হঠাৎ জ্যাক মা’র বিরুদ্ধে চীন, কিন্তু কেন?

২৯ই ডিসেম্বর, ২০২০ || ১০:৩২:৪৫
2
Print Friendly, PDF & Email

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ ডেস্কঃ
চীনে সফলতার প্রতিশব্দ হিসেবেই পরিচিত জ্যাক মা’র নাম। ইংরেজি শিক্ষক থেকে উদ্যোক্তা বনে যাওয়া জ্যাক মা বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। মার্কিন টেক জায়ান্ট আমজনের প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠেছে তার প্রতিষ্ঠিত আলিবাবা। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম চীনা ব্যক্তি হিসেবে জ্যাক মা’ র সাথে সাক্ষাৎ করেন ট্রাম্প।

চীনের অনলাইন দুনিয়ায় ‘ড্যাডি মা’ হিসেবেও পরিচিত জ্যাক মা এই সাফল্যের হাত ধরেই রকস্টারের মতো সাফল্যের দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। ২০১৭ সালে শীর্ষস্থানীয় চীনা অভিনেতাদের সাথে একটি শর্ট ফিল্মে অপরাজেয় কুং ফু মাস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। চীনা পপ গায়িকা ফায়ি ওংয়ের সাথে গানও গান তিনি। চীনের শীর্ষস্থানীয় চিত্রশিল্পী জেং ফাংঝির সাথে তার আঁকা ছবি সোথবাই নিলামে ৫৪ লাখ ডলারে বিক্রি হয়। চীনের তরুন ও উচ্চাকাঙ্খীদের জন্য স্মরণীয় ছিল ‘ড্যাডি মা’র গল্প।

তবে সম্প্রতি জনসাধারণের অভিমত অনেকটাই বদলে গেছে তার ব্যাপারে, অবস্থাদৃষ্ট দেখে মনে হয় তাকে অপছন্দ করাটাই মানুষের জন্য পছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ভিলেইন’, ‘ইভল ক্যাপিটালিস্ট’ ও ‘ব্লাডসাকিং ঘোস্ট’ এর মতো তকমাও পেয়েছেন। একজন লেখক মি. মা’র ‘১০টি মারাত্মক পাপ’ এমন তালিকাও বানিয়েছেন। মার্ক্সের উদ্ধৃতি দিয়ে অনেকেই ‘দুনিয়ার শ্রমিকেরা এক হও’ মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন জ্যাম মা সম্পর্কিত প্রতিবেদনে।

তার প্রতি চীনা সরকারের বিরুপ আচরণ শুরু হওয়ার পরপর জনমনে তাকে নিয়ে অসন্তোষ লক্ষ করা যায়।

চীনের সরকারি কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন তারা আলিবাবার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন।

একই সাথে অ্যান্ট গ্রুপকেও নজরে রেখেছে চীনা সরকার। আলিবাবার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার দিনই অ্যান্ট গ্রুপের সাথে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কর্মকর্তারা দেখা করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চীনের অসংখ্য মানুষ অনুভব করছেন, জ্যাক মা’র মতো অনেক সুযোগ-সুবিধা তারা পাচ্ছেন না। এমনকি মহামারি পরবর্তী সময়েও না। একদিকে চীনের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিলিয়নেয়ারের সংখ্যার চেয়েও বেশি, আবার দেশটির প্রায় ৬০ কোটি মানুষের মাসিক আয় ১৫০ ডলার বা তারও কম। এবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশটির সামগ্রিক ব্যয় ৫ শতাংশ কমে গেলেও, বিপরীতদিকে বিলাসদ্রব্যের পেছনে গতবছরের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয় গ্র‍্যাজুয়েট তরুণ শিক্ষার্থী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীরাও চাহিদা অনুযায়ী চাকরি খুঁজে পেতে সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হন। উন্নত শহরগুলোতে থাকার ব্যবস্থা করাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। অ্যান্ট গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ নেয়া তরুণ জনগোষ্ঠী ঋণ নেয়ার জন্যই অনুতাপে ভুগছেন।

চীনের অর্থনৈতিক সফলতার মধ্যেই ধনীদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশও প্রকট হয়ে উঠছে।

অবস্থাদৃষ্ট দেখে মনে হচ্ছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টিও এ অসন্তোষের পক্ষেই আছে। চীনের উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের খবর এটি।

এবছরের বার্ষিক অর্থনৈতিক নীতি সম্পর্কিত সভায় পুঁজির অস্বাভাবিক বিস্তার রোধে তদন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে কি ধরনের পুঁজিপতিদের সাথে শি জিন পিং দ্বন্দ্বে যাবেন, কাদের সাথে যাবেন না তাও অনেকটা স্পষ্টই। ঝাং জিয়ান নামের এক শিল্পপতির উদ্দ্যেশ্যে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে যান তিনি অ্যান্ট গ্রুপের সাথে বিবাদ চলাকালীন সময়েই। ঝাং শি জিন পিং-এর জন্মস্থান গড়ে তুলতে সাহায্য করেন, বেশকিছু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন সেখানে। ব্যবসার সাথে সাথে ব্যবসায়ীদের জাতির জন্যও কাজ করতে হবে এমন বার্তা দিয়েছেন শি জিন পিং। ব্যবসায়ীদের সাথে এক আলোচনা সভায় শি জিন পিং ঝাং জিয়ান কে অনুসরণ করে তার মতো দেশপ্রেমিক হওয়ার পরামর্শ দেন সবাইকে। তবে ঝাং জিয়ান যে দেউলিয়া হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেন এবিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

জ্যাক মা’রও বেশকিছু অনুদান মূলক প্রকল্প আছে। চীনের গ্রামীণ এলাকার বেশ কিছু উদ্যোগ ও আফ্রিকায় প্রতিভাধর উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের মতো অনেক প্রকল্প আছে তার। তবে অনেক দিক দিয়েই তিনি ঝাং জিয়ানের চেয়ে আলাদা।

কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেয়া শক্তিশালী মন্তব্যের জন্য তার খ্যাতি আছে। ২০০৩ সালে তার প্রতিষ্ঠিত আলিপে-ই আজকের অ্যান্ট গ্রুপ।

“আলিপে’র জন্য কাউকে জেলে যেতে হলে নাহল আমিই যাবো।” তাকে এমনটাও বলতে শুনেছেন তার সহকর্মীরা। অনেক সময়ই তিনি কৌশলে তাকে শায়েস্তা করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন সরকারকে। অ্যান্ট গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ব্যাপারে বলেছিলেন, “সরকারের দরকার হলে আমি এটি (অ্যান্ট গ্রুপ) সরকারকে দিয়ে দিতে পারি।

বর্তমানে তার এসব বিস্ফোরক মন্তব্যই সত্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। ইউনিভার্সিটি অব হংকং এর বিজনেস স্কুলের অর্থনীতিবিদ ঝিউ চেন জানান, ‘অ্যান্ট গ্রুপের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়বে বা এর বেশিরভাগ অংশ সরকারি মালিকানাধীন হবে এমন সম্ভাবনাও আছে।’

চীনা সরকারের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রন কৌশল পরিবর্তনও দেখা যায় জ্যাম মা’র ওপর কড়াকড়ি আরোপে। দেশটিতে সবসময়ই বিভিন্ন কন্টেন্ট সেন্সর করা হতো, আবার একই সাথে অবাধ বাণিজ্যের ব্যবস্থাও ছিল। এক্ষেত্রে বাঁধা নিষেধও ছিল স্বল্প পরিমাণে। সরকার পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানও একাজে যুক্ত হয়নি। তবে শুরুতে চীনের ইন্টারনেট ভিত্তিক শিল্পের ক্ষেত্রও ছোট ছিল।

বর্তমানে গুগল, ফেসবুকের চেয়ে বেশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রনে আছে আলিবাবা ও টেনসেন্ট। আমেরিকান টেক জায়ান্টগুলোর মতো চীনা টেক জায়ান্টগুলোও ক্ষুদ্র প্রতিদ্বন্দ্বীদের সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়। একারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর লাগাম টেনে ধরার চেষ্টার পেছনের কারণ বুঝতেও বেগ পেতে হয়না।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত না করেই নিজেদের ব্যবসা চালিয়ে যায় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান। অনেক প্রযুক্তি সংস্থা মানুষকে ট্র‍্যাক করতে সরকারকে সহায়তাও করে থাকে। তবে তারপরও প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও প্রভাবকে হুমকির চোখেই দেখছে চীনা সরকার।

তবে টেক জায়ান্টগুলোই চীনে একচেটিয়া ব্যবসা করছে এমন নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক- অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জরুরি সেবার ব্যবসার প্রভাব অনেক বেশি।

“চায়না মোবাইল, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য আছে। কেননা সরকারি অনুমতি ছাড়া আপনি এক্ষেত্রে কাজই করতে পারবেন না।” লিখেছিলেন পেকিং ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ঝাং ওয়েইয়িং।

তার এই সংক্রান্ত লেখা বেশ কিছু ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলে দ্রুতই সেন্সর করে দেয়া হয়।

জ্যাক মা ও বড় টেক জায়ান্টগুলোর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্ত কতদূর গড়াবে তা এখনো বলা কঠিন। তবে চীনের অবাধ বাণিজ্যের সমর্থকরা মনে করছেন ১৯৫০’র দশকের দিকে পেছনে হাঁটতে যাচ্ছে চীন।