দেশের মসজিদে লকডাউনের মধ্যেও জুম্মায় মুসল্লিদের ভিড়, সরকারি অনুরোধ মানা হচ্ছে না

25
Print Friendly, PDF & Email

অনলাইন নিউজ ডেস্ক:
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের কারণে ঘরে নামাজ পড়তে সরকারের অনুরোধ এবং লকডাউনের পরিস্থিতি সত্বেও শুক্রবার ঢাকাসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে জুমার নামাজে ছিল মুসল্লীদের ভিড়।

আলেম ওলামাদের অনেকে বলছেন, মসজিদগুলো সাধারণ মুসল্লীদের ঘরে নামাজ পড়ার পরামর্শ দিচ্ছে, কিন্তু তারা মসজিদে এসে নামাজ পড়া বন্ধ করতে চাইছেন না।

সরকার বলছে, মসজিদে আপাতত নামাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকায় আলোচনা চালানো হচ্ছে।

দেশে অফিস-আদালত এবং পরিবহনসহ সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে ঘরে রাখতে সরকার বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় সেনাবাহিনী নামিয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এবং প্রধানমন্ত্রীও করোনা ভাইরাস নিয়ে এখনকার পরিস্থিতিতে ঘরেই নামাজ পড়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু এরপরও শুক্রবার সারাদেশের মসজিদগুলোতে জুম্মার নামাজে প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।

ঢাকার লালমাটিয়া এলাকায় একটি মসজিদে নামাজে অংশ নেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম।

তিনি বলছিলেন, “বিশ্বব্যাপীই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে প্রচারণা চলছে। কিন্তু একটা বিশ্বাস থেকে আমার কাছে মনে হয় যে, মসজিদে গেলে আমার কিছু হবে না। এটাই আমার বিশ্বাস।”

“মসজিদে গিয়েই আমি নামাজ পড়ি। জুম্মা তো অবশ্যই। আমি গত জুম্মাতে গিয়েছি। আজকেও আমি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছি”- বলেন তিনি।

‘আজকে মনে হয়েছে, মানুষ একটু ভয়ভীতি নিয়ে আসছে। আমার ধারণা, ৫০ শতাংশ মানুষ এসেছে এবং তারা একে অপরের থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। আর বেশিরভাগ মানুষই ফরজ নামাজ পড়ে চলেও গেছে।”

রাজধানীতে এবং দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে খবর পাওয়া গেছে যে, শহরের মসজিদগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম হলেও অনেক মানুষই জুম্মার নামাজে অংশ নিয়েছেন।

সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে আলেম ওলামাদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে। তবুও মসজিদে জামাতে নামাজ বন্ধ করা যায়নি।

তবে মসজিদে নামাজ ফরজের মধ্যে সীমিত রাখার বিষয়টা কার্যকর হয়েছে।

ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মিজানুর রহমান বলছিলেন, নামাজ সীমিত করা হচ্ছে। কিন্তু তারা একেবারে জামায়াত বন্ধ করতে চাইছেন না।

“সীমিত পরিসরে হলেও জামাত হওয়া, এটা কাম্য। শরীয়তের ভিত্তিতে জামাত হওয়া চাই। এবং আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি অনেক বেশি আবেগ। এরপরও আমরা মানুষকে বুঝিয়েছি যে, যতটুকু সম্ভব এই সময়টাতে ঘরে নামাজ আদায় করুন। এরপরও কিছু মানুষ আসছেন।”

তিনি আরও বলেছেন, “বায়তুল মোকাররমে হাজার হাজার মানুষ আসেন। তবে এখন খুবই অল্প আসছেন। আমার মনে হয়, এখন যে ক’জন করে আসছেন, তাতে অসুবিধা হবে না।”

জামাতে নামাজ বন্ধ করতে চান না ইমামরা:
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশেই মসজিদে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

পাকিস্তানেও সরকার সিন্ধু প্রদেশে শুক্রবারের জুমাসহ অন্যান্য নামাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ইমামদের একটি সংগঠন ইমাম সমাজের সাধারণ সম্পাদক এবং চকবাজার মসজিদের ইমাম মো: মিনহাজ উদ্দিন বলেছেন, করোনা বাংলাদেশে মহামারি হলে তারা মসজিদেই কোয়ারেন্টিনে যাবেন, কিন্তু জামাতে নামাজ বন্ধ করবেন না।

“মুসল্লিদের আমরা বারবারই বলে আসছি যে, আপনারা ঘরে নামাজ পড়েন। মসজিদে না আসলেও এখন চলবে। বাকি মসজিদে জামাত বন্ধ হোক- এই বিষয়টায় আমরা এখনও মতামত দিতে পারছি না। কারণ কোরান এবং সুন্নাহ থেকে এরকম কোনো দিকনির্দেশনা আমরা পাই না।”

“আমরা যেটা চিন্তা করেছি যে, আল্লাহ যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, যদি বাংলাদেশেও মহামারি হয়েই যায়, সেক্ষেত্রে আমরা কিছু মুসল্লী এবং ইমাম খতিব যারা আছি, তারা মসজিদেই মসজিদ কোয়ারেন্টিন করবো। যেটাকে ইসলামের ভাষায় এহতেকাফ বলা হয়। আমরা এহতেকাফে বসবো। কিন্তু জামাত চালু রাখবো।”

আলোচনা চালাচ্ছি: বলছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী
বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিষয়টা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক দিক থেকে স্পর্শকাতর। সেজন্য সরকার নিজে থেকে জোরালো কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না বলে তারা মনে করেন।

তবে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো: আব্দুল্লাহ বলেছেন, জামাতে নামাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। সেজন্য তারা আলোচনা চালাচ্ছেন।

“আলেম ওলামাদের এই বিষয়ে চিন্তাভাবনাটা অনেক নিকটে এসে গেছে। তারাও মনে করছেন যে, এভাবে চলতে দেয়া ঠিক হবে না। আমরা একটা সিদ্ধান্তের একেবারে কাছাকাছি এসে গেছি। আমরা সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এ বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।”

তিনি আরও বলেছেন, “ইতিমধ্যেই মক্কা-মদিনার সিদ্ধান্ত আমরা জানি। পাকিস্তানও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।”

এদিকে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার ঢাকা উদ্যানের কয়েকটি মসজিদে এই শুক্রবারের জুমার জামাতটি অভিনব কায়দায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও মুসল্লি মাহমুদ-উর রশীদ জানান, সরকারের আহ্বানে সাড়াদিয়ে প্রথমবারের মতো মুসল্লিরা মসজিদে খতিবের ইমামতিতে নিজ নিজ ঘরে বসেই জামাতে জুমার নামাজ আদায় করেছেন। এর আগে খতিব মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দিয়ে যার যার ঘরে থেকেই তার ইমামতিতে ব্যতিক্রমী এই জামাতে জুমার নামাজ আদায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন।