‘ওষুধ ছিটালে দক্ষিণ সিটির মশা উড়ে উত্তরে যায়’

21
Print Friendly, PDF & Email

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটালে সেই এলাকার মশা উড়ে উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলে যায় বলে হাইকোর্টকে জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের পক্ষের এক আইনজীবী।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর হাইকোর্ট বেঞ্চকে দক্ষিণ সিটির পক্ষের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা একথা বলেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে আদালতের তলবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে হাইকোর্ট এসে মশা নির্মূলে কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

তবে মশা নির্মূলে বর্তমানে যে ওষুধ ছিটানো হয় তা অকার্যকর উল্লেখ করে কার্যকর নতুন ওষুধ আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে দুপুরের মধ্যে আদালতকে জানাতে বলা হয়।

এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে দক্ষিণ সিটির পক্ষের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা হাইকোর্টকে বলেন, যে ওষুধ এখন ছিটানো হয় এটা অকার্যকর নয় তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এখন এডিস মশারা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে গেছে। তাই দিনে ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়ালে এই ওষুধেই মশারা মরবে।

এরপর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা হাইকোর্টকে বলেন, ‘অবস্থা এমন হয়েছে যে, রোববার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটালে সেই এলাকার মশা উড়ে সোমবার উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলে যায়।’

তখন আদালত বলেন, এটা একটা কথা হলো? সদরঘাটের মশা কি তাহলে উড়ে উত্তরা চলে যায়?

এরপর এ বিষয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে এ আইনজীবী বলেন, দুই সিটি কর্পোরেশন যৌথভাবে ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়িয়ে একই দিনে ওষুধ ছিটালে এই ওষুধেই কাজ হবে। ডোজ বাড়াতে হবে, কারণ মশারা এখন ফিনাইল, হারপিক ও বিটুমিনের পানি খেয়ে ফেলে। তাই আমরা ওষুধ ছিটানোর ডোজ বাড়িয়ে দিনে ৫/৬ বার ওষুধ দিয়ে দেখতে চাই। এতে মনে হয় কাজ হবে। কারণ এই একই ওষুধ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় দিনে ৫/৬ বার ছিটানো হয় এবং ওখানে মশা নেই।

এসময় আদালত দক্ষিণ সিটির আইনজীবীকে বলেন, আপনারা দিনে ৩ বার গুলি করুন বা ৬ বার গুলি করুন সেটা আমাদের বিষয় না। আমরা চাই মশা মরুক।

এরপর আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা আদালতকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিসসহ মশা নির্মূলে আগামী তিন-চারদিন দুই সিটিতে ছিটানোর মাত্রা (ডোজ) বাড়িয়ে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে দেখতে চাই। এতে মশা মরবে বলেই মনে করি।

এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষের আইনজীবী তৌফিক ইনাম টিপু আদালতকে বলেন, ‘নতুন ওষুধ আনা এখনই সম্ভব না। নতুন ওষুধ আনতে সর্বসাকুল্যে এক মাস সময় লাগবে। তাই আগামী কয়েকদিন আমারা কমবাইন্ডলি (সমন্বিত) অভিযান চালাই। সে সময়টুকু আমাদের দেন। আশা করি এতে কাজ হবে।’

এরপর আদালত মশা নিধনে দুই সিটির সমন্বিত অভিযানের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়ে এ বিষয়ে মঙ্গলবার পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।

আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাইনুল হাসান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সায়েরা ফায়রোজ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রেজা ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক এনাম টিপু।

গত ২২ জুলাই হাইকোর্ট ঢাকা মহানগরীর ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহী রোগের বিস্তার রোধে মশা নির্মূলের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব করেন।

সেই অনুযায়ী দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে হাজির হয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আহমেদ বলেন, আমাদের এ সিটি কর্পোরেশনে এক কোটির বেশি লোক। আর ১০টি জোনে ৭৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল মাত্র ৪২৯ জন।

তখন আদালত বলেন, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এত কেন?

তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। ক্লাইমেট সেনসেটিভ ডিজিজ। আর এ বছর আমাদের দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ও সর্বোচ্চ উষ্ণতা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রভাব চলছে।

এসময় আদালত বলেন, ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না কেন? গত বছর ওষুধ ছিটালে ঘরেও তার ঝাঁজ পেতাম। এবার গন্ধও পাওয়া যায় না। জনগণের ধারণা হচ্ছে এবারের ওষুধে কাজ হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, আমরা যখনই ওষুধ আনি তখনই সরকারি দুটি ল্যাবে টেস্ট করে পজিটিভ সার্টিফিকেট পেলেই তা ব্যবহার করা হয়।

তখন আদালত বলেন, যখন দেখলেন ওষুধ কাজ করছে না, তখন অন্য জায়গায় দ্রুত টেস্ট করলেন না কেন? এসব কি আমাদের বলে দিতে হবে? হোয়াট ইজ দ্য প্রবলেম? আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সারা দেশের স্বাস্থ্য দেখবে। কারণ, যে অবস্থা হচ্ছে এটা কেবল সিটি কর্পোরেশনের উপর ছেড়ে দিলে হবে না। বিষয়টা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেও দেখতে হবে।

এরপর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন আদালতকে বলেন, আমরা নতুন ওষুধ কিনব। এজন্য কারিগরি কমিটি করেছি। সমস্যা হচ্ছে, পিপিপি’র (পাবলিক প্রাইভেট প্রকিউরমেন্ট) মাধ্যমে করতে হয়। সেখানে অনেক সময় লাগে। তবে ডিপিএম’র মাধ্যমে কিনলে তাড়াতাড়ি ওষুধ পেয়ে যাব। এরপর আদালত তার মৌখিক আদেশে নতুন ওষুধ আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে দুপুরের মধ্যে দুই সিটির আইনজীবীদের জানাতে বলেন।

এর আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ও এডিস মশা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে আসার পর বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারর্দীর হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৪ জুলাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ আদেশ দেন।