ঐতিহ্য ও ইতিহাস ভূমি মিসরে রমজান

35

আফ্রিকা আর এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী দেশ মিসর। এ দেশের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মানুষের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই মুসলমান। তাই পবিত্র রমজানে সমগ্র মিসর এবং ধর্মীয় উৎসবমুখর আরব অনুভব করা যায়। হরেক রকম ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে মিসরে রমজান পালিত হলেও এই পবিত্র মাসে মিসরের লণ্ঠন জ্বালানোর উৎসবের খ্যাতি জগৎজুড়ে। 
ঐতিহাসিকদের মতে, হিজরি ৩৫৮ সালের ১৫ রমজান ফাতেমীয় বংশের শাসক ও ধর্মীয় নেতা আল মুইজ আলদিন মিসরে প্রবেশ করেন। অন্ধকার দূর করে আলোকিত পথে তাকে মসজিদে নেওয়ার জন্য তৎকালীন মিসরবাসী মোমবাতিসহ নানা ধরনের প্রদীপ প্রজ্বালন করে। আর বাতাসে যেন না নেভে সে জন্য কাঠের তৈরি এক ধরনের বাক্স বা খাঁচার ভেতর রাখা হয়েছিল এসব মোমবাতি ও প্রদীপ। তখন থেকেই প্রদীপের এই উৎসবমুখর ব্যবহার শুরু হয় এবং ‘ফানুস’ নামে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মিসর, সিরিয়া ও তৎকালীন মেসোপেটোমিয়ার শাসক এবং মুসলিম বীর আন নাসির সালাহ আমদিন ইউসুফ বিন আইয়ুব ওরফে গাজী সালাউদ্দিনের সময় এ লণ্ঠন বা ফানুস ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রমজান শুরুর আগেই মিসরের হাট-বাজারে ছোট-বড় নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। উজ্জ্বল ও গাঢ় রঙের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় এসব লণ্ঠনে। মনের আনন্দে এসব লণ্ঠন কিনে সবাই দোকান-মাঠ-মিল-কারখানা, বাসা-বাড়ি সাজিয়ে ফেলে। এ সময় শিশুদেরও বায়না থাকে নিত্যনতুন রঙিন লণ্ঠন কেনার জন্য। হাতে লণ্ঠন নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ায়, গান গায় আর বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে উপহার সামগ্রী সংগ্রহ করে। 
বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের ফলে কাঠের বদলে লোহা, তামা ও অন্যান্য ধারক দ্রব্য, কাচ ও স্বচ্ছ প্লাস্টিক শিটের ব্যবহার ঘটছে আধুনিক লণ্ঠনের নির্মাণশৈলীতে। ফাতেমীয় আমলে রমজান মাসে রাস্তা আলোকিত করার কথাও প্রচালিত আছে। সে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখনও মিসরের রাস্তায় লণ্ঠন দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়। মিসরের সর্বত্র লণ্ঠনের বাজার গড়ে উঠলেও ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় ইসলামিক জাদুঘরের নিকটবর্তী বাব জিউইলিয়াহ নামক স্থানটি লণ্ঠনের বিশাল বাজার বলে বিখ্যাত। ১১ শতকে নির্মিত সিটিগেট সংলগ্ন এই লণ্ঠন বাজারে রমজান মাসে দেশি-বিদেশি বহু পর্যটকের সমাগম ঘটে। 
মিসরে রমজানের আরেকটি ঐতিহ্য হলো সাহরির সময় ঢোল বাজিয়ে ঘুম থেকে জাগানো। ওসমানীয় শাসনামলে কোনো ঘড়ি বা এলার্ম সিস্টেম ছিল না। তখন থেকেই এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মিসরবাসী। ঢোলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাবগম্ভীর গানও গেয়ে থাকে এ বাদক দল। মাসব্যাপী এ সেবা দিয়ে ঈদের আগে তারা পাড়া-মহল্লা থেকে ঈদের বখশিশ সংগ্রহ করে উদযাপন করে খুশির ঈদ। 
মিসরে রমজানের আরেকটি ঐতিহ্য কামান দাগিয়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা। এ ঐতিহ্য শুরুর পেছনে একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। মিসরবাসীর ধারণা, অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে মিসর ও সুদানের স্বঘোষিত খতিব মোহাম্মদ আলি পাশা মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য কিছু কামান সংগ্রহ করেন। একদিন কাকতালীয়ভাবে ইফতারের সময় শুরুর সঙ্গে সঙ্গে একটি কামান থেকে গোলা বিস্ফোরিত হয়। যদিও বিষয়টি ছিল দুর্ঘটনাবশত; তথাপি মিসরবাসী ধরে নেয় খতিব মোহাম্মদ আলির আদেশে কামান দাগিয়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা হয়েছে। সেই থেকে অদ্যাবধি ইফতারের সময় কামান দাগানো হয়, যা স্বচক্ষে বা টেলিভিশনে উপভোগ করেন মিসরবাসী।


রমজান মাসে মিসরের পথে পথে লেটুস পাতা বিক্রি করতে দেখা যায়। সেখানকার ইফতারে এ পাতার দারুণ সমাদর। ইফতারের মেন্যুতে কোনাফা ও কাতায়েফ থাকতেই হবে। এগুলো মূলত কেক জাতীয় খাদ্য। যেগুলো আটা, চিনি, মধু ও বাদাম দিয়ে তৈরি হয়। তবে মিসরে ইফতারের প্রধান মেন্যুতে থাকে শরবত, দুধ, নানারকমের ফল, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কেক, পিঠা প্রভৃতি। আর নিয়মিত অনুষঙ্গ খেজুর তো আছেই। ইফতারের জন্য বাদাম, কিশমিশসহ বিভিন্ন উপকরণে তৈরি করা হয় তায়েফ পিঠা। 
এছাড়া বাজারের শহর খ্যাত রাজধানী কায়রোর অলিগলিতে পসরা সাজিয়ে বসে হরেকরকম ইফতারির দোকান। বাংলাদেশের মতো মিসরের মুসলমানরাও একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করেন। অনেকে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে একসঙ্গে বাসায় ইফতার করেন।