এটাই কী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসহ বছর?

12
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন ডেস্ক রিপোর্ট:
ইতিহাসের অন্যতম এক মন্দ সময়ের খাতায় ইতোমধ্যেই নাম লিখিয়েছে ২০২০ সাল। শুরুটা হয়েছিল মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের মাধ্যমে; তাতে পুড়ে ছাই হয় চার কোটি ৬০ লাখ একর জমি। সিরিয়ার সমান এই অগ্নিত্রাসে ৮শ’ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণীর বাস্তুসংস্থান সমূলে ধবংস হয়। পুড়ে যায় অজস্র বসতবাড়ি, অনেক ব্যক্তির প্রাণও কেড়ে নেয় এ দাবানল।

আবার যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি বর্বরতায় কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে দানা বাঁধে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন ও বিক্ষোভ। উপকূলীয় ঘুর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ে আর পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রেও যেন অস্ট্রেলিয়া থেকে উৎসাহ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আরেক মারাত্মক দাবানল।

কিছু কী বাদ পড়ে গেলো! অবশ্যই, মহামারীর কথাটা এবার উল্লেখ করতেই হয়। কিন্তু, সেটাতো এখন অতিমারীর আকারে বিশ্বকে শাসন করছে। বিশ্বব্যাপী সাড়ে ১৭ লাখের বেশি জীবন কেড়ে নিয়েছে এ মহামারী। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও ছিল তার তাণ্ডবের সামনে অসহায়, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির পায়তাঁরায় দিনেদিনে আরও প্রাণ সংহারক রূপ নেয় কোভিড-১৯। এপর্যন্ত ৩ লাখের বেশি মার্কিন নাগরিক মারা গেছে।

আর তাছাড়া, মহামারীর বিস্তার ঠেকাতে জারি কড়া লকডাউন ও শাটডাউনের সুবাদে দেশে দেশে বিপর্যস্ত হয় অর্থনীতি। কর্মস্থল হারায় কোটি কোটি মানুষ। মন্দা চাপে বিশ্বের ঘাড়ে, আর সেই দুর্দশায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট বেড়েছে অভাবী মানুষের। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় ২০২০ সাল ছিল দুঃসহ এবং মোটেও ভালো নয় এমন এক সময়।

কিন্তু, এটাই কী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসহ বছর?

এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের আরেকটু পেছন ফিরে দেখা দরকার। পৃথিবী অনেক সঙ্কটপূর্ণ বর্ষের সাক্ষী। তবে, ২০২০ সালকেও হার মানিয়ে ভয়াবহতম বছরের শিরোপার দাবিদার হতে পারে, খ্রিষ্টীয় বর্ষপুঞ্জি অনুসারে এখানে এমন কিছু সালের কথা আলোচনা করা হলো;

৫৩৬ সন

২০২০ সাল বেশ খারাপ ছিল, সকলেই একবাক্যে তা মেনে নেবেন, কিন্তু তাওতো আমরা সুর্যের আলো পেয়েছি। ৫৩৬ সনে আইসল্যান্ডে এক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণে এত বেশি ছাই উৎপন্ন হয় যে- তা পুরো বিশ্বকে সুর্যালোক প্রতিফলিত করার মতো এক ঘন ধোঁয়াশার চাদরের নিচে ঢেকে দেয়। কোভিড-১৯ সঙ্কট একবছরে শেষ হবার নয় তেমন লক্ষ্মণ স্পষ্ট, ৫৩৬ সনের বিপর্যয়ও ছিল টানা ১৮ মাসে জুড়ে।

পৃথিবীর জনসংখ্যাতে পড়েছিল এর মারাত্মক প্রভাব। সুর্যালোকের অভাবে তাপমাত্রা হ্রাস পায়, শস্য উৎপাদন করা অসম্ভব হওয়ায় বড় বড় জনপদে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। সেটাও যেন যথেষ্ট ছিল না, কারণ তারপরই দেখা দেয় বিউব্যুনিক প্লেগের মহামারী। তৎকালীন সেরা বিশ্বশক্তি রোম সাম্রাজ্যের ২৫ থেকে মতান্তরে ৫০ শতাংশ নাগরিক এই প্লেগের কবলে প্রাণ হারিয়েছিল।

তাই বলা যায় ২০২০ সাল যদি খারাপি হয়, তাহলে সে ৫৩৬ সনের কাছে নস্যিমাত্র।

১৫২০ সন

খারাপ সময় খুঁজতে রোম সাম্রাজ্যের কালে ফিরতে না চাইলে, ১৫২০ সালের দিকেও তাকাতে পারেন। ইউরোপের জন্য সময়টা তেমন অশুভ ছিল না। কিন্তু, দুই আমেরিকা মহাদেশের জন্য ছিল বিপরীত চিত্র, সেখানে বিপর্যয়ের শুরুটা হয় এবছর থেকে।

১৫২০ সালে এখন যেখানে মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ সেখানে এসে জাহাজ ভেড়ায় স্পেনীয় অভিযাত্রীরা। তারা সঙ্গে নিয়ে আসে গুটিবসন্তের জীবাণু। এই জীবাণুর সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের অধিবাসীদের কোনো পরিচিতি ছিল না। ছিল না কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাই পরের কয়েক শতাব্দী জুড়ে থেকে থেকে গুটিবসন্তের মহামারীতে প্রাণ হারাতে থাকে তারা। জনশূন্য হয়ে পড়ে এককালে তাদের প্রতিষ্ঠিত সমৃদ্ধ অনেক জনপদ।

ইউরোপীয়দের মধ্যে জীবাণুটির বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ছিল, তাই তাদের লুটতরাজ আর উপনিবেশবাদের সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে গুটিবসন্ত। স্পেনীয়রা আসে এপ্রিলে, তার কয়েক মাসের মধ্যেই অক্টোবর নাগাদ ভেরাক্রুজের অর্ধেক অধিবাসী জীবাণুর সংক্রমণে প্রাণ হারায়।

শুধু ভেরাক্রুজ নয়, এরপর দুই আমেরিকা মহাদেশের যেখানে ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তি পা রেখেছে, সেখানেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আদিবাসীদের জনসংখ্যা। কিছু পণ্ডিতের মতে আমেরিকার জনসংখ্যার প্রায় ৯০% অধিবাসী গুটিবসন্তে মারা গিয়েছিল। ইউরোপীয় যেকোনো অস্ত্রের চাইতে বেশি আদিবাসীকে হত্যা করেছে এ ভাইরাস।

১৯১৮

প্রথম মহাযুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে, তখনই এক নতুন এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস হানা দিল যুদ্ধক্ষেত্রের ট্রেঞ্চে অবস্থানকারী সৈনিকদের মধ্যে। এ প্রাদুর্ভাব পশ্চিম রণাঙ্গনের স্যাঁতস্যাঁতে- অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অচিরেই মহামারীর আকার ধারণ করে। আর যুদ্ধফেরত সৈনিকদের বদৌলতে তা বিশ্বমারীতে রূপ নেয়। খুব পরিচিত লাগছে কী শুনতে?

লাগলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, যুগে যুগে এভাবেই ভ্রমণকারীদের হাত ধরে বিশুদ্ধ পরিবেশে পা রেখেছে নতুন জীবাণুরা। ১৯১৮ সনের মহামারীতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ২০-৪০ বছর বয়সী পূর্ণবয়স্করা সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর শিকার হয়। তখন এর কোনো টিকা ছিল না, আর জন সমাগম এড়াতে নেওয়া নানাবিধ সরকারি পদক্ষেপে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ, সকলে বিষয়টিকে স্বাগত জানায়নি। ঠিক যেমন এখন যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ঘরে বন্দি থাকতে নারাজ, তেমন অবস্থাই আরকি।

তবে সঙ্কট অন্যখানেও ছিল, জার্মানির পরাজয় তখন আসন্ন। তার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মহামারীর কথা জানলে শত্রুর মনোবল চাঙ্গা হবে, এজন্য মহামারীর হুমকিকে জনসম্মুখে খাটো করে দেখায় প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের প্রশাসন। সরকারের এমন মনোভাবের ফলেই মানুষ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিধিমালা মানতে খুব একটা উৎসাহী ছিল না।

১৯৩৩

ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় শুধু নতুন কোনো জীবাণুর আক্রমণেই হয়, এমনটা ভাবা অবান্তর। প্রাকৃতিক দুর্যোগও অনেক সময় মানুষের হৃদয়ের অন্ধকারের কাছে হার মেনে। ১৯৩৩ সনেও এমন এক ঘটনা ঘটে, যখন হিটলার প্রথম মহাযুদ্ধে পরাজিত-অপমানিত জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। হিটলারের উত্থান আর তারপর বর্বরতার যে নজির বিশ্ব দেখেছে, তা এবছরকে ইতিহাসের কলঙ্কময় এক সময়ে পরিণত করে।

১৯৩৩ সালে জার্মানির পার্লামেন্ট ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে হিটলার তার রাজনৈতিক শত্রুদের গ্রেপ্তার করার এবং নিজেকে জরুরি মুহূর্তে বিশেষ ক্ষমতার অধিকার দেন। এই লক্ষ্যেই নাৎসি পার্টি আগুন লাগিয়েছিল বলে এখন প্রায় সকল ঐতিহাসিক একমত।

এরপর ধীরে ধীরে জার্মানির সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ভেঙ্গে নিজেকে সর্বময় কর্তার আসনে বসান হিটলার। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের বর্তমানের সঙ্গে এ পরিস্থিতি মিলে গেলে অবাক হবেন না। কারণ, ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। নানা সময়ে নানা কালে নতুন আঙ্গিকে মাত্র।

হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন, তার বেশ ক’বছর আগে থেকে মহামন্দার কবলে ধুঁকছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯২৯ সালে মার্কিন পুঁজিবাজার ধসের মধ্য দিয়েই এর সূত্রপাত।

জার্মানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ফুয়েরার বিশ্বজয়ের স্বপ্নে মাতলেন। তার এই স্বপ্ন থেকাতেই শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রায় ৩০টি জাতি এ যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়, আর সংঘাতে প্রাণ হারায় সাড়ে ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষ। এদের বেশিরভাগই ছিল নিরাপরাধ বেসামরিক নাগরিক। আর নাৎসি শাসক শ্রেণি ১ কোটি ১০ লাখ মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। এই গণহত্যাই ইতিহাসে হলোকস্ট নামে পরিচিত।

ইহুদি, সমকামী, স্লাভ এবং অপ্রয়োজনীয় মনে করা যেকোনো শ্রেণীকে এভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের শেষ হলেও, তার ফলে সৃষ্ট মানসিক ধাক্কা আজও মানুষকে শোকাকুল করে।

অজ্ঞাত এক বছর

পৃথিবীর বয়স শত শত কোটি বছর। সেই তুলনায় মানুষের বিচরণ মাত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে। সিংহভাগ সময়েই ছিল অন্যান্য প্রাণীকূলের রাজত্ব। তারা অনেক বিপর্যয়ও দেখেছে। কিন্তু, সবচেয়ে বড় বিপদটি এসেছিল আজ থেকে সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে কোন এক বছরে। ওই সময় বড় এক উল্কাপিণ্ড এসে আছড়ে পড়ে অধুনা মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে। এর আঘাতে এমন তাণ্ডবের সৃষ্টি হয়, যাতে পৃথিবীতে বসবাসকারী ৭৫ শতাংশ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, মারা পড়ে ডানাহীন সকল ডাইনোসর।

২০২০ সালে নতুন জীবাণু আঘাত হেনেছে, উল্কাপিণ্ড যে নয় সেজন্যেই আমাদের ভাগ্যকে অন্তত ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ।

সূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন