প্রতিদিন গড়ে ১১টি সড়ক দুর্ঘটনার সাক্ষী দেশ, মূল কারণ চালকের বেপরোয়া গতি

15
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন রিপোর্ট:
প্রতি বছরই সড়ক দুর্ঘটনায় ঝড়ছে হাজারও প্রাণ। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দফায় দফায় বৈঠকে বসেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। সংকট সমাধানে নেয়া হয়েছে নানাবিধ পরিকল্পনাও। যদিও সড়কে থামেনি মৃত্যুর মিছিল। এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪১২টি। গড়ে প্রতি মাসে ৩৪১টি এবং প্রতিদিন ১১টি সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

তথ্য বলছে, গেল পাঁচ বছরে ১৫ হাজার ২৯৬ টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৪ হাজার ৯৬৮ জন আর আহতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৪৭ জন। ২০১৬ সালে সংগঠিত ২ হাজার ৫৬৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৪৬৩ জন আর আহত হয়েছেন ২ হাজার ১৩৪জন; ২০১৭ সালে সংগঠিত ২ হাজার ৫৬২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৫১৩ জন আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৮জন; ২০১৮ সালে সংগঠিত ২ হাজার ৬০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৫ জন আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২০জন; ২০১৯ সালে সংগঠিত ৪ হাজার ১৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ১৩৮ জন আর আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৪১১জন; ২০২০ সালে সংগঠিত ৩ হাজার ৪১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ২১৯ জন আর আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৮৪জন।

অতিরিক্ত গতি, ভুল ওভারটেকিংসহ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় থামিয়ে দিচ্ছে জীবনের গতি। দুর্ঘটনারোধে গাড়ি চালানোয় দক্ষতার অভাব দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। তবু বৈধ চালকের চেয়ে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছেই। সার্বিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে দুষ্ট চক্র থেকে বের হতে পারছে না এই খাত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হকের মতে, সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। ফলে শুধু যে নিরাপত্তার বিষয়টি ঝুকির মুখে তা নয়, এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যানজটও। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বৈধ চালকের পরিসংখ্যান জেনেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ কেনো নতুন গাড়িকে ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকট সমাধানে দক্ষ চালক গড়ে তোলার পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে নিবিড় নজরদারি ও আইন প্রয়োগের বিষয়ে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসেব অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪২০। ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে ৪২ লাখ ৪৩ হাজার ৯০২ জনের আর ২ লাখ ৫০ হাজার ৫১৮টি যানবাহনের কোনো বৈধ চালক নেই। নিবদ্ধিত ভারি গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৪টি, এর বিপরীতে লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ জনের। অর্থাৎ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৮ টি গাড়ি পরিচালিত হচ্ছে ভিন্ন ক্যাটাগরির লাইসেন্স প্রাপ্ত কিংবা বৈধ চাকের দ্বারা। ৩০ লাখ ৬২ হাজার ৫৩৪টি মোটর সাইকেল নিবন্ধিত থাকলেও লাইসেন্স রয়েছে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪০৬ জনের। বাকি ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ১২৮ টি মোটর সাইকেলের কোনো বৈধ চালক নেই।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে দায় নিতে নাড়াজ পরিবহন মালিক শ্রমিকরা। বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানিয়েছেন, এই দায় কারও একার নয়। বছরের পর বছর বিআরটিএ কয়েক লাখ লাইসেন্স বরাদ্দ করতে পারছে না ফলে বাড়ছে চালক সংকট। সরকারি নানা উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, করোনা মহামারিতে থমকে গেছে প্রকল্পসমূহ কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনারোধে বিকল্প নেই দক্ষ চালক তৈরির। আর পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী জানিয়েছেন, সংকট সমাধানে ১১১ টি সুপারিশমালা আর পরামর্শ আবদ্ধ রয়েছে কেবলই বৈঠকে। চিহ্নিত ব্ল্যাক স্পটসমূহ, চাকলদের জন্য কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বৃদ্ধির পাশাপাশি নজর দিতে হবে চালকদের ভর্তুকির বিষয়েও। আইনি জটিলতা ও লাইসেন্স বদ্দারের সমস্যা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সমাধান না হলে পরিবহন শ্রমিকদের আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বলছে, অব্যবস্থপনার দায় তাদেরও একার নয়। বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী জানিয়েছেন, লাইসেন্স বরাদ্দজনিত সমস্যা সমাধানে সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে, অচিরেই হাতে লাইসেন্স পাবেন চালকরা। এছাড়া জটিলতা কমিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিন্ন ক্যাটাগরির লাইসেন্স প্রাপ্তির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নতুন বিধিমালায়। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশের তথ্য বলছে, সারা দেশে ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি; ভুল ওভারটেকিং ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ আর অন্যান্য কারণ ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এলাকা ভিত্তিক সড়ক দুর্ঘটনার হার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ন্যাশনাল হাইওয়েতে সবচেয়ে বেশি ৬৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। রিজিওনাল সড়কে ১৮ দশমিক ৪, রুরাল রোডে ৫ দশমিক ৪, ফিডার রোড ৪ দশমিক ২, সিটি রোডে ১ দশমিক ৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়। আর দুর্ঘটনাস্থলের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভিত্তিতে, সবচেয়ে বেশি ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয় অনিয়ন্ত্রিত এলাকায়। ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ১৩ দশমিক ৮, রোড ডিভাইডার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ৮ দশমিক ২, পথচারী পারাপারে ২ দশমিক ৩, পুলিশ ও ট্রাফিক বাতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার হার ১ শতাংশ।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মো. আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও দেশের প্রতিটি সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ। ব্ল্যাক স্পট সমূহ চিহ্নিতের পাশাপাশি নির্দেশনা পেলে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত তারা। লাইসেন্স ব্যাতী কোনো চালককেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তার মতে, দুর্ঘটনারোধে বিকল্প নেই সচেতনতার। চালক থেকে শুরু করে যাত্রী, মালিক কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থা কাজ করতে হবে সবাই মিলে।