পাপিয়ার ডেরায় যাওয়া ব্যক্তিরা এখন আতঙ্কে

29
Print Friendly, PDF & Email

স্পেশাল করসপন্ডেন্ট, ঢাকা:
© ডেরায় অভিজাতদের মনোরঞ্জনে দেশি তরুণী-বিদেশি মডেল
© ব্ল্যাকমেইলিংয়েই প্রভাবশালীর সঙ্গে বিরোধের জেরে অভিযোগ
© তথ্য-প্রমাণসহ প্রধানমন্ত্রী জানার পরই দেশত্যাগের চেষ্টা
© ১২ রুশ তরুণীর দেশে প্রবেশের কারণ অনুসন্ধানেই ধরা পাপিয়া
যুবলীগ নেত্রী শামীমা নুর পাপিয়া গ্রেপ্তারের পর থেকেই আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন তার ডেরায় যাওয়া-আসা করা রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, উঠতি শিল্পপতিসহ অভিজাত শ্রেণির খদ্দেররা। যারা দেশীয় তরুণীসহ বিদেশি মডেলের সঙ্গে পাপিয়ার মাধ্যমে মনোরঞ্জন করে আসছেন দিনের পর দিন।

এর মধ্যদিয়েই তদবির ও ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে আর্থিক ফায়দা হাসিল এবং মনোরঞ্জনের জন্য ডেরায় আসা প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করে কোটিপতিও বনে যায় পাপিয়া।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা যায়, পাপিয়া বিভিন্ন মহলে দেনদরবার, তদবির বাণিজ্যসহ নিয়োগ বাণিজ্যও করে বেড়াতেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তিনি হোটেল ওয়েস্টিনের ডেরায় এনে দেশি-বিদেশি তরুণী এবং মদ দিয়ে আকৃষ্ট করতো। সেসবের ছবি তুলে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলও করতো। এরকমই একটি ঘটনায় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে পাপিয়া।

সেই বিরোধের জেরেই ওই ব্যক্তি র‌্যাবসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। ওয়েস্টিন হোটেলে দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন পাপিয়া এ সম্পর্কেও তথ্যপ্রমাণ দেয় প্রভাবশালী ওই ব্যক্তি। তদন্তের স্বার্থে ওই ব্যক্তির নাম এখনো সামনে আনছে না আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পাপিয়ার নেটওয়ার্ক এতটাই দীর্ঘ ও বিস্তৃত ছিলো, যেখানে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কারো কাছে এই তথ্যগুলো জানাতে আস্থা পাচ্ছিলো না। প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রমাণাদি দেখার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দেন।

অপরাধী যেই হবে তাকেই গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ব্যাপারে তার (প্রধানমন্ত্রী) অনুমতি নেয়ার দরকার নেই। প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনার তথ্য পাপিয়া পর্যন্ত পৌঁছানোর পরই দেশ ছেড়ে কানাডা পাড়ি জমানোর চেষ্টাকালেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‌্যাবের হাতে আটক হয় পাপিয়া।

সূত্র জানায়, পাপিয়া আটকের ৪৮ ঘণ্টা পূর্বাপর যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল তাদের সবাই এখন গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে পাপিয়ার সম্পর্ক কি এবং কিভাবে তারা পাপিয়াকে সহযোগিতা করতেন এ সম্পর্কে তথ্যগুলো গোয়েন্দারা সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করলেই পাপিয়া উত্থানের চাঞ্চল্যকর সঠিক তথ্য প্রকাশ পাবে বলে মনে করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।

এদিকে, পাপিয়ার এমন কেলেঙ্কারির পর টনক নড়েছে আওয়ামী লীগেও। খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যারাই পাপিয়ার মতো দুষ্কর্মে জড়িয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই গোয়েন্দারা আরও ১১ পাপিয়ার সন্ধান পেয়েছে বলেও আইনগপ্রয়োগকারী সংস্থা সূত্রে জানা যায়।

তাদের ইতোমধ্যেই গোয়েন্দা নজরদারিতেও আনা হয়েছে। নজরদারিতে থাকা ১১ জনের মধ্যে ছয়জনই কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা।

