যত কথা মনে পড়ছে, তার কিছুটা

66
Print Friendly, PDF & Email

আদিত্য শাহীন, ফেসবুক পেইজ থেকেঃ

খন্দকার রাশিদুল হক নবা ভাইয়ের মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত রয়েছে পঁচাত্তর হাজার মানুষের নাম্বার। এর মধ্যে পনের হাজার সাংবাদিক। অন্যান্য পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক সংগঠক, ব্যবসায়ী, কুটনীতিক, ভিনদেশী পেশাজীবীসহ বিভিন্নভাবে পরিচিত বন্ধু রয়েছেন। ব্যক্তির সঙ্গে বিষয়ের সম্পর্ক যোগ করে সেখান থেকে নিয়মিত ভাগ করে করে দিবস, পর্ব ও উপলক্ষের ক্ষুদেবার্তা বপন করেন বা ব্রডকাস্ট করেন। আমরা শুনে বিস্মিত হই।

মনে পড়ে কাজী রাশিদুল হক পাশা ভাইকে। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় এক টিভি নাটকে তার চরিত্রের সঙ্গে এক কমন সংলাপ ছিল, ‘কি জানি বাপু’। শান্ত শীতল কণ্ঠে শক্ত-কঠিন বাক্য উচ্চারণে তিনি সিদ্ধ। কুষ্টিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ে একটি ‘দোকান খোলার’ চিন্তাটি বহুদিনের; তিনি জানালেন সে তথ্য। আমরা মৃদু হাসির মধ্য দিয়ে তৃপ্তি পেলাম। বহুদিন পরে হলেও একটি স্বপ্নের দারুণ সুন্দর বাস্তব যাত্রাটি হয়েই গেল। যাত্রা না বলে অভিযাত্রা বলাই ভালো।

কুষ্টিয়া সাংবাদিক ফোরাম ঢাকা ২০১৪ থেকে ঝিনুক আর নুড়ি কুড়োতে কুড়োতে এবার একটি মালা গাঁথতে পারলো। আমাদের অনেকেই জানতাম না মুফাখখারুল আনাম কিংবা মমতাজ বিলকিস আপাকে। আমাদের ওপরে কী পুরুট আকাশ, কত সমৃদ্ধ অতীত। যাদের ছায়ায় দাঁড়াতে পারছি তাদের শাখা প্রশাখা আর পত্রের ঘনত্ব আমাদেরকে নিশ্চিত করছে সম্ভাবনাময় এক ভবিষ্যত।

ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের সুরম্য ভবনের তৃতীয় তলার হাউজি কক্ষে সাংবাদিকরা নিজেদের মতো হেসে কেশে স্বাধীন ভঙ্গিমায় বেশ কয়েক ঘন্টার জটলা পাকাতে পারতো না, যদি না সাংবাদিকদের মধ্যে নবা ভাইয়ের মতো অগ্রজ থাকতেন। সাংবাদিকরা হয়তো এই ডেঙ্গুর মৌসুমে রিপোর্টার্স ইউনিটির বাগান বলে পরিচিত আঙিনায় আর্টিফিশিয়াল বেত আর প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে অল্প মিষ্টি চায়ের সঙ্গে তৃপ্তিকর আলোচনা করে ঢেকুর ছেড়ে বেরুতো। তাতে সবার মনেই কিসের যেন এক খেদ থেকে যেত। এখন আর সেই খেদ নেই। সবার মন ভরে গেছে। নবা ভাই শুধু অফিসার্স ক্লাবের করলা ভাজির বিশেষত্ব তুলে ধরলেন। বললেন, ঢাকা ক্লাবও এর সাথে পারে না। আমরা বলবো, খিচুড়ি, বেগুন ভাজি, মুরগির ঝোল কিংবা দধি সবই ছিল অতুলনীয়।

কুষ্টিয়া সমিতির সভাপতি আক্তারুজ্জামান অভিভুত চিত্তে মনে করিয়ে দিলেন, গরমে গরমে একটি ডাইরেক্টরি বের করার উদ্যোগ নিয়ে নিন। তাহলে এর একটা ভালো রেজাল্ট পাবেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় আমাদের স্যার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল করীম তার স্নেহধন্য এক দঙ্গল মানুষের মাঝে যেভাবে আপ্লূত হলেন, তাতে আমরাও মিশে গেলাম সম্পর্কের এক গভীর মিথস্ক্রিয়ায়। এই অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে উপস্থাপনার শুরুতেই আমার কেন জানি মনে পড়ে গেল, আমি পদ্মা গড়াইয়ের কুলুকুলু ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, ড. আনোয়ারুল করীম যেন সেই ধ্বনিটিকেই ভরিয়ে দিলেন সামুদ্রিক উচ্ছ্বাসে।

