’সাকরাইন’ উৎসবে আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে ডিএমপিকে চিঠি

11
Print Friendly, PDF & Email

জবি করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
‘সাকরাইন’ উৎসবে ডিজে, আতশবাজি, ফানুস ও মদ নিষিদ্ধ চেয়ে ডিএমপি কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছে পুরান ঢাকার ৮৩ ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালা।

মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে মিন্টো রোডে ডিএমপি কমিশনার বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করে তারা এ আহবান জানান।

চিঠিতে পুরান ঢাকাস্থ ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, আগামী ১৪-১৫ জানুয়ারীতে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ‘সাকরাইন’ নামক একটি অনুষ্ঠান পালিত হতে যাচ্ছে। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, লালবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ছাদগুলোতে নানান আয়োজন হয়। এর মধ্যে আছে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগীতা, ডিজে পার্টি, আতশবাজি-ফানুস উড়ানো। এ বছরও একই ধরণ ও বড় পরিসরে এ উৎসব আয়োজন করা হবে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, মূলতঃ সাকরাইন নামক এ আয়োজনে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। এ সময় শুধু পুরান ঢাকা নয় বরং নতুন ঢাকার জনগণও পুরান ঢাকার ছাদগুলোতে ভীড় জমাতে থাকে। অথচ করোনা মহামারীকালে যে কোন ধরণের জনসমাগমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। এ বছর সাকরাইন উপলক্ষে হাজার হাজার ছাদে লক্ষ লক্ষ লোকের ভীড় তথা জনসমাগম ঘটার সম্ভবনা আছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে।

সাকরাইনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বাড়ির ছাদ থেকে ফানুস উড়ানো ও আতশবাজি পোড়ানো হয়। অথচ ডিএমপির পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে ফানুশ উড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া ‘বিস্ফোরক আইন, ১৮৮৪ অনুসারে রঙিন আতশবাজী রাখা সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। বলার অপেক্ষা রাখে না, ফানুস ও আতশবাজি থেকে ভয়াবহ ধরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। সম্প্রতি থার্টি ফাস্ট নাইট উপলক্ষে উড়ানো ফানুস থেকে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের রেজিন্সি টাওয়ার নামক একটি বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে প্রায় ৮০টির মতো পরিবার বসবাস করতো, অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে আতংকগ্রস্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হন।

ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা আরও বলেন, পুরান ঢাকা জনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি এলাকা। ২০১৯ সালে চকবাজারের চূড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনও শুকিয়ে যায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে পুরান ঢাকায় বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের গোডাউনের উপর সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থ নিয়ে যেখানে এত সতর্কতা, সেখানে আতশবাজির মত বিষ্ফোরক পদার্থ ফুটলে তা অবশ্যই ভয়ানক বটে। যদি আতশবাজি ও ফানুশ থেকে পুরান ঢাকায় কোনরূপ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, তবে একদিকে যেমন সরু গলিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে না পেরে বিপুল জানমালের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়বে কালো ছায়া, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যবসায়ীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।

তারা বলেন, আতশবাজির পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব বিদ্যমান। আতশবাজির কারণে বায়ুতে বিষাক্ত কণা ছড়িয়ে পড়ে, যার দরুণ পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া বিস্ফোরকের উচ্চ ও ভীতিকর শব্দে অসুস্থ রোগীদের হৃদযন্ত্রজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়।

ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, সাইকরাইনকে কেন্দ্র করে মুখের মধ্যে কেরোসিন নিয়ে ‘আগুন খেলা’ নামক ভয়ঙ্কর খেলা প্রদর্শিত হয়, যা করতে গিয়ে অনেকের মুখ ঝলসে যাওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। এছাড়া ছাদে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পরে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ সময় ছাদগুলোতে বিকট শব্দে রাতভর গান বাজানো হয়, যা চারপার্শ্বের জনগণকে মারাত্মক বিরক্ত করে। অথচ এত উচ্চ শব্দে গান বাজানো ‘শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬’ অনুসারে অপরাধ বটে।

