জর্জ হ্যারিসন—বাংলাদেশের বন্ধু যে জন

27
Print Friendly, PDF & Email

কাজী মেহেদী হাসান, ঢাকা:

জর্জ হ্যারিসন নামটা  আমাদের কাছে কতটুকু পরিচিত? ৬০ এর দশকে বিশ্বজোড়া যখন একটা উত্তাল আর অস্থিতিশীল সময় যাচ্ছিল সেই সময় আর তরুনদের উদ্দীপনাকেই যেন গানে রূপান্তরিত করেছিল তৎকালীন বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটলস। বিটলসের চার সদস্যের একজন জর্জ হ্যারিসন। কিন্তু এইটুকু চেনা আপনার জন্য অপরাধ। একজন বাঙালি, বাংলাদেশি হিসেবে তো বটেই। একজন বন্ধুর নাম আপনি ভুলে যেতে চাইলেও পারেন না, জর্জ হ্যারিসন এমন একজন। তিনি বাংলাদেশের বন্ধু, আমাদের বন্ধু, সেই সময়ের বন্ধু যখন বন্ধুকে সবচেয়ে বেশি বন্ধু হয়ে ওঠে।

১৯৭১। বাংলাদেশ নামের সোনার একটা দেশ জ্বলছে, পুড়ছে, ছাই হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মতো দেখতে জানোয়ার পাকিস্তানিরা আমার দেশের সহজ-সরল-নিরপরাধ মানুষকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পরের দিনের সুর্যাস্ত দেখার চ্যালেঞ্জে। অথচ এমন পরিস্থিতিতেও বিশ্বমিডিয়া নিরব, বলা ভালো তাদের জানতে দেয়া হচ্ছে না, পাকিস্তানিরা দেখাচ্ছে ধাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক। চাকুরীজিবিদের তারা বাধ্য করেছে লাশের উপর দিয়ে অফিসে হেঁটে যেতে। ঠিক তখন বিখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবি শংকরের অনুরোধে আমেরিকার ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনকে কাঁদিয়ে তোলেন জর্জ হ্যারিসন। একটা মাত্র শব্দে। বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ শব্দটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারতেন না তিনি। কেমন যে ব্যাংলাদেশ, ব্যাংলাদেশ শোনাতো। তা যেমনই শোনাক, পৃথিবীতে চিরকাল কান্নার ভাষা এক, আবেদনের আর মায়ার কণ্ঠ এক। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের সামনে সেই ভাঙা ভাঙা উচ্চারণেই অসামান্য দরদ ঢেলে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন ‘বাংলাদেশ’ গানটি এবং তৈরি করলেন ইতিহাস। তিনি গানটা শুরু করেছিলেন এভাবে—

My friend came to me,
with sadness in his eyes
Told me that he wanted help
Before his country dies

Although I couldn’t feel the pain,
I knew I had to try
Now I’m asking all of you
To help us save some lives

Bangla Desh, Bangla Desh

কনসার্ট ফর বাংলাদেশে দর্শকদের একাংশ

ভাবুন তো একবার। আমাদের থেকেও হাজার মাইল দূরে বসে একটা লোক আমাদের জন্য কাঁদছে, সে আমাদের কখনো দেখেনি, কথা হয়নি কেবল তার একজন বন্ধুর মাধ্যমে শুনে সে কাঁদছে। আমাদের জন্য, বাংলাদেশ নামে এক মায়ের জন্য, মানুষের জন্য। মানুষ পরিচয়ের জন্য এর বেশি আর কিইবা চাইতে পারি আমরা। ভাবুন, আমাদের যুদ্ধকালীন অসহায় দেশটার কথা, তারপর তাকান বহুদূরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে।সেখানে ৪০ হাজার দর্শক স্তব্ধ হয়ে শুনছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।  কান্না পাচ্ছে না? হয়তো জর্জ হ্যারিসনও তা দেখতে পান। মানুষ বলে কথা।

কনসার্টে কেবল জর্জ হ্যারিসন নিজে গেয়েই শান্ত হননি, বলাতে চেয়েছেন আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ দিয়ে। যাতে দুঃখী সেই বাঙালি মুখগুলো আর পাকিস্তানি সেই জানোয়ারের মুখগুলো কখনও কেউ ভুলে না যায়। সেই মঞ্চে সেদিন গান গেয়েছিলেন বব ডিলান। গেয়েছেন এরিক ক্ল্যাপটন, বরিস ভুরম্যান। ছিলেন গিটারিস্ট ডন প্রেস্টন, ড্রামার জিম কেল্টনার, রিঙ্গো স্টার, লেওন রাসেলসহ সঙ্গীতজগতের সব নক্ষত্রেরা। একই মঞ্চে তারা সেদিন বাংলাদেশ শব্দকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কেবল আর্তচিৎকার করা এক দেশমাতার জন্য। কেউ কোন পারিশ্রমিক নেননি। গেয়েছিলেন ভালোবেসে, মানুষ হয়ে।

কনসার্টের শুরুতে পণ্ডিত রবিশংকর বলেন—

আজকের এই গান কেবলই গান নয়, এতে আছে মানুষের জন্য বার্তা। আমরা শিল্পী, রাজনীতিবিদ নই। তবে বাংলাদেশ আজ যে তীব্র যন্ত্রণা এবং দুঃখের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে সেইটুকু আমাদের গানের মাধ্যমে আপনাদের অনুভব করাতে চাই। তাদের কথাও অনুভব করাতে চাই যারা নির্মম অত্যাচার সইতে না পেরে নিজ দেশ ছেড়ে আজ ভারতে শরনার্থী হয়ে এসেছে।

এই কনসার্টকে সহায়তা দিয়েছিল ইউনিসেফ। জর্জ হ্যারিসন আর পণ্ডিত রবিশংকর ভেবেছিলেন এই কনসার্ট থেকে যদি ২০ হাজার ডলারও পাওয়া যায় সেটাও মুক্তিযোদ্ধা আর শরনার্থীদের জন্য উপকারে আসবে। কিন্তু সেদিন তাদের অবাক করে দিয়ে অর্থ উঠেছিল প্রায় আড়াই লাখ ডলার। যা সেই সময়ে  যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের জন্য বিরাট অবদান রেখেছিল।

বাঙ্গালাদেশের মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শরনার্থীদের জন্য এই ধরনের কনসার্টের মধ্যে এটি ছিল বিশ্বে প্রথম। পরবর্তীতে আরও বিভিন্ন বিপর্যয়ে নানারকম কনসার্ট হয়েছে কিন্তু “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ” এর ব্যাপ্তি কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। হ্যারিসনের স্মৃতিতেও তার জায়গা আলাদা। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি বলেন—

আমরা যখন কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন মার্কিনিরা পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন হাজারেরও বেশি মানুষ মরছে কিন্তু বিশ্ব মিডিয়া নিরব। কেউ ছাপলেও শুধু বলছে—ও হ্যা, এখনো এটা চলতেছে। ব্যস এতটুকুই, কিন্তু আমরা মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম। এখনো বাঙালি রেস্তোরায় এমন সব ওয়েটারের সাথে আমার দেখা হয়, যারা বলেন মিস্টার হ্যরিসন- আমরা যখন জঙ্গলে লড়াই করছিলাম, তখন বাইরে কেউ আমাদের জন্য ভাবছে, এই জানাটাও আমাদের জন্য ছিল অনেক কিছু।

হ্যারিসনের গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে ১৯৯৭ সালে, সেই সময়ে তাকে রেডিওথেরাপিও দেয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় তা কাজ করেছিল বলেও ধরে নেয়া হয়। ২০০১ সালে তার ফুসফুস থেকে টিউমার অপসারন করা হলেও একই বছরের ২৯ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মারা যান দুঃসময়ে সেই বাংলাদেশ শব্দের কণ্ঠস্বর জর্জ হ্যারিসন। তার অসমাপ্ত এলবাম Brainwashed তারই দুই সন্তান শেষ করেন। এই এ্যালবামের দুটো লাইন নেয়া হয়েছিল ভগবত গীতা থেকে—

There never was a time when you or I did not exist. Nor will there be any future when we shall cease to be

অর্থাৎ, এমন কোন সময় ছিল না যখন তুমি কিংবা আমি ছিলাম না। এমন কোন ভবিষ্যৎও নেই যেখানে আমাদের কথা থাকবে না। জর্জ হ্যারিসন ঠিক এমন এক কাজই করেছিলেন, যা দিয়ে তিনি সময়কে বাধ্য করেছেন তার অনুগত হতে। ভালো কাজ আর মহৎ হৃদয়; সময়কে ধারন করতে এর ভিন্ন আর কিইবা লাগে?

এখনও এক চূড়ান্ত অস্থিতিশীল সময় যাচ্ছে। করোনার আক্রমনে গোটা পৃথিবীই বিপর্যস্ত। সবসময়েই থাকে, অনেক দূরের কোন দেশ, তারা কাঁদছে। তেমন এক কান্না, তেমন এক আর্তি অনেক দূর দেশে বসে শুনেছিলেন জর্জ হ্যারিসন। যার কণ্ঠে বাংলাদেশ শব্দটা এতটা দরদ পেয়েছিল, সারাবিশ্বকে তিনি আমাদের কান্না শুনিয়েছিলেন আমাদের একজন হয়ে। এমন বন্ধুর নাম আপনি কেন ভুলবেন, কেমন করে ভুলবেন?