খুব বেশি চাপ ও গুরুত্ব না দিয়ে শুধু উচ্চারণ করেছি কুষ্টিয়ায় হতে হবে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়, বলেছি কুষ্টিয়া শহরকে ঘোষণা করতে হবে সিটি অব প্রেস হিসেবে। বিষয়গুলো আরো যত্ন করে লিখিত আকারে যথাযথ জায়গায় পেশ করার তাগিদটি তৈরি হয়েছে ওই আয়োজন থেকে।

কুষ্টিয়া সাংবাদিক ফোরাম ঢাকা একটি প্লাটফরম যে ক্ষেত্রটিতে এসে স্বপ্ন দেখতে পারা যাচ্ছে। খোকসার শিক্ষার্থী সংগঠনের রুনা আখতার বেশ ভালোমতোই বুঝেছে ব্যাপারটি। তাই উচ্চারণ করেছে, আমাদের সবার মনের কথা। আমরা কুষ্টিয়ার মানুষ ইজম গড়তে পারি না, ইজম গড়ি না। কিন্তু আমাদের গড়তে হবে।

দাবি কিন্তু এভাবেই ওঠে। পাটুরিয়ায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এতদিন ঠিকই হবে। কিন্তু মানুষের প্রাণের প্রত্যাশাটি উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তাকে তো উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের সিনিয়র সহসভাপতি মাহমুদ হাফিজ দাবি দাওয়ার ভেতর এ বিষয়টি বেশ বোল্ড করে উচ্চারণ করলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি রাজনীতিক সাংসদ সরওয়ার জাহান বাদশাহ, সাংসদ সেলিম আলতাফ জর্জ, সচিব আনোয়ার হোসেন বিষয়গুলো নিয়ে নিশ্চয়ই কথা বলবেন দরকারি জায়গাগুলোতে। এসব দাবির সঙ্গে তাদের একাত্মতা তো রয়েছেই।

আমরা একটি প্রকাশনা করেছি। এর জন্য খাটাখাটনি করেছেন আমাদের প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক জাফর আহমেদ। তিনি একটি সম্পাদকীয়ও রচনা করেছেন। সন্দেহ নেই সুলিখিত সেটি। আমরা প্রথমে তথাকথিক স্মরণিকা প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে চেয়েছি। চেয়েছি একটি সমৃদ্ধ প্রকাশনা করতে। অঙ্গসৌষ্ঠব ও মুদ্রণে মানোত্তীর্ণ কিছু করতে। সে প্রত্যাশা অপূরণ থাকতেই পারে। এর জন্য অনেকটা দায় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের। তারা যথাযথভাবে গ্রাফিক্স এর মাধ্যমে ভেতরের সাদাকালো ছবিগুলি স্পষ্ট করতে পারেনি, ছাপার সময় ভালো কালি ব্যবহার না করার কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত চেহারা হয়তো পায়নি প্রকাশনাটি। প্রচ্ছদে ম্যাট আর স্পট লেমিনেশন ব্যবহার করতে পারা যায়নি তাড়াহুড়ার কারণে। তবে আমরা ১০০ ভাগ স্বপ্ন দেখে ৮০ ভাগ কিন্তু পেয়েছি। আর ২০ ভাগ এর পরেরবার পুরণ করতে পারবো বিশ্বাস রাখি।

ভালো লেগেছে কুষ্টিয়ার মানচিত্রের বুক জুড়ে সাধক সাংবাদিক কাঙালি হরিনাথ মজুমদার স্মৃতি যাদুঘরের ভবনটি যুক্ত করতে পারার বিষয়টি। বিশেষ করে, লাল সবুজ, হলুদ, শাদা, কালো আর ধুসর রঙের স্বপ্নিল এক মিশ্রণ আল্পনার ভেতর দিয়ে মিশিয়ে দিতে পারার সফলতায়। যেখানে জ্যামিতিও আছে, আছে স্বপ্নের গাণিতিক স্পর্শও। অনুষ্ঠানের আগ মুহূর্তে আমাদের যুগ্ম সম্পাদক আইয়ুব আনসারি ভাই বললেন, যারা আসবেন তাদের জন্য অন্তত: কিছু একটা দিতে চাই। তিনিই উদ্যোগ নিয়ে দু ঘন্টায় রূপোলী কলমের ওপর সংগঠনের লোগে ছেপে নিয়ে হাজির হলেন। এসে গেল গোলাপের সঙ্গে রজনীগন্ধার এক বন্ধনযুক্ত ছড়া। আর কী লাগে!

ভালো লাগছিল অফিসার্স ক্লাবের তৃতীয় তলায় উঠেই। লিফট পেরিয়ে হাউজি কক্ষের দিকে যেতেই সম্মুখে জাতির জনকের মুখ। আমাদের কুষ্টিয়ার কৃতি শিল্পী কিরিটি রঞ্জন বিশ্বাসের তেল রঙের কাজ। তারপর থেকে পুরো ব্যাপারটিই আমাদের আমাদের হয়ে গেল। এমন ‘আমরাই আমরাই’ ব্যাপারটি ঢাকার মতো রুক্ষ শহরে সহসা আর আয়োজন করা যায়নি।

আমার চিন্তা ছিল সকাল নয়টায় পৌছে যাবো ভেন্যুতে। দশটার অনুষ্ঠানের ঘন্টা খানেক আগেই পৌঁছানোই যথেষ্ট। গুছিয়ে নিতে নিতে একে একে সবাই এসে যাবেন। আমি তখন রাস্তায়। সহ-সভাপতি আব্দুল বারী ফোন কেরলেন অনুষ্ঠানস্থল থেকে। বললেন, এখানে প্রস্তুতি চলছে। বেশ আগে ভাগে তার দায়িত্বশীল উপস্থিতি জেনে বেশ আশান্বিত হলাম। মজার ব্যাপার হলো, আমার মতোই আগে ভাগে পৌছনোর চিন্তা করেন সভাপতি রেজোয়ানুল হকও। গাড়ি এক সঙ্গে পার্ক এক একসঙ্গেই উঠলাম তিনতলায়। অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের গোছগাছে তিনি একেবারে সক্রিয় হয়ে থাকলেন। রাজা ভাই শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেন উপস্থিতির দিকে। শেষমেষ সেখানেই সূচিত হলো আয়োজনের সার্থকতা।

সাইফুল ইসলাম রিকু, অর্পন মৈত্র, বোরহানুল হক সম্রাট, আরিফ হোসেন, আতিক হেলাল, মাহমুদুল করীম চঞ্চল, কাজল রশীদ শাহীন, শরিফুল ইসলামের মতো অনেকেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সংগঠনের প্রথম এই প্রীতি সম্মিলনীকে সার্থক করেছেন। আমাদের প্রিয় অগ্রজ সনদ দা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেননি ঠিক, কিন্তু আমাদের সবার চিন্তা ও কথার মধ্যে তার সক্রিয় শক্তি ছিল। সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুজ্জামান, অর্থ সম্পাদক উজ্জল রায়, দপ্তর সম্পাদক মনি, নির্বাহী সদস্য অখিল পোদ্দার, সঞ্জয় চাকী এই আয়োজন সফল করতে ভেতরে ভেতরে কাজ করেছেন। জহির মুননা পুরো অনুষ্ঠানটির ভিডিও ধারণ তত্বাবধান করেছেন।

আমাদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক তুনাজ্জিনা তনু বলছিলেন, এই আয়োজনের রেশ থাকতে থাকতে একটি ঈদ পুনর্মিলনী করলে কেমন হয়? আমরা অনেকেই বলেছি, চিন্তাটি বেশ ভালো।

একসময় ভাবা হতো, কুষ্টিয়ার মানুষ সংঘবদ্ধ হয় না। তারা খুব আত্মকেন্দ্রিক। ২৬ জুলাইয়ের পর থেকে অনেকেই আর পুরোনো এই উপলব্ধিতে বিশ্বাস আনতে পারছেন না। কুষ্টিয়া সাংবাদিক ফোরাম ঢাকার সার্থকতা এখানে। ভালো লাগছে অনুষ্ঠান শেষে নিজেদের মধ্যে নানানুখি আলোচনা, বিতর্ক ও আত্মসমালোচনার তৎপরতায়। ঘটনা যখন ঘটে, তখনই সেটি আলোচনা সমালোচনার যোগ্য হয়। ঘটনা না ঘটলে কি এসব হয়?

লেখক, জেষ্ঠ্য বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই ও সাধারণ সম্পাদক, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ফোরাম ঢাকা।