তারা আরো বলেন, সাকরাইন উৎসবের নামে চলে মদ-গাজা ও ইয়াবা সেবন ও ডিজে পার্টি। অথচ বাংলাদেশের আইনে জনসাধারণের জন্য মদ-গাজা-ইয়াবা’র মত মাদকের সেবন ও কেনাবেচার উপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। মূলতঃ মদ খাওয়া কিংবা ডিজে পার্টি নামক উশৃঙ্খলতা কখনই আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। এ ধরনের অনুষ্ঠানের কারণে আমরা আমাদের সন্তানদের ‘নৈতিকতা’ নিয়ে চিন্তিত। এসব অনুষ্ঠানে গিয়ে তারা আমাদের আদি সংষ্কৃতি থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজধানীতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক ছাত্রীর ধর্ষণ ও হত্যার খবরে আমরা এমনিতেই আতঙ্কিত। এর মধ্যে নতুন করে সাকরাইনের উন্মাতাল মদ ও ডিজে পার্টির নামে নতুন কোন ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনার জন্ম হলে তা দেশ ও জাতির জন্য সত্যিই ভয়ানক হবে।

ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, থার্টি ফাস্ট নাইটকে ঘিরে নিরাপত্তার জন্য ডিএমপি ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলো, যা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু অনেক এলাকায় সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করতে দেখা যায়, যার কারণে মিডিয়াতেও শিরোনাম হয়, “প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই থার্টি ফার্স্ট উদযাপন। (তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন, যমুনা নিউজ, ১লা জানুয়ারী, ২০২১) মূলতঃ উক্ত নির্দেশনায় বাড়ি ছাদে ডিজে পার্টি নিষিদ্ধ হলেও বাড়িওয়ালার দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ ছিলো না। আবার আতশবাজি ও পটকা ফোটানো নিষিদ্ধ হলেও পটকা-আতশবাজি কেনাবেচার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো না এবং সেক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগও ছিলো না। এ কারণেই সম্ভবত নির্দেশনা থাকার পরও অনেকে তা উপেক্ষা করতে পেরেছে।

সাকরাইন উপলক্ষে ডিএমপির কাছে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা দুটি দাবী করেন। তা হলো- এক. অনলাইন বা মাঠপর্যায়ে (দোকানে) যারা আতশবাজি বা ফানুস ক্রয়-বিক্রয় করছে তাদের গ্রেফতার করা এবং আইনত শাস্তির মুখোমুখি করা। দুই. কোন বাড়ির ছাদে কোন আইন শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ (ফানুস উড়ানো, আতশবাজি, ডিজে পার্টি, জনসমাগম, মদ-গাজা-ইয়াবা সেবন, আগুন খেলা, উচ্চস্বরে গান বাজানো ইত্যাদি) সংঘটিত হলে তার দায় ওই বাড়ির বাড়িওয়ালার এবং এর জন্য সেই বাড়িওয়ালাকেই আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে- এই মর্মে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা।

আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন- ডিএসসিসি মেডিকেল রোড সাইড মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি মুহম্মদ কবির হুসাইন মনা, নাজিরাবাজারের ব্যবসায়ী মুহম্মদ আল রাশিদ, নাসির উদ্দিন সরদার লেন ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালা মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম, চকবাজার বেগমবাজারের ব্যবসায়ী মুহম্মদ কাউসার রহমান, সিদ্দিকবাজারের ব্যবসায়ী মুহম্মদ মোস্তাক, কাজী আলাউদ্দিন রোডের ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান, হোসনী দালান এলাকার বাড়িওয়ালা মুহম্মদ হাসু, মিডিফোর্ড রোডস্থ ব্যবসায়ী ফয়জুর রহমানসহ পুরান ঢাকাস্থ ৮৩ ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা।