লন্ডন থেকে এসে নিজ খরচে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে: মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত

২৮ই ডিসেম্বর, ২০২০ || ০৩:৫৬:৪৬
12
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
লন্ডন থেকে কেউ দেশে এলে তাকে নিজ খরচে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। সিভিল অ্যাভিয়েশন এ বিষয়টি নিশ্চিত করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আজ সোমবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যোগ দেন।

সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইট যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফ্লাইট যোগাযোগ চালু থাকবে। তবে যারাই লন্ডন থেকে আসবে, তাদের ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে।’ একদিন আগের করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে এলেও বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টিনে থাকতে হবে বলে জানান সচিব।

কবে থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে এ প্রসঙ্গে সচিব জানান, যেহেতু আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাই আজই কার্যকর করলে অনেকে ঝামেলায় পড়তে পারেন। তাই, এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের জন্য দুই থেকে তিনদিন সময় দেওয়া হবে।

খন্দকার আনোয়ারুল আরো জানান, ‘আশকোনা হজ ক্যাম্প ও উত্তরার দিয়াবাড়িতে সরকার কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করবে। তবে যাত্রীকে সব খরচ বহন করতে হবে। এছাড়া যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ভালো মানের হোটেলের ব্যবস্থাও করা হবে। সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এটি নিশ্চিত করবে।’

যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও জাপানে নভেল করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন বা স্ট্রেইন শনাক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে করোনা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

এদিকে, বাংলাদেশের একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, করোনার নতুন এই স্ট্রেইন বা ভ্যারিয়েন্ট শিশুদের বেশি সংক্রমিত করছে। আর এটিই বেশি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এদিকে, করোনা মহামারি শুরুর পর করোনার নতুন এই বিবর্তিত রূপের সংক্রমণের হার বেশি বলে জানা গেছে। সবমিলিয়ে বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞেরা।

করোনার নতুন ধরন শনাক্ত প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশের জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভাইরোলজিস্ট) অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘দেশ-বিদেশের করোনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে আমরা এখন পর্যন্ত যা জেনেছি, তাতে করোনার নতুন এই রূপ শিশুদের বেশি আক্রান্ত করছে। এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ খারাপ দিক। কারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের মতো করে শিশুদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।’

নজরুল ইসলাম আশঙ্কা করে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত করোনার যেসব টিকা নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে, সেগুলো সব ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন তো বেশি আক্রান্ত করছে শিশুদের। তাহলে উপায় কী? আমার-আপনার বাচ্চা টিকাহীন থাকবে?’

করোনা ভাইরাসের নতুন ধরনটির সংক্রমণের হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে জানিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমিসহ টেকনিক্যাল কমিটি সরকারকে অন্তত ১৪ দিন ইউরোপসহ যেসব দেশে করোনার নতুন স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে, সেসব দেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা, সবই চলছে। দুই-তিনদিন আগেও লন্ডন থেকে ২০০ যাত্রী নিয়ে একটি ফ্লাইট এসেছে দেশে। নতুন এই স্ট্রেইনকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।’

নজরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আমরা সরকারকে বলেছি, এই ১৪ দিনের মধ্যে আমাদের যথাযথ কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করার পর সরকার চাইলে ফ্লাইট আবার চালু করতে পারে। তবে ওই সব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের অবশ্যই ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। সাত দিনের কোয়ারেন্টিন কোনো যথাযথ সিস্টেম হতে পারে না। ১৪ দিন পর তারা করোনা নেগেটিভ হলে তবে ছেড়ে দেওয়া হবে। না হলে হাসপাতালে ভর্তি থাকবে।’

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির পূর্বাভাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের এক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে নানা সময়ে করোনার নানা পূর্বাভাস দিয়ে আসছি। গত ১৪ ডিসেম্বর এক ভার্চুয়াল সভায় আমরা পাঁচজন বলেছি, আগামী জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সেজন্য যথাযথ প্রস্তুতি রাখতেও আমরা স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়েছি।’

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে করোনা সংক্রমণের কী অবস্থা হতে পারে—এমন এক প্রশ্নে পরামর্শক কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইনফুলেঞ্জা-৩, রাইনো ভাইরাস ও রেসপিরেটোরি সিনসিটিয়াল নামক চারটি ভাইরাস দেখা যায়। এ ভাইরাসগুলো বেশির ভাগ মানুষকে আক্রান্ত করে থাকে। আর ভাইরাসের ধর্ম হচ্ছে, একটি ভাইরাস শরীরের প্রবেশ করলে অন্য ভাইরাসকে ঢুকতে দেয় না। সেক্ষেত্রে আপাতত পরিস্থিতিতে উপকারি এই ভাইরাসগুলো যদি আমাদের সংক্রমিত করে, তাহলে শীতে করোনা না-ও বাড়তে পারে। আবার ওই পাঁচজন যে পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেটিও হতে পারে।’

করোনার জন্য প্রস্তুত টিকাগুলো নতুন স্ট্রেইনটির জন্য সমানতালে কাজ করবে কি না—এমন প্রশ্নে ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এটা তো করোনারই আরেকটি রূপ। সুতরাং, কাজ করার কথা। তবে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজ না-ও করতে পারে। যেমন স্পাইক প্রোটিনের ক্ষেত্রে এটি কাজ করবে না।’