ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছে ইসরাইল

5
Print Friendly, PDF & Email

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ ডেস্ক:
ইরানে হামলার ছক কষছে ইসরাইল। এজন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, সামরিক পরিকল্পনাগুলোও পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। হুমকির সুরে এসব কথা বলেছেন ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবিব কোহাবি।

মঙ্গলবার (২৬ জানুয়ারি) তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল স্টাডিজে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তিতে ফিরে যেতে চাওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বেড়ে যাওয়া উত্তেজনার পালে তার এই বক্তব্য নতুন করে হাওয়া দিচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির করা পরমাণু চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানেই থামেননি তিনি, ইরানিদের ওপর চাপিয়ে দেন আরও কঠোর সব নিষেধাজ্ঞা। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চুক্তিতে আবার ফিরে আসার চেষ্টা চালাবেন সেটা আগেই জানা ছিল।

বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেন দায়িত্ব নেয়ার পরই ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে বাইডেন পুরনো চুক্তিটির বেশ কিছু বিষয় পুনরায় যাচাই করতে চান।

এমন অবস্থায় ইরান এবং ইসরাইল দুই পক্ষই বাইডেন প্রশাসনকে চাপে রাখছে। একদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিতে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া। তবে  দরকষাকষি করে সর্বোচ্চ ফায়দাটা তুলতে চায় তেহরান। অপরদিকে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত রাখতে চায় ইসরাইল। পাশাপাশি ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও বহাল রাখতে চায় তারা।

এসব হিসাব মেলাতে গিয়েই হুমকি-পাল্টা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে দুই পক্ষ।  ইরান-ইসরাইলের এমন যুদ্ধংদেহী অবস্থান অনেক আগে থেকেই। তবে মার্কিন নীতি নির্ধারণ নিয়ে ইসরাইলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার এমন বক্তব্য বিরল। ধারণা করা হচ্ছে আগে থেকেই এসবের অনুমোদন দিয়ে রেখেছে ইসরাইল সরকার।

তার ভাষায়, ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের চুক্তিতে ফিরে যাওয়া কিংবা কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নতিসহ একই ধরনের চুক্তি করলে তা হবে কৌশলগত ও পরিচালন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খারাপ এবং ভুল।

চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেছিলেন ইসরাইলের কট্টরবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই চুক্তিতে বাইডেনের ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার তিনি তীব্র বিরোধিতা করে আসছেন। তার দাবি, চুক্তিতে ফিরে যাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম হবে।

ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে বের করে নেয়ার পাশাপাশি কঠোর সব নিষেধাজ্ঞা দেন ইরানের ওপর। ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চুক্তির শর্ত কিছু কিছু ভঙ্গ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চুক্তির শর্তগুলো বেশি ভঙ্গ করছে ইরান। চলতি মাসের শুরুর দিকে তারা ২০% ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দেশটি ভূগর্ভস্থ ফোর্দো পরমাণু চুল্লির কার্যক্রমেও গতি এনেছে। বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে যাওয়ার আগে যে জায়গায় ছিলো এখন সেই অবস্থায় ফিরে গেছে ইরান।

সম্প্রতি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে দ্রিয়ান বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ওই নীতি আসলে ঝুঁকি এবং হুমকিই বাড়িয়েছে। এটা বন্ধ হতে হবে। কারণ,… আমি বলবো, ইরান পরমাণু অস্ত্র অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময়ই জো বাইডেন বলেছিলেন, ইরান যদি চুক্তির শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে চলে তাহলে তার প্রশাসন পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসবে। অপরদিকে ইরান বলছে, চুক্তিতে নতুন করে ফিরে আসার আগে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিতে হবে।

এদিন ইসরাইলি সেনাপ্রধান বলেন, ইরানের এ পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত এটিই বলে দিচ্ছে, তারা দ্রুতগতিতে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণের দিকে এগোচ্ছে।

এই মৌলিক বিশ্লেষণের আলোকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে তিনি বেশ কিছু প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। আগে যে প্রস্তুতি আছে, তার সঙ্গে নতুন এসব যুক্ত হবে।

তার কথায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। কিন্তু এসব পরিকল্পনা আলোচনার টেবিলে থাকা দরকার।

ইসরাইলি সরকার এবং সেনাবাহিনীর কথাবার্তা অনেকটা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে করা ২০১৫ সারের পরমাণু চুক্তিতে ফিরে যায় তাহলে ইরানে হামলা চালাবে তারা।

ইরান অবশ্য বলে যাচ্ছে ইসরাইলের এসব হুমকি-ধমকি তাদের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। হাসান রুহানির চিফ অব স্টাফ মাহমুদ ভায়েজি বলেন, পূর্ববর্তী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মতো বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরাইলের কথামতো চলবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনাও বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শেষ সময়ে এসে বেশ কিছু ঘটনা খারাপ কিছুর ইঙ্গিতই দিচ্ছে। নিজের জলসীমায় দক্ষিণ কোরিয়ার একটি তেলের ট্যাঙ্কার আটক করে ইরান। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বি-৫২ বোমারু বিমান, নিমিৎজ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন পাঠায় ওই অঞ্চলে।

ইরানও সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে। লাগাতার সাতটি মহড়া চালিয়েছে তারা। চলতি মাসেই গাল্ফ অব ওমানে নৌমহড়ার সময় ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে।

সামরিক শক্তির বিবেচনায় মার্কিন-ইসরাইলি জোটের কাছে ইরান খুব কঠিন প্রতিপক্ষ নয়। তারপরেও দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে তার জন্য যে চড়া মূল্য দিতে হবে সেটাও তাদের জানা। ইরানের হাতে যে ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার আছে তার মধ্যে একটা অংশের রেঞ্জ ২ হাজার কিলোমিটারের উপরে। যা খুব সহজেই পুরো ইসরাইলে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম। এর সঙ্গে ইসরাইলকে ঘিরে রেখেছে হিজবুল্লাহ, হামাসসহ সিরিয়া এবং ইরাকের পেশাদার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার মিলিশিয়া বাহিনী। ইরানে হামলা হলে তাৎক্ষণিক যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বে তারা।

ইসরাইলকে তাই চলতে হয় সুতোর উপর দিয়ে। একটু এদিক সেদিক হলেই মহাবিপর্য ঘটে যাবে, তা ভালোভাবেই জানা তাদের। কারণ, একটা ছোট্ট পরাজয়ই ধ্বংস করে দিতে পারে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার মিথ, কেড়ে নিতে পারে জায়নিস্টদের এতদিনের অর্জন।