা

15
Print Friendly, PDF & Email

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, ঢাকাঃ
নেত্রকোনা বাদে দেশের ৬৩ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী সামলাতে। এর মধ্যেই ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় যেকোনো সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ চাহিদা তৈরি হয়েছে রক্তের। সেই রক্ত জোগাড় করতে গিয়েই রীতিমতো ঘাম ছুটে যাচ্ছে রোগীর স্বজনদের। রাজধানীর ব্লাড ব্যাংকগুলোতেও পর্যন্ত এখন রক্ত সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ‘নেগেটিভ’ ব্লাড গ্রুপের রক্ত রীতিমতো দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বরের একপর্যায়ে কোনো কোনো রোগীর রক্তে প্লেটলেট নামে একটি উপাদান দ্রুত কমতে থাকে। এই প্লেটলেট একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের নিচে নেমে গেলেই তখন রোগীকে প্লেটলেট দিতে হয়। আর প্রতি চার ব্যাগ রক্ত থেকে পাওয়া যায় এক ব্যাগ প্লেটলেট। ফলে একজন ডেঙ্গু রোগীকে যখন এক ব্যাগ প্লেটলেট দিতে হচ্ছে, তখন তার জন্য প্রতিবার চার ব্যাগ করে রক্ত প্রয়োজন পড়ছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী দিন দিন বাড়তে থাকায় এখন রক্তের সংকট দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, সারাবছরই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারজনিত কারণে রক্তের চাহিদা থাকে। তবে সম্প্রতি ডেঙ্গু তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এখন রক্তের চাহিদাও তীব্র হয়ে উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীর স্বজনরা রক্তের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাদের কেউ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কেউ ছুটছেন ব্লাড ব্যাংকগুলোতে। কেউ কেউ দ্বারস্থ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তারপরও রক্ত সংগ্রহ করতে বেগ পেতেই হচ্ছে তাদের।

স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম ও কোয়ান্টাম ল্যাবের প্রো-অর্গানাইজার নাদিম আহসান বলেন, সাধারণ সময়ের তুলনায় এখন রক্তের চাহিদা পাঁচ-ছয় গুণ বেড়ে গেছে। রক্ত দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তির তুলনায় রক্ত চান— এমন মানুষের সংখ্যাই অনেক বেশি। প্রতিদিন দুইশ থেকে দুইশ ২০ জন রক্তদাতা পাওয়া যায়। এর বিপরীতে আমাদের ল্যাব থেকে রক্ত সরবরাহ করা হয় প্রায় সাড়ে তিনশ ব্যাগ রক্ত। কিন্তু এখন প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়শ ব্যাগ রক্তের চাহিদা রয়েছে। ফলে আমরা সবার চাহিদামতো রক্ত দিতে পারছি না। অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে।

নাদিম বলেন, আমাদের এখানে ডেঙ্গু রোগীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ৩০ জনের মতো কর্মী প্রতিদিন দুইটি শিফটে কাজ করছেন। তবু চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকের কর্মীরাও জানান, তাদের কাছেও রক্তের অনুরোধ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আসছে। বিশেষ করে গত একমাসে প্লেটলেটের চাহিদা মাত্রা ছাড়িয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের হিসাবে, সাধারণ সময়ে মাসে দুইশ থেকে তিনশ ব্যাগ প্লেটলেটের চাহিদা থাকলেও জুলাই মাসে প্রায় ১৪শ ব্যাগ প্লেটলেট সরবরাহ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও অনেকে প্লেটলেট না পেয়ে ফিরে গেছেন।

একই অবস্থা দেখা গেছে রাজারবাগ ব্লাড ব্যাংক, সন্ধানীসহ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহকারী প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই। তারা বলছেন, নিয়মিত রক্তদাতার বাইরেও অনেকে রক্ত দিতে এগিয়ে আসছেন, তবে তাদের সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ‘নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্তের স্বল্পতা এমনিতেই থাকে, ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে একেকজন রোগীর এক ব্যাগ প্লেটলেটের জন্য চার ব্যাগ রক্ত মেলানোটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি নিয়মিত রক্তদাতাদের পাশাপাশি সবাই রক্ত দিতে এগিয়ে এলে ডেঙ্গু রোগীদের রক্তের চাহিদা পূরণ করা খানিকটা সহজ হতো বলে মনে করছেন ব্লাড ব্যাংকগুলোর কর্মীরা।

রক্ত পেতে ঘাম ঝরানো রোগীর স্বজনরাও বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো রক্ত সংগ্রহ করাটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। ব্লাড ব্যাংকগুলোতে ধরনা দিয়েও কয়েকদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে রক্তের জন্য। ব্লাড ব্যাংকের মোবাইল নম্বরগুলোতে কল করেও ব্যস্ত পাওয়া যাচ্ছে বেশিরভাগ সময়। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের অনেকেও রক্ত দিয়ে ফেলেছেন বলে রক্তদাতা খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে আত্মীয় এক ডেঙ্গু রোগীকে ভর্তি করিয়েছেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, আমাদের রোগীর ব্লাড গ্রুপ ‘নেগেটিভ’। ফলে রক্ত খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে। নিকট আত্মীয় প্রায় সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করেছি। তাদের অনেকেই জানিয়েছে, তারা আগেই রক্ত দিয়েছে। তিন-চার মাস না গেলে আর রক্ত দিতে পারবে না। ব্লাড ব্যাংকগুলোর ফোনে তো কলই যায় না, সবসময় ব্যস্ত পাওয়া যায়। কিছু কিছু নম্বর বন্ধই থাকে। নিজেদের ডোনার ছাড়া রক্ত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বেশ সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন নিলয়ের স্বজন। তিনি বলেন, আমার রোগীর রক্তে প্লেটলেট ২০ হাজারের নিচে নেমে গিয়েছিল। ডাক্তার বললেন, প্লেটলেট দিতে হবে। সেই রক্ত পেতে ঘাম ছুটে গেছে। অনেক কষ্টে আত্মীয়-স্বজনদের সহায়তা নিয়ে চার ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করতে পেরেছি। আবার রক্ত লাগলে কী করব, জানি না।

এ পরিস্থিতিতে সবাইকে রক্ত দিতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন আগারগাঁওয়ের নিউরোসার্জারি হাসাপাতালের চিকিৎসক রাজীব ফকির। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই যে সবাইকে রক্ত দিতে হবে, এমন নয়। যাদের প্লেটলেট আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে বা গেছে, তাদেরই কেবল রক্ত দিতে হবে। তবে যেসব ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তাদের অনেককেই প্লেটলেট দিতে হচ্ছে। যে কারণে এই সময়ে রক্তের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ সবার সবার রক্তদানে এগিয়ে আসা উচিত। অনেকেই রক্ত দিতে চান না। তাদের উদ্দেশে বলব, রক্ত দিলে কখনো কমে না। বরং মানুষ আরও সুস্থ থাকে। তাই অন্তত এখন এই সংকটের সময়ে ডেঙ্গু রোগীদের পাশে দাঁড়াতে সবাই রক্ত দিতে এগিয়ে আসুন।