ইতালির শহর ভো যেভাবে শূন্যে নামিয়ে আনল সংক্রমণ

13
Print Friendly, PDF & Email

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ ডেস্ক:
করোনাভাইরাস সংক্রমণে বিপর্যস্ত ইতালির অনেক অঞ্চল। দেশটিতে দিন দিন বেড়েই চলেছে লাশের সারি। বাড়ছে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যাও। কিন্তু এই সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে দেশটির ছোট্ট শহর ভো–এর সব বাসিন্দাকে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করার পর দারুণ সফলতা পেয়েছে। শহরটিতে এখন সংক্রমণের সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে।

ইতালির ভেনেতো অঞ্চলের শহর ভো। বিখ্যাত ভেনিস নগরী থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০। ইতালির একেবারে মাঝখানে পড়েছে শহরটি। গত ফেব্রুয়ারিতে ইতালির অন্যান্য এলাকার মতো ভো শহরেও প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

ইতালিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত করা হয় এই শহরেই, ২৩ ফেব্রুয়ারি। ৭৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি মারা যান। করোনাভাইরাসের জন্য এই শহরকেই সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক এলাকা’ (রেড জোন) হিসেবে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু ১৩ মার্চ থেকে সেখানে নতুন কোনো সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। ইতালির অন্যান্য অঞ্চলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যখন মৃত ও সংক্রমণের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, সেখানে ভো–এর অবস্থান একেবারে ভিন্ন।

কীভাবে এই বিস্ময়কর অগ্রগতি সম্ভব হলো, তার কারণ জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর শহরের সব বাসিন্দার করোনা পরীক্ষা করেন তাঁরা। সবাইকে পরীক্ষা করা হয়। আর তাতেই মেলে সুফল। ভেনেতোর আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও রেডক্রস কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে এই কাজটি করেন ভেনেতোর পাদুয়া শহরের ইউনিভার্সিটি অব পাদুয়ার গবেষকেরা।

ইউনিভার্সিটি অব পাদুয়ার অণুজীববিজ্ঞানের অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ক্রিসান্তি এবিসির দ্য ওয়ার্ল্ড টুডেকে বলেন, ‘আমরা সবাইকে পরীক্ষা করেছি। তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ইতিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করি।’ তিনি জানান, মোট বাসিন্দার ৩ শতাংশ (৮৯ জন) মানুষের শরীরে করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। কোনো লক্ষণ নেই, এমন মানুষের শরীরেও করোনা শনাক্ত করা হয়। এই বিষয়টি গবেষকদের জন্য ছিল খুবই উদ্বেগের।

অধ্যাপক ক্রিসান্তি বলেন, ভো শহরে সংক্রমণের হার দেখে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি ইতালির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তাই শহরটির দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন তাঁরা। যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের হাসপাতালে না পাঠিয়ে বাড়িতেই কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়। অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মেলামেশার বিষয়ে আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে অন্য কারও শরীরে সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য তাঁদের হাসপাতালে পাঠানোর বিপক্ষে অবস্থান নেন গবেষকেরা।

ক্রিসান্তি বলেন, হাসপাতালে অনেক চিকিৎসক, নার্স ও রোগী সংক্রমিত হয়েছেন। এটা সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র বলা যেতে পারে।

দুই সপ্তাহ বাড়িতে কোয়ারেন্টিনের পর ভো শহরের বাসিন্দাদের আরেক দফা গণপরীক্ষা করেন গবেষকেরা। তখন দেখা যায়, সংক্রমণের সংখ্যা ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে।

ভেনেতোর গভর্নর লুকা জাইয়া ভো শহরকে ইতিমধ্যে ইতালির ‘সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত স্থান’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। ইতালির বার্তা সংস্থা এএনএসএকে তিনি বলেন ‘এটাই প্রমাণিত হয়েছে, পরীক্ষা করার ব্যবস্থা কাজ করছে।’

অধ্যাপক ক্রিসান্তি বলেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর কার্যকর উপায় হচ্ছে পরীক্ষা আর আইসোলেশন। তবে গণহারে পরীক্ষা করার কাজ খুবই কষ্টসাধ্য বলেও স্বীকার করেন তিনি।