যাদের কাজই ছিলো টেন্ডারবাজি, নিয়োগবাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য বা বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য কাজ বাগিয়ে নেয়া। এই ছয়জনই নিয়মিত সচিবালয়েও যাওয়া-আসা করেন এবং বিভিন্ন তদবির বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত থাকেন।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তাদের সচিবালয়ে প্রবেশের পাসও বাতিল করা হচ্ছে খুব শিগগিরই। বাকি পাঁচজন স্থানীয়পর্যায়ের যুব মহিলা লীগের নেতা। তারাও এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়ান। মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার চেষ্টা করেন।

স্থানীয় টেন্ডারবাজিতে রয়েছে তাদের ব্যাপক ভূমিকা। এই ১১ জনই বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। খুব শিগগির তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে সূত্র জানায়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, পাপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা আওয়ামী লীগের ওই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে বৃহস্পতি ও শুক্রবার পাপিয়ার ২১ দফা টেলি কথোপকথনের তথ্যও ইতোমধ্যে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে এসেছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে তার পরিচয়ও গোপন রাখছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, মাসখানেক আগে ১২ রুশ মডেল তরুণীর দেশে প্রবেশের বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে খোঁজ-খবর নিতে গিয়েই পাপিয়ার অপরাধ জগতের সন্ধান মেলে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মাসখানেক আগে ১২ রুশ তরুণী ঢাকায় আসেন। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে ইমিগ্রেশনে আটকাও পড়েন তারা। শেষ পর্যন্ত পাপিয়া উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সুপারিশে তাদের ছাড়িয়ে আনেন।

ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, কেন, কোন কারণে, কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তারা ঢাকায় এসেছেন এমন কোনো তথ্য ওই মডেলদের কাছে না থাকায় বিষয়টি গোয়েন্দাদের মাধ্যমে খবর পৌঁছায় সরকারের শীর্ষপর্যায়ে। এরপরই তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর শুরু হয়। ওই সূত্র ধরেই বেরিয়ে আসে পাপিয়ার পাপের জগতের সন্ধান।

এরপরই র‌্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে হোটেল ওয়েস্টিনে পাপিয়ার ডেরার তথ্য। মনোরঞ্জনের জন্য ওই ডেরাতেই যাওয়া-আসা করতো এমন অভিজাত ব্যক্তিরাই বর্তমান সময়ে রয়েছেন আতঙ্কে।

এদিকে, যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী পাপিয়ার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা পৃথক তিনটি মামলা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হলেও এরই মধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাবও।

বুধবার রাতে মামলাগুলো ডিবি উত্তর বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মো. মাসুদুর রহমান।

তিনি বলেন, থানায় দায়ের করা মামলাগুলো তদন্ত করবে ডিবি।

পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক শফি উল্লাহ বুলবুল।

তিনি বলেন, আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। কিন্তু আদালতে হাজির করার কারণে অনেক বিষয়ে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ সম্ভব হয়নি। বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য আমরাও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই।

এদিকে, তদন্তভার পেলেও এখনো পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন।

গতকাল তিনি বলেন, র‌্যাবের দায়ের করা তিনটি মামলা ডিবিতে হস্তান্তর হয়েছে। পাপিয়া ১৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গতকালই মামলা ডিবিতে আসায় জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ হয়নি।

পাপিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত, কারা ইন্ধনদাতা, তার অর্থের উৎস কী, তার এত বেপরোয়া আচরণের পেছনে শক্তির উৎস কী এই সবই তদন্ত করে দেখা হবে। এমনকি অনৈতিক বিষয় থাকলেও তদন্ত করে দেখা হবে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জালটাকা বহন ও টাকা পাচারের অভিযোগে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

অন্য দুইজন সাব্বির খন্দকার (২৯) ও শেখ তায়্যিবা (২২)। এর পরদিনই আবার অভিযান চালিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে ও নরসিংদীতে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়িসহ তাদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পায় র‌্যাব।

অভিযানে ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা করা হয়। বর্তমানে পাপিয়া ও তার স্বামী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।