চীন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেন নাকি জীবজন্তু-কে ছড়াল করোনা ভাইরাস?

16
Print Friendly, PDF & Email

হেল্থ নিউজ ডেস্ক:
প্রাণঘাতী করোনায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যেহেতু বিশ্বব্যাপী করোনা আতঙ্কে স্থবিরতা চলছে তাই করোনা নিয়ে উঠে আসছে নানা রকম তথ্য। গুজবও কিছু কম ছড়াচ্ছে না।

ফেসবুকসহ প্রায় প্রতিতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নতুন নতুন তথ্য পেয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। কখনও কোনো কোনো প্রতিবেদনে কোনো এক গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, জীবজন্তুর দেহ থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে এ ভাইরাসটি। আবার কোথাও বলা হচ্ছে, জীবাণু অস্ত্রের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সংক্রমণ যত ছড়াচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়াচ্ছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। তবে আসলে ভাইরাসটি কীভাবে ছড়িয়েছে। এ বিষয়ে কোন দেশ কাকে দুষছে এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা।

কে কাকে সন্দেহ করছে:
চীন এবং ইরানের ভেতর থেকে সন্দেহের তীর যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। চীনের ভেতর সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষজন হরদমসে লিখছে এবং শেয়ার করছে যে চীনকে শায়েস্তা করতে যুক্তরাষ্ট্র জীবাণু অস্ত্র হিসেবে চীনে এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে গেছে।

শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, একজন চীনা কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এ ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ঝাও লিজিয়িান টুইটারে মার্চের ১১ তারিখে মার্কিন একটি কংগ্রেস কমিটির সামনে সেদেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) প্রধান রবার্ট রেডফিল্ডের একটি শুনানির ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেছেন। ওই ফুটেজে রেডফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বলছেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে কোভিড-নাইন্টিনের কারণেই ওই মৃত্যু।

যদিও রেডফিল্ড বলেননি কখন ওইসব মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু চীনা ওই কূটনীতিক টুইটারে ওই ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেলিখেছেন, সিডিসি ধরা পড়ে গেছে। কখন প্রথম রোগীটি যুক্তরাষ্ট্রে মারা গিয়েছিল? কত মানুষ সংক্রমিত হয়েছিল? কোন কোন হাসপাতালে? হতে পারে যেসব মার্কিন সেনা উহানে ওই ভাইরাস এনেছিল তারাই… স্বচ্ছ হোন। মানুষকে সত্য জানান। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাই।

ঝাওয়ের ওই টুইট চীনা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টিভি সিসিটিভিতে প্রচার হয়। গ্লোবাল টাইমসেও তা ছাপা হয়।

এছাড়াও চীনের ভেতর থেকে একাধিক বিজ্ঞানী বলেই চলেছেন, করোনা ভাইরাসের মহামারি চীনে শুরু হলেও এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে হয়নি।

ইরানের অঙ্গুল আমেরিকার দিকে:
চীনের পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও ব্যাপক মানুষের বিশ্বাস এ জীবাণু যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। এমনকি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কম্যান্ডার মেজর জেনারেল হুসেইন সালামি সরাসারি বলেছেন, করোনা ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র।

গত ৫ মার্চ জে. সালামি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনে এবং পরে ইরানের বিরুদ্ধে ‘জীবাণু-অস্ত্রের সন্ত্রাসী হামলা’ চালিয়েছে।

পরদিনই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য হেশমাতোল্লাহ ফাতালহাতপিশে মন্তব্য করেন, ট্রাম্প এবং পম্পেও করোনা নিয়ে মিথ্যা কথা বলছেন। এটা কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটা ইরান এবং চীনের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্রের হামলা।

রাশিয়ার ভূমিকা:
রাশিয়ার ভেতর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও রাশিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন মিডিয়ায় চীন এবং ইরানের এসব অভিযোগ-তত্ত্ব জোরেসোরে প্রচার করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইইউএর একটি মনিটরিং দল মার্চের ১৬ তারিখ পর্যন্ত দুমাসের এক অনুসন্ধানে ৮০টি প্রমাণ পেয়েছে যে ক্রেমলিনের সাথে ঘনিষ্ঠ মিডিয়ায় করোনা ভাইরাস নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

রুশ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ ভাইরাস ছড়ানোর জন্য ব্রিটেনকেও দায়ী করা হচ্ছে। সরকার সমর্থিত স্পুটনিক রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর বাজার খুলে দেয়ার জন্য চীনকে বাধ্য করতে ব্রিটেন এ কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। রুশ একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে (দি বিগ গেম) ইগর নিকুলিন নামে রুশ একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট বলেন, ব্রিটেন এই করোনা ‘অস্ত্র’ তৈরি করেছ।

তিনি বলেন, (ব্রিটেনের) পোর্টান ডাউনে একটি গবেষণাগারে বহুদিন ধরেই নানা জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কাজ চলছে। তবে রুশ সরকার দাবি করেছে, এসব বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

আমেরিকার তীর চীনের দিকে:
আমেরিকার ভেতরেও করোনা ভাইরাস নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বয়ং ঘুরে ফিরে বলেই চলেছেন, করোনা ভাইরাস চীনের কাজ, তারাই দায়ী।

ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত অনেক ব্যক্তিই খোলাখুলি বলছেন, করোনা ভাইরাস চীনের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কংগ্রেসে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এমন এক রিপাবলিকান রাজনীতিক জোয়ান রাইট টুইট করেছেন, উহান ল্যাবরেটরিতে এ করোনা ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। এবং ওই গবেষণায় চীনাদের সহায়তা করেছেন বিল গেটস।

সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি ওই টুইট ডিলিট করে দেন। তবে আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে করোনা ভাইরাস নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কোনো শেষ নেই।

পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন একদল বিজ্ঞানী মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে একটি বিবৃতি দিয়েছেন যেখানে তারা বলেছেন, জীবজন্তুর শরীর থেকেই এ করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধুই ভয়, গুজব এবং ঘৃণা ছড়াবে যাতে এ সঙ্কট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত হবে।