পাপিয়াকাণ্ডে নারী নেত্রীদের চেনেন না মন্ত্রীরা!

31
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
অনৈতিক কাজে জড়িত, অবৈধ অর্থ পাচার, জাল টাকা সরবরাহ এবং মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ’র ডেরায় আমলা-এমপি ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণির লোকের আসা-যাওয়া ছিল। ডেরায় নিয়মিত আসতেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এমন ব্যক্তিদের তালিকা করেছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। ওই তালিকায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও সংসদ সদস্যসহ ক্ষমতাসীন দলের একাধিক শীর্ষ নেতা রয়েছেন।

এদিকে, পিয়া কেলেঙ্কারির পর এখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা নারী নেত্রীদেরকে এড়িয়ে চলছেন। দেখা হলেও এমনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন যে তাদেরকে চেনেন না। অনেক এমপির কাছে নারী নেত্রীরা বিভিন্ন তদবির, সুপারিশ ইত্যাদি নিয়ে প্রায়ই যেতেন, খুব আপ্যায়নও পেতেন। কিন্তু এখন নারী নেত্রীদের দর্শনে অরুচি দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগের এমপিদেরও।

সোমবার (২ মার্চ) মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। বৈঠক শেষে মন্ত্রীরা একে একে সচিবালয়ে আসতে থাকেন। এইসময় তিনজন নারী নেত্রী একটি মন্ত্রণালয়ের লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের বিশেষ দরকার ছিল। দরকারটা খুব সাদামাটা। একটি অনুষ্ঠানের জন্য তারা মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাবেন, ব্যস এইটুকুই। কিন্তু মন্ত্রী লিফটের গোঁড়ায় তিন নারী নেত্রীকে দেখে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। মন্ত্রী অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। নেত্রীরা একটু এগিয়ে এসে সালাম দিলেন। তবে মন্ত্রী যেন এর উত্তরে রীতিমত আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘প্লিজ, এখানে না!’ নারী নেতৃবৃন্দ তো রীতিমত অবাক। মন্ত্রীর সঙ্গে থাকা পুলিশ প্রোটোকলের লোক নারী নেত্রীদেরকে চলে যেতে বললেন।

এ সময় হতাশ তিন নারী নেত্রী দুঃখ করে বললেন যে, এই পাপিয়া কাণ্ডের পর তাদেরকে এরকম অপমান হতে হচ্ছে, তাদের মানসম্মান নিয়ে প্রশ্ন। এ সময় আওয়ামী লীগের একজন কর্মী বলেন যে, আপনারা সচিবালয়ে না আসলেই পারেন। সেসময় একজন ক্ষুদ্ধ্ব নারী নেত্রী বলেন, সচিবালয়ে আসবো না কেন? অন্যের পাপের ভার আমরা নিবো কেন? আর সচিবালয়ে না আসলে মন্ত্রীদের পাওয়া যাবে কোথায়?

একই দৃশ্য দেখা যায় আরেকটি মন্ত্রণালয়ে। সেই মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছে দুজন স্থানীয় পর্যায়ের নারী নেত্রী এসেছিলেন বদলি তদবিরের জন্য। কিন্তু সচিব জানিয়ে দেয় যে কোন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোন নারী নেত্রী মন্ত্রণালয়ে আসলে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিবেন না মন্ত্রী। এই ব্যাপারে তাকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, কোন নারী নেত্রীর তদবরিরে কাগজ যেন গ্রহণ না করা হয়।

অন্যদিকে, একজন সচিব মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে এসেই জানিয়ে দেন যে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি কোন নারী নেত্রী আসেন, তাহলে তাদেরকে যেন কোনপ্রকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া না হয় এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের কোনরকম তদবির গ্রহণ করা হবেনা।

সারাদিনই এরকম চিত্র ছিল সচিবালয়ে। জানা গেছে যে, পাপিয়ার ঘটনার পর বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সঙ্গে পাপিয়ার ছবি নিয়ে লজ্জায় পড়েছেন অনেক মন্ত্রী এবং এরপরেই প্রধানমন্ত্রী যার তার সাথে ছবি না তোলার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে এখন নারী নেতৃত্বকে সর্বত্র এড়িয়ে চলছেন মন্ত্রীরা।

শুধু মন্ত্রী বলে নয়, এমপিরাও এখন নারী কর্মী, নারী নেত্রী, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নারী নেতৃত্বের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছেন না। বিভিন্ন এমপিরা তাঁদের নিজস্ব অফিস পরিচালনা করেন এবং এই সমস্ত অফিসে সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আবেদন, নিবেদন, সুপারিশ দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সব এমপির পক্ষ থেকেই এইসব নারী নেত্রীদের এড়িয়ে যাবার প্রবণতা দেখা গেছে।

একাধিক এমপির সাথে বললে তারা এই প্রতিবেদককে বলেন যে, ‘পাপিয়ার ঘটনার পর আমাদেরকে সতর্ক হতেই হচ্ছে, কারণ কার মনে কি আছে জানিনা। অপরিচিত কারও সাথে ছবি তুলে বিপদে পড়তে চাই না। কারণ কে কাকে কখন কিভাবে ফাসিয়ে দেয় তা বোঝা যায় না। এইজন্য খুব আতঙ্ক আছি।’

এই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরে। এই আতঙ্কের কারণে যারা ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং নিষ্ঠাবান নারী কর্মী, তাঁরাও নানাভাবে প্রত্যেক্ষ-পরোক্ষভাবে অপমানিত হচ্ছে।২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শামিমা নূর পাপিয়া, তার ব্যক্তিগত শেখ তায়্যিবা, পাপিয়ার স্বামী সুমন চৌধুরী ও তার ব্যক্তিগত সহকারী সাব্বির খন্দকারকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। তাদের কাছ থেকে জাল টাকা, ডলারসহ প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলশানের পাঁচতারা হোটেল ওয়েস্টিনে পাপিয়ার আস্তানায় হানা দিয়ে এই দম্পতির অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।

পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন বর্তমানে পুলিশের মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ডে আছেন। অনুসন্ধানের সময় তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ করা হবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। অনুসন্ধানকালে মালিকানাধীন অর্থসম্পদের বৈধ উৎস সম্পর্কে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে।

রাজধানীর একাধিক পাঁচতারকা হোটেলে নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা ও বিত্তশালীদের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে।

পাপিয়ার নামে রাজধানী ঢাকা ও নরসিংদীতে বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি রয়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসায় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করেছে।

যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত নেত্রী পাপিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকার বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর থানায় পৃথক তিনটি মামলা করেছে র‌্যাব। দুদকের অনুসন্ধানে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কমিশন আইনে মামলা করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, পাপিয়ার ওমেনাইজিং বিজনেসের সাথে জড়িত ছিল ১৭শ’ সুন্দরী নারী। এসব নারীদের বিভিন্ন কৌশলে কাজে লাগিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয়দের কাছে। দেশের ৬৪ জেলায়ই ছিল তার নেটওয়ার্ক। সূত্র: বাংলা ইনসাইডার